ওলট-পালট করে দে মা লুটেপুটে খাই|
-ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
বর্তমান দিন বদলের সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে একজন করে মানুষ খুন হচ্ছে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, রাহাজানি এখন অতি সাধারণ ঘটনা। প্রকাশ্য দিবালোকে খুন, স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি, অপহরণ, যেখানে-সেখানে কাউকে খুন করে খন্ডিত মস্তক ফেলে যাওয়া নৈমিত্তিক ঘটনা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছেন, এ সবই বিচ্ছিন্ন ঘটনা, সারাদেশে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এই যে, ব্যাপক উন্নতির এই ঘোষণার দিনই বাথরুমে পা পিছলে পড়ে কোমর মঁচকে তিনি এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সবকিছুর যখন এতোটা উন্নতি হচ্ছে তখন আমরাও তার স্বাস্থ্যের দ্রুত উন্নতি কামনা করি।
সাহারা খাতুনের এমনিতেই চোখের সমস্যা আছে। শেখ হাসিনার সমস্যা কানের। ডান কান না বাম কান এ নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। ফলে সমস্যার পরেও দুই কানে দুই মোবাইল লাগিয়ে উনি কথা বলছেন এমন ছবিও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী কানে কম শোনে আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চোখে কম দেখেন। এ নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র চলছে বেশ। ফলে তাদের দৃষ্টিতে সারাদেশে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি হওয়া অস্বাভাবিক কিছুই নয়।
ঢাকার গুলশান এলাকাকে এক বিচ্ছিন্ন জনপদই বলা যায়। সেখানে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মোড়ে মোড়ে পুলিশের চেক পোস্ট-ব্যারিকেড এসব স্থানে সিএনজি বা ট্যাক্সি থামিয়ে সিট-টিট উল্টে দেখা নারীদের ব্যাগট্যাগ চেক করা এসব নিয়মিতই চলছে। তারপরও কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত জুয়েলারি দোকানে হানা দিয়ে পাঁচ -সাতজন ডাকাত লুট করে নিয়ে গেছে দুই কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণালঙ্কার। এখানে পুলিশ কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি। শপিংমলের নিরাপত্তা কর্মীরা জাপটে ধরে দুই ডাকাতকে আটক করেছে। এখনও লুণ্ঠিত স্বর্ণালঙ্কারের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
আর প্রশ্ন? সেতো এখন ওজিল (ওপেন জেনারেল লাইসেন্স)। কাওরান বাজারে চাঁদাবাজির মহাল দখল করার জন্য এতো ভিড় ভাট্টার মধ্যেও প্রকাশ্য দিবালোকে তিনজনকে খুন করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে গেছে খুনিরা। নিশ্চয়ই কোথায়ও ভরসা আছে যে, তাদের ধরা হবে না। এখানে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি হয়। কে যে তার ভাগ পায়, কে যে পায় না সেটাও ধুলায় অন্ধকার। একইভাবে যেখানে সেখানে যখন তখন খুন হচ্ছে মানুষ। কোথায় ধড়, কোথায় মাথা, তারও কোন ঠিক নেই। খুন করে খুনিরা এখন আর মৃতদেহ লুকানোরও চেষ্টা করে না। যেখানে সেখানে ফেলে দিয়ে চলে যায়। ঝিনাইদহে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে কয়েকদিন আগে কারা যেন ফেলে গেছে এক যুবকের খন্ডিত মস্তক। দেহের অবশিষ্টাংশ এখনও পাওয়া যায়নি। কেউ খোঁজ করেছে কিনা? কে জানে।
২৯ ডিসেম্বরের (২০০৮) ডিজিটাল কারচুপির নির্বাচনে বিপুলভাবে বিজয়ী স্বৈরাচারি এরশাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় গঠিত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরপরই এই কান্ড শুরু হয়। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছিলেন যে, দেশব্যাপী যে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড শুরু হয়েছে তার জন্য নির্বাচনে পরাজিত বিরোধীদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলই দায়ী। সরকারি দলের কেউ এর সঙ্গে জড়িত নয়। ফলে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের পোয়া বারো অবস্থা দাঁড়িয়েছে। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, তারা খুন, জখম, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস যাই করুক না কেন, সে বিষয়ে তাদের পক্ষে ছাফাই গাইবার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই আছেন। ফলে লে-হালুয়া, সন্ত্রাসীরা এখন ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় বেপরোয়া। যে যেখানে যা পারছে লুটে নিচ্ছে। কেউ লুটছে জমি, কেউ লুটছে ঘর-বাড়ি টাকা কড়ি, কেউ লুটছে স্বর্ণের দোকান, মানি চেঞ্জারের টাকা। একেবারেই বিশৃংখলা চালু হয়েছে সমাজে। আবার কেউ ধরছে ভিন্ন পন্থা। সন্ত্রাসীরা করছে ব্যাপকভাবে অপহরণ বাণিজ্য। মানুষের শিশু সন্তান অপহরণ করে কোটি-লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করছে। অসহায় মানুষ এভাবেই জিম্মি হয়ে পড়েছে দিন বদলের সরকারের কাছে।
সবচাইতে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে টেন্ডারবাজি। এখন পেশাদার ব্যবসায়ীরা আর টেন্ডারের ধারে কাছেও যেতে পারছে না। টেন্ডার বাক্সে যাতে সরকারি দলের বাইরে আর কেউ কাগজ পত্র জমা দিতে না পারে সেজন্য প্রায় সর্বত্র আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনেই সরকারি দলের সদস্যরা সশস্ত্র পাহারা বসায়। ফলে তখন ওরা ভাগাভাগি হয়ে যায় টেন্ডার। সরকারকে ১০ লাখ টাকার কাজ ৩০ লাখ টাকায় করতে বাধ্য। এভাবে সরকারের শত শত কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে। ওলট পালট করে দে মা, লুটে পুটে খাই। লুটতরাজও চলছে ভালই। এ নিয়ে সরকারি দলের সদস্যরা নিজেরা এখনও চরম হানাহানিতে লিপ্ত। তারাও নানা উপদলে বিভক্ত। সে নিয়ে যাবে টেন্ডারের টাকার ভাগ। আমি বসে বসে আঙুল চুসব, তা কি হয়। ফলে গ্রুপে গ্রুপে গড়ে উঠছে সরকারি দলের ভেতর ক্যাডারবাহিনী। এখনকার প্রতিদিনের খবর হল টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি নিয়ে আওয়ামী লীগের গ্রুপে গ্রুপে সংঘর্ষ। কোথায়ও আবার সংঘর্ষ বাঁধায় আওয়ামী লীগের অতি ঘনিষ্ঠ এরশাদের জাতীয় পার্টির প্রতিদ্বনদ্বীদের সঙ্গে। মারামারি হানাহানি এখন প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা। কোথাও কোথাও তা খুনাখুনির পর্যায়েও গড়াচ্ছে। সরকার একেবারে নির্বিকার। মনে হয় তারা বলার চেষ্টা করছেন, এই এরকম করে না। মিলেঝিলে খাও। তাই কি আর হয়। যেখানে অর্থ আছে, সেখানে অনর্থ ঘটবেই। ফলে দেশ এখন সীমাহীন অনর্থের শিকার সরকার যে এই পরিস্থিতি মেনে নিয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। কারণ সরকারের অর্থমন্ত্রী, যিনি অর্থ লুটের দায়ে দন্ডিত স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদেরও অর্থমন্ত্রী ছিলেন। বাজেটে ঘোষণা করেছিলেন যে, আগামী তিনবছর ধরে কালো টাকা সাদা করা যাবে। তার অর্থ হলো এই যে, মহাজোটের যেসব লোকেরা ইতোমধ্যে মাল বানিয়ে ফেলেছেন তারা কালো টাকা সাদা করবেন এবং আগামী দু'বছর ধরে টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি, ছিনতাই-রাহাজানি, মুক্তিপণ প্রভৃতির মাধ্যমে দিন বদল সরকারের যারা ভাগ্য বদল করে নিতে পারবে তারাও যেন তাদের কালো টাকা সাদা করতে পারে। অথবা যে যেভাবে পার বানাও টাকা। তাহলে সমাজে এ শৃংখলা থাকবে কেমন করে। যে যেভাবে পারছে টাকা বানিয়ে দিচ্ছে।
কিন্তু আবুল মাল সাহেবের এই ঘোষণার আগে তার ভাবা উচিৎ ছিল যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিপুল টাকা অবৈধভাবে যারা লুট করেছিল তারাও ট্রুথ কমিশনে গিয়ে সে টাকা সাদা করে এনেছিল। মি. আবুল মাল সাহেবের সরকারই ঘোষণা দিয়েছে যে, ট্রুথ কমিশনে গিয়ে যারা অবৈধ পথে টাকা উপার্জনের কথা স্বীকার করেছে তাদের বিরুদ্ধে সরকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই সরকারি কর্মকর্তা। সরকার ঘোষণা করেছে এসব দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হবে। আবুল মাল সাহেব কি ভেবে দেখেছেন ভবিষ্যতে টাকা সাদা করা আওয়ামী মালেরা তেমন বিপদে পড়তেও পারেন। আবার জনগণের প্রতিরোধের মুখে এইসব ঘটনা ফুৎকারে যে উড়ে যায় তাও আমরা বিভিন্ন সময় লক্ষ্য করেছি।
একটি সামান্য অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে এই লেখায় ইতি টানব। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আমরা বেশ কয়েকজন ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসিন হলের টু-এ নম্বর কক্ষে থাকতাম। ঐ রুমগুলো প্রধানত সহকারি হাউজ টিউটরদের জন্য বরাদ্দ দেয়ার কথা ছিল। সেরকম কেউ হলে থাকতেন না। ফলে এসব রুম ছাত্রদের বরাদ্দ দেয়া হতো। আমাদের কয়েক রুম সামনে থাকতেন ছাত্রলীগের এক সশস্ত্র নেতা। তিনি একদিন তার রুমে আমাদের ডেকে পাঠালেন, ‘‘আপনাদের রুমটা আমাদের ছেড়ে দিতে হবে। কারণ আমার কাছে অনেক লোক আসে ওদের বসার জায়গা দেয়া যায় না।’’ বলে তিনি কোমর থেকে পিস্তল বের করে লিলেনের কাপড় দিয়ে মুছতে থাকলেন। ম্যাগজিন থেকে গুলীগুলো বের করে সেগুলোও যত্ন সহকারে মুছলেন। তারপর ম্যাগজিন পিস্তলে ঢুকিয়ে আমাদের বললেন, ‘কবে ছেড়ে দিচ্ছেন?' আমরা বললাম, ‘রুম ছেড়ে আমরা কোথায় যাব? থাকব কোথায়?' তিনি বললেন, প্রভোস্টকে বলুন। আমরা বললাম, ‘‘প্রভোস্ট কি আমাদের কথা শুনবেন। আপনি প্রভোস্টকে বলে আমাদের জন্য একটি রুমের ব্যবস্থা করে দেন। তিনি বললেন, ‘‘প্রয়োজন হলে বলব। তবে রুমটি কবে ছেড়ে দিচ্ছেন।’’ আমরা বললাম ‘আমাদের ক'টা দিন সময় দিন।' ‘মেছে থাকতে হলেও তো মেছ খুঁজতে হবে।' তিনি পিস্তল কোমরে গুঁজতে গুঁজতে বললেন ‘খুব তাড়াতাড়ি করবেন। রুমটি আমার খুব দরকার।'
সেটা ছিল '৭৫-এর আগস্ট মাস। ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে শেখ মুজিবের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর গোটা হলের সকল ছাত্র ছুটে যাচ্ছে, রেডিও রুমের দিকে। আমিও বের হলাম। বেরিয়ে দেখি ব্যাগ হাতে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাচ্ছে ছাত্রলীগের ঐ সশস্ত্র ক্যাডার। আমরা রেডিও শোনার জন্য রেডিও রুমের দিকে এগিয়ে গেলাম।
