সময়ের সঙ্গে এগিয়ে আমেরিকার মুসলমান

মুহাম্মদ ফায়জুল হক: প্রতি বছরের মতো এ বছরও আমেরিকার মুসলিম পরিসংখ্যান বিষয়ে তথ্য বিবরণী প্রকাশ করল আমেরিকা মুসলিম কাউন্সিল। তথ্যবিবরণী পড়ে রীতিমতো চমকে গেল গোটা আমেরিকা। পরদিন থেকেই সংবাদপত্র আর ওয়েবসাইটে নানা গুঞ্জন, মন্তব্য বের হতে থাকল। বিশেষজ্ঞের উদ্ধৃতি দিয়ে পিটার্সবার্গ টাইমস বলেই ফেলল, ওয়ান-ইলেভেনের পর আমেরিকার সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম হয়ে উঠেছে ইসলাম। এ মন্তব্য না করার কি আর উপায় থাকে। যখন তথ্য বিবরণীতে বলা হয় ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী ছয় বছরে হিসপেনিক তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ল্যাটিন আমেরিকা বংশোদ্ভূত মুসলমানের সংখ্যা বেড়েছে ৩০ শতাংশ হারে। অভিবাসী ও স্থানীয় মুসলমানের সংখ্যা মিলে আমেরিকান মুসলমানের সংখ্যা এখন প্রায় ৮০ লাখ, ২০০১ সালে যা ছিল ৪০ থেকে ৫০ লাখ। ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে আমেরিকার মুসলমানদের নিয়ে নানা জরিপ পর্যালোচনা ও গবেষণা হয়েছে। সেখানে বেরিয়ে এসেছে মুসলমানদের সম্পর্কে অনেক অজানা চমকপ্রদ তথ্য।
আমেরিকার মুসলিম কাউন্সিল ২০০১-এ যে পরিসংখ্যান দিয়েছিল সে অনুযায়ী ল্যাটিন আমেরিকা থেকে আগত হিসপেনিক মুসলমান আমেরিকানের সংখ্যা ছিল ৫০ থেকে ৭৫ হাজার। একই প্রতিষ্ঠান থেকে সদ্য প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী সে সংখ্যা এখন প্রায় দুই লাখ। নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা, ক্যালিফোর্নিয়া, ট্যাক্সাসের মতো রাজ্যগুলোতে হিসপেনিক মুসলমানের সংখ্যা ব্যাপকহারে বাড়ছে। আমেরিকার ক্রমবর্ধমান আরেকটি সম্প্রদায় হল আফ্রিকান আমেরিকান মুসলিম। কাউন্সিল অব আমেরিকান ইসলামিক রিলেশন্স থেকে প্রকাশিত তথ্য মতে, আমেরিকার মোট মুসলমানের ৩০ শতাংশ হল আফ্রিকান আমেরিকান মুসলিম। অন্যদিকে আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশটির ৪২ শতাংশ মুসলমান হলেন আফ্রিকান আমেরিকান। ২০০৭ সালে পরিচালিত অন্য একটি গবেষণা থেকে এর সত্যতা পাওয়া যায়। যেখানে বলা হয়েছে, আফ্রিকান আমেরিকান মুসলিমের সংখ্যা সাত বছরে ২০ থেকে ৪২ ভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে। এছাড়াও মোট মুসলিম জনসংখ্যার ৩৩ ভাগ দক্ষিণ এশিয়ান, ২৫ ভাগ আরব, ৩ ভাগ আফ্রিকান, ২ ইউরোপিয়ান এবং ১.৬ ভাগ সাদা আমেরিকান।
আমেরিকায় মুসলমানদের সংখ্যা বের করা মোটেই সহজ কাজ নয়। সরকারি পর্যায়ে ধর্মের ভিত্তিতে সেখানে জনসংখ্যা গণনা করা হয় না। এজন্য কোন ধর্মের কত অনুসারী তার কোন পরিসংখ্যান আমেরিকার সরকারের কাছে নেই। বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিসংখ্যান বের করার চেষ্টা করা হয়। এজন্য কখনও সঠিকভাবে যাচাই করা যায়নি যে প্রকৃতপক্ষে আমেরিকায় কি পরিমাণে মুসলমান বাস করছেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন রকম পরিসংখ্যান দিয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তবে যেভাবেই পরিসংখ্যান বের করা হোক না কেন প্রতিটির ফলাফলেই মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধির তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আমেরিকার সবচেয়ে বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান হল পিউ রিসার্স সেন্টার। এ গবেষণা প্রতিষ্ঠানটিও বলছে দেশটির মোট মুসলমানের ২৩ শতাংশই ধর্মান্তরিত মুসলমান, যারা আমেরিকায় জš§ নিয়েছে অমুসলিম পরিবারে। এ পরিসংখ্যান আরও বলছে, আমেরিকার মোট মুসলমানের ৬৫ ভাগ হলেন অভিবাসী। বাকি ৩৫ ভাগ জš§সূত্রে আমেরিকার নাগরিক। অভিবাসীদের মধ্যে শিক্ষার জন্য এসেছেন ২৬ ভাগ, অর্থনৈতিক কারণে এসেছেন ২৪ ভাগ এবং পারিবারিক কারণে এসেছেন ২৪ ভাগ মুসলমান। বাকি ২৬ ভাগ এসেছেন যুদ্ধ, উদ্বাস্তু ইত্যাদি নানা কারণে।
বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ মুসলমান, ৩৩ শতাংশ খ্রিস্টান। তবে মজার ব্যাপার হল, বিশ্বের মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে মুসলমান বৃদ্ধির হার বেশি। প্রতি বছর ২.৩ শতাংশ হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে মুসলমান বৃদ্ধি পায় বছরে ২.৯ শতাংশ হারে। শুধু আমেরিকাতে মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় বছরে ১ শতাংশ হারে।

আমেরিকার মুসলমানদের মধ্যে উঠতি বয়সের মুসলমানের সংখ্যা উল্লেখ করার মতো। পিউ রিসার্স সেন্টারের গবেষণা অনুযায়ী ৩০ শতাংশ মুসলমানের বয়স ১৮ থেকে ২৯-এর মধ্যে। যেখানে এ বয়স সীমায় বাস করছে দেশের মোট ২১ শতাংশ যুবক। অন্যদিকে কোমেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী একই বয়সসীমায় মুসলমানের সংখ্যা ৩৯.৮ শতাংশ। জš§সূত্রে আমেরিকান অমুসলিম নাগরিক, অথচ ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছেন এরকম মুসলমানের ৩৬ শতাংশের বয়সই ১৮ থেকে ২৯-এর মধ্যে। আফ্রিকান আমেরিকান মুসলমানদের ২৮ শতাংশের বয়স একই বয়সসীমার মধ্যে। মাঝবয়সী মুসলমানের সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে গেছে। ৩০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মুসলমানের হার ৪৯.৫ শতাংশ। একই বয়সের মোট জনসংখ্যার হার মাত্র ৩০ শতাংশ। নারী ও পুরুষ মুসলমানের শতকরা হার প্রায় কাছাকাছি। মুসলমানদের শতকরা ৪৬ ভাগ নারী। বাকি ৫৪ ভাগ পুরুষ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হিসপেনিক নারীদের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের হার ৫০ শতাংশেরও বেশি। আমেরিকান মুসলমানের বিবাহ করার হার ৬০ শতাংশ, যেখানে সাধারণ আমেরিকানের বিবাহ করার হার ৫৭ শতাংশ। পিউ রিসার্স অনুযায়ী আমেরিকান মুসলমানদের বিবাহ বিচ্ছেদের হার ৬ শতাংশ। অন্যদিকে সাধারণ আমেরিকানের বিবাহ বিচ্ছেদের হার ১১ শতাংশ।

বর্ণবাদ আমেরিকায় অনেক আগে থেকেই চলে এসেছে। কালো-সাদা দ্বন্দ্ব, বৈষম্য এখনও অত্যধিক মাত্রায় রয়ে গেছে। ইসলাম কালো-সাদার ব্যবধান ঘোচাতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। ইসলামে বর্ণবাদের কোন স্থান নেই। এই মহান শিক্ষা কালো-সাদা দুই বর্ণের মানুষেরই দৃষ্টি কেড়েছে। পরিসংখ্যানও বলছে, সাধারণ আমেরিকানের চেয়ে মুসলিম আমেরিকানদের মধ্যে বর্ণবৈষম্য কম। পিউ রিসার্স অনুযায়ী আমেরিকায় জš§ নেয়া স্বদেশী মুসলমানদের মধ্যে ৫৬ ভাগ কালো এবং ৩১ ভাগ সাদা। অন্যদিকে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে ৭৭ ভাগই সাদা এবং ১১ ভাগ কালো। এশিয়ান মুসলমানের সংখ্যা মাত্র দুই ভাগ। মোট জনসংখ্যার ৫ ভাগ হলেন এশিয়ান। অন্যদিকে অভিবাসী আমেরিকান মুসলমানদের ৪৪ ভাগ সাদা এবং ১০ ভাগ কালো। ২৮ ভাগ এশিয়ান এবং বাকি ১৮ ভাগ মিশ্রিত। সর্বমোট আমেরিকান মুসলমানের ৩৮ ভাগ সাদা, ২৬ ভাগ কালো, ২০ ভাগ এশিয়ান এবং ১৬ ভাগ মিশ্রিত বর্ণের।

উপরোল্লিখিত পরিসংখ্যান স্পষ্টই বলছে, আমেরিকায় মুসলমানের সংখ্যা কখনও কমেনি। বরং সেখানে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মুসলমানদের সংখ্যা, বিকাশ ঘটেছে ইসলামের।