প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. শামসুল হুদা এবং তার সহকর্মী কমিশনারদ্বয়কে তাদের সাহস ও স্বচ্ছতার জন্য অভিনন্দন না জানিয়ে উপায় নেই। এই তিন ব্যক্তি যা করতে চান সেটি প্রকাশ্যে ও সরাসরি বলেন এবং যেসব রাজনৈতিক দল কিংবা নেতৃবৃন্দকে পছন্দ করেন সাহসের সাথে খোলামেলাভাবে তাদের সহযোগিতা করেন। তাদের আচরণে লুকোছাপার কোনো বালাই নেই। চারদলীয় জোট সরকার এবং ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যারা এসব পদে ছিলেন অন্তত জনসমক্ষে নিরপেক্ষতা প্রমাণের জন্য কী প্রাণান্তকর চেষ্টাটাই না তারা করতেন। তাতে লাভ হয়নি কিছুই। এক-এগারো পরবর্তী সময়ে বঙ্গভবন থেকে চা পানের দাওয়াত দিয়ে সেখানে ডেকে নিয়ে অদৃশ্য সরকারের নির্দেশে রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তাদের পত্রপাঠ বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। সেখানে চা জুটেছিল নাকি বন্দুকের বাঁটের গুঁতো জুটেছিল সেই তথ্য অবশ্য আমাদের মতো আমজনতার জানার কথা নয়। যত দূর মনে পড়ে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এম এ আজিজ বঙ্গভবনে চা পান করতে আর যাননি। নিজের পদত্যাগপত্রটি বাহক মারফত পাঠিয়ে দিয়ে মান বাঁচিয়েছিলেন। অবশ্য মহাজোট ও সুশীল(?) সমাজের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী দলবাজ সংবাদমাধ্যমের সহায়তায় তাকে ও তার পরিবারকে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে অহর্নিশ যেভাবে অপমান করেছিল তার তুলনা মেলা ভার। সুশীল(?) ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর টেলিভিশনের টকশোতে এসে বিচারপতি আজিজের বাড়ির গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বìধ করে দেয়ার দাবি জানিয়ে তার শ্রেণীর অতীব নিু রুচির পরিচয় দিয়েছিলেন। একই তানিয়া আমীর ক’দিন আগে প্রেস ক্লাবে এক সেমিনারে একজন বিদেশী অতিথির সামনে সরাসরি দেশদ্রোহিতামূলক বক্তব্য রেখে বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে তার নিবিড় সম্পৃক্ততা প্রমাণ করেছেন। এ সম্পর্কে ১২ আগস্ট ‘আমার দেশ’ পত্রিকা যে সংবাদটি ছেপেছিল সেটাই এখানে হুবহু উদ্ধৃত করছি
‘জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমকে সন্ত্রাসী এবং জঙ্গিদের আখড়া বলে মন্তব্য করে তোপের মুখে পড়েছেন ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে একজন বিদেশী অতিথির সম্মানে আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজ অনুষ্ঠানে উপস্খিত হয়ে ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশকে মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, ইসলামি জঙ্গিরা এখানে বিশেষভাবে তৎপর। একের পর এক বোমা হামলা চালাচ্ছে ইসলামি জঙ্গিরা। বায়তুল মোকাররম মসজিদ সন্ত্রাসী এবং জঙ্গিদের সবচেয়ে বড় আখড়া। অতীতে চারদলীয় জোট সরকার এটাকে মদদ দিয়েছে। বর্তমান সরকারও এই জঙ্গিদের রক্ষা করছে। একজন বিদেশী অতিথির সামনে তানিয়া আমীরের এই বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচারের প্রতিবাদ জানান উপস্খিত কয়েকজন। তার বক্তব্যে রীতিমতো বিব্রত হন বিদেশী অতিথি ইসলামি বিশ্বের নেতা ড. মাহাথির কন্যা মেরিনা মাহাথির।’
দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমে তানিয়া আমীর এবং তার সাঙ্গাৎ সুশীলদেরই(?) জয়জয়কার। বর্তমান সেনাসমর্থিত সরকারও যে প্রকৃতপক্ষে সুশীল(?) সমাজেরই একটি ফন্সন্ট এই তথ্যটিও এত দিনে দেশের জনগণের জানা হয়ে গেছে। বাংলাদেশের মান গেলে বর্তমান সরকার যে অতিশয় পুলক বোধ করে সেই অভিজ্ঞতাও বিগত উনিশ মাসে আমাদের বহুবার হয়েছে।
বিগত জোট সরকারের আর এক সুবিধাভোগী নক্ষত্র সাবেক কেবিনেট সচিব এবং বর্তমানে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান জনাব সা’দাত হোসেন সেই সময় বিচারপতি আজিজ সম্পর্কে অত্যন্ত অবমাননাকর মন্তব্য করে বলেছিলেন, এই ভদ্রলোক এত প্রতিবাদ সত্ত্বেও কেন যে এখনো পদত্যাগ করছেন না তা আমি বুঝতে পারছি না। তার সেই মন্তব্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমি প্রশ্ন রাখছি, দুদক কর্তৃক বহুল আলোচিত গ্যাটকো মামলা দায়ের করার পরও তৎকালীন কেবিনেট সচিব কোন নৈতিকতার মানদণ্ডে তার চাকরি এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন সেটি আমি এবার বুঝতে পারছি না। নিজে যে কাজটি করবেন না সেই কাজ করার জন্য অন্যকে অযাচিত উপদেশ দেয়া নির্লজ্জ সুবিধাবাদিতা ব্যতীত কিছু নয়। সব সরকারের আমলে এজাতীয় সুবিধাবাদী আমলাদের কারসাজিতেই বাংলাদেশ সামাজিক ও অর্থনৈতিক খাতে কাáিক্ষত মাত্রায় অগ্রগতি অর্জন করতে পারছে না। ব্যক্তিজীবনে সততার জন্য প্রশংসিত বিচারপতি আজিজের প্রধান অপরাধ ছিল তিনি একবার জাঁদরেল সব সম্পাদককে মানহানি মামলায় তার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। এই সম্পাদকবৃন্দই পরবর্তীতে তার সুনামহানি ও জনগণের কাছে তাকে বিতর্কিত করার জন্য সিন্ডিকেটেড অসত্য-অর্ধসত্য সংবাদ ছেপেছেন। নির্মোহভাবে বিচারপতি এম এ আজিজের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করা হলে নির্বাচন কমিশনে বর্তমান গদিনসীনদের তুলনায় তাকে অধিকতর খলনায়ক প্রমাণ করার কোনো সুযোগ নেই। বাস্তবতা হচ্ছে, জনাব আজিজকে পরিকল্পিতভাবেই তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে দেয়া হয়নি। পাঠকদের স্মরণে থাকার কথা যে সাবেক এই বিচারপতিই দায়িত্ব গ্রহণের পর ভোটার লিস্ট নতুন করে তৈরি করার প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তার সেই উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করার জন্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ও অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম একজোট হয়ে সেই সময় নেতিবাচক প্রচারণার বন্যা বইয়ে দিয়েছিল। সর্বশেষে বিষয়টিকে আদালত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হলে সেখান থেকে নিদের্শনা আসে নতুন ভোটার লিস্ট করা যাবে না, পুরনোটিকেই হাল নাগাদ করতে হবে। কারা প্রস্তুত করেছিল সেই পুরনো ভোটার লিস্ট? আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক গঠিত নির্বাচন কমিশনের ২০০০ সালে তৈরি করা ভোটার লিস্টকেই ভিত্তি হিসেবে ধরতে আদালত বিচারপতি আজিজের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনকে বাধ্য করেছিলেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশন যখন নতুন করে ভোটার লিস্ট তৈরি করল তখন কিন্তু মহাজোট, সুশীল(?) সমাজ, সংবাদমাধ্যম ও আদালত কোনো পক্ষই বাধা সৃষ্টি করলেন না। উল্টো বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে প্রশংসা করে বলা হচ্ছে তারা নাকি কোটিখানেক ভুয়া ভোটারকে বাদ দিতে সক্ষম হয়েছেন। ২০০০ সালে তৈরি করা ভোটার লিস্টে যদি প্রকৃতপক্ষেই ভুয়া ভোটারের অস্তিত্ব থাকে তাহলে সেই বিচ্যুতির শতভাগ দায়ভার আওয়ামী লীগ প্রশাসনেরই তো বহন করার কথা। অথচ আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলবাজ সংবাদমাধ্যমে ২০০১ সালের নির্বাচনের পর থেকেই নির্লজ্জভাবে সর্বৈব মিথ্যা প্রচারণা চালানো হচ্ছে যে ভুয়া ভোটার অন্তর্ভুক্তির দুষ্কর্মটিও নাকি বিএনপি-জামায়াত জোটই করেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্খায় ভোটার লিস্টে ভুয়া ভোটার অন্তর্ভুক্ত করানোর দুরূহ কাজটি বিরোধী পক্ষ কিভাবে করতে পারল এমন পাল্টা প্রশ্ন করার মতো লোক জাতীয়তাবাদী দলে কখনো ছিল না। ভোটার লিস্ট নতুন করে তৈরির জন্য আজ যে ঘটা করে রাজধানীর পাঁচ তারা হোটেলে বিদেশী প্রভুদের সাথে খানাপিনা করা হচ্ছে সেই একই কাজ বিচারপতি এম এ আজিজকে কেন করতে দেয়া হলো না তার উত্তর আমরা কার কাছে খুঁজব ? স্বাধীন বিচার বিভাগই বা নতুন ভোটার লিস্ট তৈরির প্রয়োজনীয় কাজটি বিচারপতি আজিজকে করতে না দিয়ে সাবেক আমলা ড. শামসুল হুদাকে করতে দিয়ে কৃতার্থ বোধ করল কেন? তখনকার আদালতের নির্দেশানুযায়ী জনাব আজিজ ভোটার লিস্ট হালনাগাদের কাজটি দ্রুত এবং দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করতে পারেননি এটা ঠিক। সংবাদমাধ্যমে তার উপস্খিতি জড়তামুক্ত ছিল না এবং দুর্বল বাচনভঙ্গির কারণে তিনি জনগণের মনে আস্খা সৃষ্টি করতে সক্ষম হননি এমন অভিযোগও মানতে হবে। কিন্তু তিনি কোনো বিশেষ দলের প্রতি বর্তমান নির্বাচন কমিশনারদের মতো পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন এমন অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে না। তিনি নিরপেক্ষভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা করতে পারতেন কি না সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ, কারণ তাকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়া হয়নি। এবার সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পুনর্গঠিত ও স্বাধীনতাপ্রাপ্ত নির্বাচন কমিশনের তিন প্রধান ব্যক্তির পরিচয় এবং তাদের এ যাবৎকালের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করা যাক।
পক্ষপাতদুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার যে তিন ব্যক্তিকে নিয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠিত করেছে তারা তিনজনই সাবেক সামরিক ও বেসামরিক আমলা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা বিগত জোট সরকারের আমলে সচিব হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন। তার দেশের বাড়ি ফরিদপুর এবং তাদের গোটা পরিবার সেখানে আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবেই পরিচিত। ড. হুদার নিজস্ব বিবেচনায় জোট সরকার তার মেধার যথোপযুক্ত মূল্যায়ন করেনি, তার যোগ্যতা অনুযায়ী উচ্চতর পদে বসায়নি এবং সেই কারণে বিগত সরকারের ওপর তার চরম অসন্তুষ্টি তিনি নিয়মিতভাবেই জনসমক্ষে প্রকাশ করে থাকেন। তার অভিযোগের তালিকায় সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ব্যতীত তৎকালীন সব নীতিনির্ধারকই আছেন। ড. হুদা যে জনাব সাইফুর রহমানের ওপর প্রচণ্ড শ্রদ্ধাশীল সেটি গেল বছর ২৯ অক্টোবরের বিএনপি’র মধ্যরাতের ক্যু-এর প্রতি তার একনিষ্ঠ এবং আইন ও নিয়ম-নীতিবহির্ভূত সমর্থনই প্রমাণ করেছে। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিএনপি’র উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভক্তিকে জায়েজ করার জন্য যে ডকট্রিন অব নেসেসিটি (উসধয়ড়মষপ সফ ঘপধপঢ়ঢ়ময়ী) তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন সেটি বাংলাদেশে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন কমিশনের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) সাখাওয়াত হোসেনও আমার জানা মতে জোট সরকারের আমলেই সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেছিলেন। অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেলকে দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করায় নির্বাচন কমিশনের তৃতীয় ব্যক্তি অসন্তুষ্ট হতে পারেন। তবে সেনাসমর্থিত সরকারের শাসনামলে বাস্তবতাকে মেনে নেয়া সবার জন্যই মঙ্গলজনক। এই সাবেক সেনা কর্মকর্তার অবসরের হেতু কী ছিল তা আমাদের মতো আমজনতার জানার কথা নয়। কী কারণে জানি না বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীর এজাতীয় বিষয়-আশয়কে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখার একটি সংস্কৃতি চালু রয়েছে এবং কোনো গণতান্ত্রিক সরকারই এই রেওয়াজটিকে অদ্যাবধি ভাঙার সাহস দেখাতে পারেনি। যা-ই হোক, অবসরের পর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) সাখাওয়াত হোসেনের সুশীল(?) সমাজে উত্তরণ ঘটে এবং প্রথম আলো গোষ্ঠী ও সমমতাবলম্বী প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার বদৌলতে বেশ দ্রুততার সাথে তিনি রাষ্ট্রের প্রায় সব বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞে রূপান্তরিত হন। তৃতীয় নির্বাচন কমিশনার জনাব ছহুল হোসাইন একসময় জেলা জজ থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী সচিবে পরিণত হন এবং তৎকালীন আইন সচিব হিসেবে দক্ষতার সাথে দলের সেবা করেন। এহেন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের বাঙালি ঘরানার রাজনীতির দিকেই যে হেলে থাকবে তাতে বিস্মিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তার পরও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কাজকর্মে আমরা বিস্মিত হচ্ছি। তবে সেটি ভিন্ন কারণে। জেনারেল এরশাদের সামরিক গণতন্ত্রের আমলসহ ইত:পূর্বে কোনো নির্বাচন কমিশন এতটা সাহসের সাথে প্রকাশ্যে তাদের দলীয় পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করেননি। এই সাহস প্রদর্শনের জন্য আমি অন্তত ব্যক্তিগতভাবে ত্রিরত্নের গুণগ্রাহীতে পরিণত হয়েছি। আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে চরম দলবাজ হয়েও নিরপেক্ষতার ভড়ং দেখানোর যে সংস্কৃতি বাংলাদেশের সেক্যুলারদের মধ্যে চালু রয়েছে তার থেকে অবশ্যই প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও তার দুই সঙ্গী বের হয়ে আসতে পেরেছেন। বর্তমান পরিস্খিতি প্রকাশ্যেই পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশনের অধীনে চারদলীয় জোট আদৌ কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি না সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার মালিক জোটের নীতিনির্ধারকবৃন্দ।
জনাব সাইফুর রহমানের বাসগৃহে সরকারের বিশেষ বাহিনীর সহযোগিতায় সংঘটিত মধ্যরাতের ক্যু-এর পর বিএনপি’র স্ট্যান্ডিং কমিটির সব সদস্য আদালতে হলফনামা দিয়ে ওই কু-দেতার সংশ্লিষ্টতা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। এত কিছু করা সত্ত্বেও তারা ড. শামসুল হুদাকে তার বিএনপি ভাঙার এজেন্ডা বাস্তবায়ন থেকে ইঞ্চি পরিমাণ টলাতে পারেননি। অদ্যাবধি তার কাছে বিএনপি অর্থই হচ্ছে পছন্দের তিন ব্যক্তি সাইফুর রহমান, মান্নান ভূঁইয়া এবং মেজর (অব:) হাফিজ। বিএনপি’র গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারপারসন হচ্ছেন দলের প্রধান এবং তিনি দল পরিচালনায় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। দলটির বর্তমান অতীব জনপ্রিয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই ১৯৯১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত কোনো আসন থেকে পরাজিত হননি। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের দীর্ঘতম সময়ের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। এত সব ইতিহাসের কোনো মূল্যই নেই আমাদের অসীম সাহসী প্রধান নির্বাচন কমিশনার মহোদয়ের কাছে। এই হিম্মত প্রদর্শনের জন্য আমি তাকে অভিবাদন না করে পারছি না। চরম সুবিধাবাদী রাজনীতিক জনাব মান্নান ভূঁইয়াকে বিএনপি থেকে বহিষ্কারের জন্য তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা যত না আঘাত পেয়েছেন বিচিত্র কারণে তার চেয়েও মনে বেশি আঘাত পেয়েছেন ড. শামসুল হুদা। তার আচার-আচরণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে বেগম খালেদা জিয়ার এই অপরাধের পর তিনি আর শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দলটির নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা রাখেন না। কাজেই স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের এখন মহান দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের প্রতি অনুগত একটি আপসকামী বিএনপি’র জন্ম দেয়া। নতুন দল জন্ম দেয়ার ধাত্রীবিদ্যায় নির্বাচন কমিশনারবৃন্দ কতটা পারদর্শী সেটি দেখার জন্য দেশবাসীকে আরো কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে। এ দিকে আওয়ামী লীগের প্রতি এদের আনুগত্যের অন্ত নেই। আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমমনা সেক্যুলার দলগুলোর নেতৃবৃন্দকে নির্বাচন কমিশনে যে বিনয়ের সাথে অভ্যর্থনা জানানো হয় তাও দেখার মতো। কমিশনারদের মধ্যে রীতিমতো কুর্ণিশ করার প্রতিযোগিতা চলে আর কি! আর হবে নাই বা কেন? ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সরকারের মতো এই নির্বাচন কমিশনও তো বিদেশী কূটনীতিবিদদের নির্দেশে পরিচালিত মহাজোটের আন্দোলনেরই ফসল। কাজেই দেশবাসী যদি এমন আকাশ-কসুম কল্পনা করে থাকেন যে এই নির্বাচন কমিশন সব দলের অংশগ্রহণসাপেক্ষে একটি নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনে ইচ্ছুক তাহলে ডিসেম্বর মাসে তাদের হতাশই হতে হবে। ড. শামসুল হুদা ও অন্য কমিশনারদের আঁতাতের কারিশমা আগস্টের চার তারিখে সীমিত পর্যায়ের স্খানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। খুলনায় একজন প্রার্থীর পক্ষে সিল দেয়া ব্যালট পেপার এবং ব্যালট পেপারের অসংখ্য মুড়ি রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার সংবাদ প্রায় প্রতিদিন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে। একই রকম ভূতুড়ে ঘটনা ঘটেছে রাজশাহী, বরিশাল এবং সিলেটে। তার পরও নির্বাচন কমিশনের আহলাদের আর সীমা নেই। তারা জানেন যে এক তরফা নির্বাচনে বেছে বেছে আওয়ামী ঘরানার প্রার্থীদের জয়যুক্ত করানোর যে মিশন দেশ-বিদেশের প্রভুরা তাদের ওপর অর্পণ করেছিল সেই মহৎ কাজটির প্রথম পর্যায় শতভাগ সফলতার সাথে তারা সম্পন্ন করেছেন। সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং নির্বাচন কমিশন এখানেই বসে থাকেনি। নির্বাচনকে বৈধতা দেয়ার জন্য যুক্তরাজ্য থেকে সামন্তপ্রভুদের ডেকে নিয়ে এসেছে। লর্ড এরিক এভাবেরি এমনই একজন সাম্রাজ্যবাদী মহাপুরুষ। তিনি সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে বলেছেন, নির্বাচনে জরুরি অবস্খা নাকি কোনো বাধাই নয়। তার বক্তব্য নিয়ে আলোচনার পূর্বে এই বিশেষ লর্ডের পরিচয় পাঠকের জানা আবশ্যক।
মি. এরিক এভাবেরি ব্রিটিশ হাউস অব লর্ডসের একজন প্রবীণ সদস্য। ২০০৫ সালের ২৪ নভেম্বর ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ পত্রিকায় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল। সেই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল যে লন্ডনে ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম ফর সেক্যুলার বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠন গঠিত হয়েছে। সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন লন্ডন প্রবাসী আওয়ামী কলামিস্ট জনাব আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এবং এই সংগঠনের উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি হচ্ছেন লর্ড এরিক এভাবেরি। একই ব্যক্তি বাংলাদেশের অপর একটি সংগঠন চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস কমিশনেরও কো-চেয়ারম্যান। সংগঠনটির অপর কো-চেয়ারম্যান হলেন ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মিসেস সুলতানা কামাল চক্রবর্তী। চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস্ কমিশনের অন্য উল্লেখযোগ্য সদস্যরা হচ্ছেন বর্তমান সরকারের অঘোষিত সংবিধান উপদেষ্টা এবং রাজনৈতিক গুরু ড. কামাল হোসেনের কন্যা মিসেস সারা হোসেন, ড. জাফর ইকবাল, ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা ও স্বপন আদনান। এসব চিহ্নিত ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত সংগঠন বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের সপক্ষে কতটা ভূমিকা রাখবে সে বিচারের ভার পাঠকের ওপরই ছেড়ে দিলাম। তাৎপর্যের বিষয় হচ্ছে বর্তমান সরকার এই বিশেষ লর্ডটিকে ঢাকায় ডেকে এনেছেন বাংলাদেশ থেকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি নির্মূলের সরকারি পরিকল্পনার পক্ষে সাফাই গাইবার জন্য। লর্ড এরিক এভাবেরি দাবি করে থাকেন যে তিনি মানবাধিকার রক্ষায় নিয়োজিত একজন মহান ব্যক্তি। গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের কথিত এই পক্ষশক্তি জরুরি অবস্খার সপক্ষে ঢাকায় বলেছেন,
‘Everyone who had wanted to vote in the recent local government polls was able to do so without fear or hindrance. People were able to elect the candidate of their choice, without being impeded by state of emergency.’
(সাম্প্রতিক স্খানীয় সরকার নির্বাচনে যেসব ভোটার ভোট দিতে চেয়েছে তারা প্রত্যেকেই কোনো ভয়-ভীতি ছাড়া নির্বিঘেí তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে পেরেছে এবং জরুরি অবস্খা তাতে কোনো বাধার সৃষ্টি করেনি।)
গণতন্ত্র ও মানবাধিকারে প্রকৃত বিশ্বাসী কোনো ব্যক্তির পক্ষেই কোনো দেশে জরুরি অবস্খার এমন নির্লজ্জ ওকালতি করা সম্ভব নয়। এই একই লর্ড বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, সংখ্যালঘুদের অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে অতি সোচ্চার ছিলেন। তিনি লন্ডনে একাধিক বাংলাদেশবিরোধী সেমিনারের আয়োজন করেছেন যেখানে আমাদের মাতৃভূমি সম্পর্কে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়েছে। সেই সময় যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন আর এক সুবিধাবাদী আমলা জনাব মোফাজ্জল করিম। একদা আওয়ামী ভক্ত সচিব, পরবর্তীতে বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশ্বস্ত উপদেষ্টা এবং বর্তমানে সংস্কারপন্থী ভদ্রলোকটি সর্বদা নিজের চিন্তায় মশগুল থাকার কারণে দেশের কথা ভাবার সময় পাননি কখনো। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের এই দ্বিমুখী চরিত্রের সাথে বাংলাদেশের জনগণ দুই শ’ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের কল্যাণে সবিশেষ পরিচিত। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে এই উপমহাদেশের জনগণকে নির্যাতন করে এ দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করার জন্য দীর্ঘ দুই শ’ বছর ধরে এই চরিত্রের লর্ডদেরই পাঠানো হতো। যারা লর্ড উপাধি ছাড়াই আমাদের উপমহাদেশে পদার্পণ করতেন তারা এ দেশের জনগণের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানোর পুরস্কার হিসেবে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর অবশ্যই লর্ড উপাধিপ্রাপ্ত হতেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিুস্তরের করণিক জনৈক রবার্ট ক্লাইভ নবাব সিরাজদ্দৌলাহ্কে হত্যা করে ইংল্যান্ডে ফেরার পর লর্ড উপাধি লাভ করে লর্ড ক্লাইভ হয়েছিলেন। সেই লর্ড ক্লাইভ পরবর্তীতে আত্মহত্যা করেছিলেন, তবে সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। আপাতত আমাদের এটুকু উপলব্ধি করলেই চলবে যে মনস্তাত্ত্বিকভাবে লর্ড ক্লাইভের সাথে তার উত্তরসূরি লর্ড এরিকদের কোনো পার্থক্য নেই।
প্রশ্ন হলো বর্তমান সরকার এবং বশংবদ নির্বাচন কমিশন সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদী শক্তিকে ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এভাবে সম্পৃক্ত করে ফেলছে কেন? আমার বিভিন্ন রচনায় যে বিষয়ে জনগণকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছি তা হলো, সারা বিশ্বেই জনবিচ্ছিন্ন সরকারের আত্মরক্ষার কৌশলই হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের কাঁধে সওয়ার হওয়া। এ দিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিও বিভিন্ন দেশ লুণ্ঠন করার সুবিধার্থে শকুনের মতো এ ধরনের সরকারের অপেক্ষায়ই থাকে। আজকের বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এ জন্যই এ দেশে আজ উপহার হিসেবে অশ্বমেধের ঘোড়া আসে, পরিবারতন্ত্রবিরোধী সুশীল(?) সমাজের সাথে ঢাকায় রাহুল গাìধীদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয় এবং নানা কিসিমের লর্ডরা বাড়ি বয়ে এসে জরুরি অবস্খার পক্ষে সবক দিয়ে যায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যারা অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখল করেন তারা ইতিহাসের শিক্ষা নিতে ভুলে যান। ইরানের রেজা শাহ, চিলির পিনোশে, আর্জেটিনার গলটিয়েরি, পানামার নরিয়েগা, ভিয়েতনামের নগো দিন দিয়েম, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, পাকিস্তানের মোশাররফ এগুলো কেবল স্বৈরাচারী শাসকদের নাম নয়, এরা একেকজন একই সাথে সাম্রাজ্যবাদের দোসর এবং ইতিহাসের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের লৌহমানবদের ভাগ্যেও শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের এই প্রকৃতির নির্মম সিলমোহরই দেয়া আছে। তারা অপেক্ষা করতে থাকুন মহান আল্লাহ্তায়ালার নির্দিষ্ট সেই চূড়ান্ত পরিণতির। ইতোমধ্যে ক্ষমতার বলয়ের বাইরের স্বাধীনতাকামী শ্রমিক, কৃষক, জনতা ঐক্য গড়ে তুলুক বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ের আয়োজনে। বাংলাদেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের আজকের একমাত্র কাজ হচ্ছে যার যার অবস্খান থেকে সেই ঐক্য প্রক্রিয়ার অনুঘটকের মহান দায়িত্বটি পালন করা।
লেখক : মাহমুদুর রহমান, সাবেক জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা এবং বিনিয়োগ বোর্ডের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান