সুনামগঞ্জ-১ আসনে আ’লীগের প্রার্থী নিয়ে আলোচনার ঝড়

হাবিব সরোয়ার আজাদ, তাহিরপুর থেকে, যুগান্তর:
সুনামগঞ্জ-১ : (তাহিরপুর জামালগঞ্জ ধরমপাশা) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতনকে নির্বাচনী এলাকার ভোটার ও দলীয় নেতাকর্মীদের অধিকাংশই চেনে না। এমনকি আওয়ামী লীগের দলীয় নেতা-কর্মীরা কখনও কল্পনাও করেননি এমন ব্যক্তি হঠাৎ করেই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ২৩ নভেম্বর আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে মোয়াজ্জেম হোসেন রতন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এ সময় তার পাশে নিজ এলাকা ধরমপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনেরও কোন উল্লেখযোগ্য নেতা-কর্মীকে দেখা যায়নি। নির্বাচনী এলাকায় তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মতামতকে উপেক্ষা করে একজন ঠিকাদারকে দলীয় মনোনয়ন দেয়ায় দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। চমক সৃষ্টি করতে গিয়ে দলীয় হাইকমান্ডের এমন কাণ্ডে অনেকটা বেকায়দায় পড়েছেন তাহিরপুর, জামালগঞ্জ ও ধরমপাশা আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ। কে এই রতন? কি করে মনোনয়ন পেল? এমন প্রশ্ন এখন এলাকার ভোটারদের মধ্যে। ওয়ার্ড কিংবা ইউনিয়ন পর্যায়ের কোন নেতা-কর্মী না হয়েও স্থানীয় নেতা-কর্মীদের টেক্কা দিয়ে কিভাবে দলীয় মনোনয়ন পেলেন এটাই এখন জেলাজুড়ে এমনকি সিলেট বিভাগেও আলোচনা-সমালোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে।

সুনামগঞ্জ-১ (তাহিরপুর-জামালগঞ্জ-ধরমপাশা) আসনের ধরমপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের নওদার গ্রামের মৃত আবদুর রশীদের পুত্র ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। নামের আগে ইঞ্জিনিয়ার পদবি ব্যবহার করা প্রসঙ্গে রতন বলেনÑ এটা আমার পরিচিতি। আমি আসলে বুয়েটে পড়িনি। একটা কোর্স করেছি পলিটেকনিক থেকে। উপজেলা নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে পোস্টার ছাপিয়ে গণসংযোগ করে এখন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পেছনের রহস্য সম্পর্কে তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেনÑ ‘কোন রহস্য নেই, আমি মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলাম দল পছন্দ করেছে, তাই মনোনয়ন দিয়েছে। তিনি নিজেকে থানা কমিটির সদস্য বলেও দাবি করেন।

থানা কমিটির সদস্য হিসেবে রতনের বক্তব্যকে স্থানীয় নেতা-কর্মীরা বলেছেন, এটা ফাও কথা। তারা উল্টো জানিয়েছেন সদস্য তো দূরের কথা স্থানীয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে কখনও তার সম্পৃক্ততা ছিল না। এমনকি আওয়ামী লীগের কোন সাধারণ কর্মীও নন। এবার উপজেলা নির্বাচনের আমেজ বিরাজ করায় ইঞ্জিনিয়ার রতন আলোচনায় আসেন। তিনি উপজেলা নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ধরমপাশা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গণসংযোগ করেন। বিগত ঈদ ও পূজায় পোস্টার এবং ক্যালেন্ডার ছাপিয়ে এলাকার ভোটারদের শুভেচ্ছা জানান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তাহিরপুর-জামালগঞ্জ-ধরমপাশায় উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় প্রথম দিকে পছন্দের প্রার্থী তালিকার শীর্ষে সাবেক এমপি সৈয়দ রফিকুল হক সোহেল ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের নাম ছিল। এ ব্যাপারে ধরমপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মনিন্দ্র চন্দ্র তালুকদার বলেন- আমার কাছে সব কিছুই যেন এখনও অবিশ্বাস্য মনে হয়। সামনে এখনও সময় আছে দেখি কি হয়? উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল হাই তালুকদার তার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বললেনÑ ‘তাহলে কি থেকে কি হল, তা আর বলার অপেক্ষা থাকবে না। সাবেক সাংসদ সৈয়দ রফিকুল হক সোহেল বলেন, রতন স্থানীয় আওয়ামী লীগের কেউ নয়, এলাকায় তার তেমন কোন যোগাযোগ নেই, সিংহভাগ লোকই তাকে চেনে না। তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নুরুল আমিন বললেনÑ দলের কেউ নয়, তারপরও একজন ঠিকাদার ব্যবসায়ী কিভাবে দলীয় মনোনয়ন পেল সে প্রশ্ন থেকেই যায়। ছাত্রলীগ নেতা আবদুল খালেক জানান, ইঞ্জিনিয়ার রতনের নাম এই প্রথম শুনলাম। কোন কেরামতিতে তিনি মনোনয়ন পেলেন তা আল্লাহই জানেন। জানা গেছে, কানাডা আওয়ামী লীগের সভাপতি সারোয়ারের সঙ্গে রতনের ঘনিষ্ঠতার সুবাধে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। এই সুযোগকে রতন কাজে লাগান শেখ হাসিনা কানাডায় অবস্থানকালে। সেই সময় কানাডা আওয়ামী লীগের সভাপতি সারোয়ার শেখ হাসিনাকে সুনামগঞ্জ-১ আসনে রতনকে মনোনয়ন দেয়ার অনুরোধ জানান। জামালগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের কয়েকজন প্রথম সারির নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানানÑ সুনামগঞ্জ-১ আসনে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের পছন্দের বাইরে দলীয় প্রার্থী অপরিচিত একজন ঠিকাদার ব্যবসায়ীকে মনোনয়ন দেয়াটা দলের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। তারা বলেন, এ আসনে ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী নজির হোসেনের কাছে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত ৩২ হাজার ৮৭৪ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির সাংসদ নজির হোসেনকে ১ হাজার ৪৭৫ ভোটে পরাজিত করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট সৈয়দ রফিকুল হক সোহেল এমপি নির্বাচিত হন। বর্তমানে ৩টি উপজেলা ও ১টি থানাসহ ২২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-১ আসনের ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭ হাজার ৩১৮। নির্বাচনী এলাকায় বিএনপির রয়েছে প্রতিটি ওয়ার্ড ইউনিয়ন উপজেলা এমনকি গ্রাম পর্যায়েও শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থান। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি উপজেলায়ই বিভিন্ন কোন্দল আর গ্র“পিংয়ের কারণে সাংগঠনিক অবস্থা অনেকটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ঠিকাদার রতনকে দলীয় প্রার্থী করায় নির্বাচনে আসন রক্ষা করা কঠিন হবে। নির্বাচনের আগেই মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা হিসাব করতে গিয়ে ভরাডুবির আতংকে রয়েছেন। বিএনপির সাবেক সাংসদ নজির হোসেন সংস্কারপন্থী হওয়ায় এ আসনে তার মনোনয়ন পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়লেও শেষ মুহূর্তে দল থেকে তাকে প্রার্থী করা হতে পারে এমন আভাস রয়েছে। নজিরের স্থানে দলীয় প্রার্থী হিসাবে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছেন আরেক শক্তিশালী প্রার্থী অধ্যাপক ডা. রফিক চৌধুরী। এ দুই প্রার্থীরই তাদের এলাকায় রয়েছে দলীয় ও ব্যক্তিগত সমর্থক, অনুসারী, আছে বিশাল পরিচিতি। প্রতিপক্ষের প্রার্থীদের তুলনায় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোয়াজ্জেম হোসেন রতন কত ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হবেন বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। তাহিরপুর, জামালগঞ্জ ও ধরমপাশা উপজেলার আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের একটি বিরাট অংশ মনে করেন সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দুর্বল প্রার্থীর কারণে আসনটি দলের হাতছাড়া হবে। তারা আওয়ামী লীগের হারানো আসনটি পুনরুদ্ধারে রতনের বদলে সৈয়দ রফিকুল হক সোহেলকে মনোনয়ন দেয়ার জন্য শেখ হাসিনাসহ সংসদীয় কমিটির সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান।