সরকারের কাজের ধারাবাহিকতা না রাখলে সমস্যা হবে: প্রধানমন্ত্রী

সরকারের কাজের ধারাবাহিকতা না রাখলে সমস্যা হবে: প্রধানমন্ত্রী

ঢাকা, এপ্রিল ১৫ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)--প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চারদলীয় সরকারের আমলে আগের আওয়ামী লীগ সরকারের প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়ার উল্লেখ করে বলেছেন, সরকার একটি চলমান প্রক্রিয়া। একটি সরকারের কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা না করে তা যদি বন্ধ করে দেওয়া হয় তা হলে সমস্যার সৃষ্টি হবে।

বুধবার দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ মন্তব্য করেন।

রিপোর্টার্স ইউনিটির নেতারা এসময় সংগঠনটির উন্নয়নের জন্য তাদের পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চান। প্রধানমন্ত্রী তাদের জন্য এককালীন অনুদান ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনার আশ্বাস দেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

পানি ও বিদ্যুৎ সমস্যাকে 'বিরাট সমস্যা' হিসাবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, "সরকার একটি চলমান প্রক্রিয়া। একটি সরকারের কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা না করে তা যদি বন্ধ করে দেওয়া হয় তা হলে এধরণের সমস্যার সৃষ্টি হবেই।"

এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্প বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় বন্ধ করে দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, "আমরা সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার করেছিলাম। এছাড়া পাগলায় আরেকটি শোধনাগার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার সেই প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়। তারা যদি সেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে রেখে যেতো তা হলে পানির এই সমস্যার সৃষ্টি হতো না।"

ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎ না থাকা এবং হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার ঘটনায় 'বিস্ময়' প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "আগে থেকেই জনগণকে যদি অবহিত করা হয় কোন এলাকায় কতক্ষণ বিদ্যুৎ থাকবে না তাহলে ঐ এলাকার মানুষ আগে থেকেই নিজেদের কাজ গুছিয়ে নিতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী দেশের চলমান বিদ্যুৎ সমস্যার কথা উল্লেখ করে বলেন, "১৯৯৬ সালে আমরা যখন ক্ষমতা গ্রহণ করি, তখনও এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বিদ্যুৎ খাতে ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ করলেও এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে পারেনি।"

ওই টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, "আমাদের দুর্ভাগ্য বিএনপি সরকারের ব্যর্থতা ও দুর্নীতির কারণে আমাদের জনগণের কথা শুনতে হচ্ছে।"

ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আনার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী এসময় জানান। এছাড়া জল বিদ্যুৎ ও সৌর শক্তি কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বায়ু বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে বিগত জোট সরকারের 'ব্যর্থতার' কথা উল্লেখ করে বলেন, "জনগণের চাহিদা বাড়ার সাথে সামঞ্জস্য রেখে গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির একটা নীতিমালা আমরা করে রেখেছিলাম। সেই নীতিমালা অনুসরণ না করার ফলেই দেশে আজ এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।"

গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে তার সরকারের পরিকল্পনার কথাও শেখ হাসিনা জানান।

এলিভেটেড হাইওয়ে এ বছরই

চলতি বছরেই গাজীপুর, টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত এলিভিটেড হাইওয়ে নির্মাণের কাজ শুরু হবে বলে এসময় জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঢাকাসহ আশেপাশের এলাকায় যানজট নিরসন এর লক্ষ্য। এছাড়াও রিং রোড, স্কাই ট্রেন এবং জলপথ উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ে তোলার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, "জনগণ আমাদের ওপর যে আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে ভোট দিয়েছে আমরা ওয়াদা পূরণ করে সে আস্থা ও বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে চাই।"

এব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলের সহযোগিতা পাবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন।

শেখ হাসিনা ঢাকাভিত্তিক রিপোর্টারদের সংগঠন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) উন্নয়নের জন্য বিশ লাখ টাকা এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে রিপোর্টারদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা ও সেবার আশ্বাস দেন। এছাড়া রিপোর্টারদের আবাসন সমস্যা সমাধানে তাদের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণ করে তা ভাড়া সূত্রে ক্রয়ের (হায়ার-পারচেজ) চিন্তা ভাবনার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

মন্দা মোকাবেলাসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা

বিশ্ব মন্দা মোকাবেলায় সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "আমাদের অর্থনীতি বিশাল না হলেও বিশ্ব মন্দার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এব্যাপারে সরকার সম্পূর্ণ সজাগ রয়েছে। ইতিমধ্যেই টাস্ক ফোর্স গঠন করে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গড়ে তোলা হয়েছে সন্তোষজনক খাদ্য মজুদ।"

আওয়ামী লীগের প্রথম অঙ্গীকার দ্রব্যমূল্য সফলতার সঙ্গে কমিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতায় আনা এসেছে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "রেশনের চালের মূল্য আরো কমানো হয়েছে। পুলিশ, পোষাক শিল্পের শ্রমিকদের কমমূল্যে রেশন ব্যবস্থা করা হয়েছে।"

এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে তা উন্নয়নের লক্ষ্যে তার সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান।

শেখ হাসিনা খেলাধুলার উন্নয়নের লক্ষ্যে তার সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং যোগ্য ব্যক্তিরা যাতে খেলাধুলার নেতৃত্ব দিতে পারে সে কারণে ফেডারেশনগুলো নির্বাচিত হওয়া উচিত।

বিটিএমই প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাত

এর আগে বাংলাদেশ টেক্স্রটাইল মিলস্ অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমই) সভাপতি আব্দুল হাই সরকারের নেতৃত্বে ৩৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কার্যালয়ে সাক্ষাত করে। সাক্ষাতকালে বিটিএমই'র পক্ষ থেকে পিলখানায় নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য ৫১ লাখ টাকার চেক প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এসময় তারা দেশের বস্ত্রশিল্পের সম্ভাবনা ও সমস্যার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে এ শিল্পকে রক্ষা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেন।

বিটিএমই'র সাবেক সভাপতি এম মতিন চৌধুরী বস্ত্রখাতের সার্বিক উন্নয়নে প্রাইমারি টেক্স্রটাইল সেক্টরের ভূমিকা, গুরুত্ব ও অবদান সম্পর্কে একটি পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপন করেন।

সাক্ষাতকালে বিটিএমই'র পক্ষ থেকে প্রথানমন্ত্রীকে একটি ক্রেস্ট উপহার দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্দা মোকাবেলায় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের সহযোগিতা চেয়ে বলেন, "আপনাদেরও ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা থাকতে হবে। ব্যবসায় সব সময় লাভ হয় না। লোকসানও হয়।"

বস্ত্রখাতের উন্নয়নে সরকারের সব রকমের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, "আমরা ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প স্থাপন ও জিএসপি সুবিধা আদায় করতে পেরেছিলাম বলেই দেশের বস্ত্রখাতের এই উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে।"

হাসিনা বিগত জোট সরকারের সমালোচনা করে বলেন, "তারা দেশের উন্নয়ন করতে তো পারেইনি বরং দেশকে সাত বছর পিছিয়ে দিয়েছে।"

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের সমান গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার সরকার সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দেশের শিল্প কলকারখানা গড়ে তুলতে চায়।

কল-কারখানায় বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের বিটিএমই'র দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরররাহের অবস্থা বর্ণনা করে তা সমাধানের লক্ষ্যে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন।

এসময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড.মসিউর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ এবং বেক্স্রিমকো গ্র"পের চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান।