স্বাধীনতার প্রথম ঘোষক : এ টু জেড-৬

স্বাধীনতার প্রথম ঘোষক : এ টু জেড-৬
কিন্তু এ থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া পুরোপুরি ভুল হবে যে মেজর জিয়া না থাকলে প্রতিরোধ যুদ্ধ হতো না, বা এটাও মনে করা ঠিক হবে না যে, জিয়াউর রহমান একজন অখ্যাত সেনা কর্মকর্তা থেকে হঠাৎ করে এমন এক জাতীয় নেতায় পরিণত হয়েছেন, যিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জনগণকে নেতৃত্ব দিতে পারেন। ইতিহাসে এরকম অলৌকিক ঘটনা ঘটে না। রেহমান সোবহান এক লিখিত প্রকাশ্য বক্তৃতায় বলেন, ‘‘১৯৭১ সালের বাংলাদেশে এটা কল্পনা করা অবাস্তব ছিল যে, একজন অখ্যাত সেনা কর্মকর্তা কোনো এখতিয়ার ছাড়াই সাড়ে সাত কোটি বাংলাদেশীর স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন এবং সেটা যে কেউ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করবেন এটাও মনে করা সম্ভব ছিল না। সে ধরনের বেনামী ঘোষণা আন্তর্জাতিক মহলে অবশ্যই এমন আশঙ্কার জন্ম দিতে পারত যে বাংলাদেশ নৈরাজ্যের কবলে পড়ছে। সে সময় আইনগত দিক থেকে গ্রহণযোগ্য অর্থে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার গ্রহণযোগ্য এখতিয়ার যে একমাত্র ব্যক্তির ছিল তিনি বঙ্গবন্ধু, কারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সেই বৈধতার অধিকারী তিনি হয়েছিলেন এবং বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে কথা বলার পরিপূর্ণ রাজনৈতিক ম্যান্ডেট তিনি তাদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন।
’’ কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রয়োজনীয় এখতিয়ার বা কর্তৃত্ব থাকা সত্ত্বেও তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার পরিবর্তে শত্রুর কাছে আত্মসমর্পনের পথ বেছে নেন। সে পরিস্থিতিতে বর্বর সামরিক হামলায় আক্রান্ত কোটি কোটি মানুষ প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার তাড়না অনুভব করেন এবং তারা নিজ নিজ মনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। জনমনের এই তাড়নারই প্রতিফলন ঘটে মেজর জিয়ার ঘোষণায় এবং সে কারণেই পাক বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত জনগণের মনে ও বিশেষ করে যারা স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশ নেয়ার তাড়না অনুভব করছিলেন, তাদের মধ্যে ওই ঘোষণা ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করে।
এখানে উল্লেখ করা জরুরি যে, শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে সাংবিধানিক উপায়ে লড়াই-সংগ্রামের একজন নেতা ছিলেন। তার এই অতীত ইতিহাসের কারণেই ১৯৭১ সালে জাতির জীবনের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে সাহসী জননেতার ভূমিকা পালনে ব্যর্থতা সত্ত্বেও তারচেয়ে উত্তম কোনো বিকল্প ছিলো না বলে একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব ও অত্যন্ত গুরুত্বসম্পন্ন রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হিসেবে তার ভাবমূর্তি অটুট ছিল। সে কারণেই মেজর জিয়ার ঘোষণার সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম সংশ্লিষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল, যদিও প্রথম ঘোষণায় তার নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে এটাও সত্য যে, শেখ মুজিবের উল্লেখ ছাড়াই যে ঘোষণা জিয়া দিয়েছিলেন সেটি যে প্রভাব সৃষ্টি করেছিল, আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নানের ঘোষণা তা করতে পারেনি। শেখ মুজিবুর রহমান যদি সত্য সত্যই স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন এবং সেটা প্রচারিত হতো, তাহলে তার ফলাফল যে আরো কত বিরাট হতো সেটা বলাই বাহুল্য। মনে রাখা দরকার, ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে তখন বিদেশী সাংবাদিকরা ভিড় করছিলেন। তারা এ ধরনের একটা ঘোষণা পেলে সেটা লুপে নিয়ে দেশ-দেশান্তরে প্রচার করতেন। এই অবস্থায় তাদের কাছেও এই ঘোষণা না পাঠিয়ে গোপনে ওয়ারলেসে চট্টগ্রাম পাঠানোর ব্যাপারটি শুধু বোকা লোকেই বিশ্বাস করতে পারে। যুদ্ধ চলার ৯ মাসে গণহত্যা ইত্যাদি কিছু রিপোর্ট বিদেশী সাংবাদিকরা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু কেউ স্বাধীনতার ঘোষণার কোনো উল্লেখ করেননি। এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ৬ নবেম্বর ১৯৭১ নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘‘আমি যতদূর জানি তিনি নিজে (শেখ মুজিবুর রহমান) স্বাধীনতা দাবি করেননি, এমনকি এখনো করেন না।’’
‘শেখ মুজিব কেন ২৫ মার্চ রাতে নিজ বাসভবনেই ছিলেন' সে সম্পর্কে শাহজাহান সিরাজের বক্তব্য সাপ্তাহিক বিচিত্রার (স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা ১৯৯০, ১৮ বর্ষ-৪৫ সংখ্যা ২০ মার্চ ৯০/৩ চৈত্র '৯৬) ২৫ পৃষ্ঠায় ২৫ মার্চের ‘ঢাকা গণহত্যার সূচনাপূর্ব' নামে একটি প্রবন্ধে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৭০-এ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের সময় গঠিত স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম প্রধান শাহজাহান সিরাজ ২৫ মার্চ রাতে ছিলেন মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজের দোতলায়, তিনি রাত ১১টায় ইকবাল হল থেকে বের হয়ে এসেছিলেন। ২৫ মার্চের ঢাকা এবং সেই কালোরাতের গণহত্যা সূচনা সম্পর্কে শাহজাহান সিরাজ বলেন, ‘‘২৩ মার্চ থেকেই আমরা নিশ্চিত হয়ে পড়েছিলাম যে, ক্র্যাকডাউন হচ্ছে। ২৩ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা অর্পণের কিছুক্ষণ পর দুপুরের দিকেই খবর পেলাম, পাক সামরিক জান্তা আমাদের বিরুদ্ধে চরম ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে। সেদিন রাতে ইকবাল হলেই ছিলাম বেশ সতর্কতার মধ্যে। কিন্তু কিছুই হলো না। সারা শহরে থমথমে অবস্থা বিরাজমান। ২৪ মার্চ একই আশংকায় কাটলো। সারারাত এসএম হলে সিরাজুল আলম খান, আসম আব্দুর রব, সুমন মাহমুদ এবং আমি আমাদের পরবর্তী কর্মকান্ড সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করলাম। ২৫ মার্চ সকালের দিকে বাঙ্গালী সৈনিকেরা এলেন ইকবাল হলে পাকবাহিনীর আক্রমণে সম্ভাবনার কথা জানাতে। পিলখানা এবং পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ থেকেও আমাদের জানানো হলো। সকালে ১১টার সময় এসব খবর জানাতে শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গেলাম। তিনি বললেন, আস্তানা ঠিক হয়ে গেছে সময় মতো তোরা সেখানে চলে যাবি। শেষবারের মতো তার কাছে গেলাম রাত সাড়ে ন'টায়। তখন আমার সঙ্গে ছিল আসম রব, আব্দুল কুদ্দুছ মাখন। অনেক আলোচনার পর রাত সাড়ে দশটার দিকে তিনি আমাদের চলে যেতে বললেন এবং সর্বশেষে জানালেন পূর্ব নির্ধারিত স্থানে তিনিও চলে আসবেন। দেখলাম ৩২ নম্বরের বাড়ির পেছন দিকে শেখ মুজিবের বেরুনোর ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর থেকে রাত সাড়ে দশটায় বের হয়ে ইকবাল হলে ফিরে আসলাম। হলের অধিকাংশ ছাত্র তখন চলে গেছে। হলে তখনও খসরু, চিশতি, হেলালুর রহমান (২৫ রাতে ইকবাল হলে নিহত) এবং আরো কিছু ছাত্র অবস্থান করছিল।’’
আরেফ আহমদের বক্তব্য (সাপ্তাহিক বিচিত্রা, স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা ১৯৯০, ১৮ বর্ষ-৪৫ সংখ্যা ২০ মার্চ ৯০/৩ চৈত্র '৯৬) : ২৫ মার্চ সকালেই আমরা নিশ্চিত হলাম যে আজ রাতেই পাকবাহিনী আক্রমণ শুরু করবে। সেদিন ইকবাল হলে (বর্তমান জহুরুল হক হল) প্রায় ৫০ ভাগ ছাত্র অবস্থান করছিল। সকাল থেকেই ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির ব্যায়ামাগারে চলছিল প্রচুর ক্যামিক্যালস দিয়ে বোমা তৈরি। সকাল ১১ টার দিকে ইকবাল হলে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের নিউক্লিয়াসের এক সভা বসে।এতে নিউক্লিয়াসের তিন সদস্য সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমদ ছাড়াও অংশ নেন শাহজাহান সিরাজ, আসম আবদুর রব, স্বপন কুমার চৌধুরী স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রথম প্রস্তাবক এবং পরে শহীদ হয়েছেন।আলোচনায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় শেখ মুজিবকে যুদ্ধের সময় আমাদের সঙ্গে রাখার।এ ব্যাপারে যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয় এবং শেখ মুজিবকে আত্মগোপনে রাখার জন্য জিঞ্জিরার কাছে কালাতিয়ায় জায়গা নির্ধারণ করা হয়। সেখানে বোরহান উদ্দিন গগনের (আওয়ামী লীগের তৎকালীন এমএনএ) বাড়িতে শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সকল কেন্দ্রীয় নেতার মিলন কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়।
২৫ মার্চ রাত ৯টা পর্যন্ত আমরা মোটামুটিভাবে নিশ্চিত ছিলাম যে, শেখ মুজিব আমাদের সঙ্গে ওখানে যাবেন। তবে এর আগে (মধ্য মার্চে) শেখ মুজিবের সঙ্গে আমাদের আলোচনার সময় কিছুটা বুঝতে পেরেছিলাম, উনি মানসিকভাবে আমাদের সঙ্গে যাওয়ার ব্যাপারে প্রস্তুত ছিলেন না। ২৫ মার্চ দুপুর বেলায় আসম আব্দুর রবের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের একটি গ্রুপকে অস্ত্রসহ নদীর ওপারে কোনাখোলায় (জিঞ্জিরায়) পাঠানো হয়।’’
আসম আব্দুর রবের বক্তব্য (সাপ্তাহিক বিচিত্রা, স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা ১৯৯০, ১৮ বর্ষ-৪৫ সংখ্যা ২০ মার্চ ৯০/৩ চৈত্র '৯৬) : ২৫ মার্চ বিকাল ৪টায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি টেলিফোনে আমাকে জানালেন, রাত বারোটায় ক্র্যাকডাউন হবে। এরপর সন্ধ্যা ৬টার দিকে সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মণি, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ ও আমিসহ বেশ কয়েকজন ছাত্র যুব নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বাসায় যাই। আমরা শেখ মুজিবকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়ার একটি পরিকল্পনা পেশ করি। কিন্তু শেখ মুজিব রাজি না হয়ে বললেন, ‘‘তোরা চলে যা আমার জন্য চিন্তা করিস না।’’ এরপর আমি মুজিব ভাইকে বললাম, আমাকে যে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী রাত ৮টায় বুড়িগঙ্গা পার হতে হবে, আপনার খবর জানাবো কিভাবে? মুজিব ভাই এর উত্তর না দিয়ে আমার হাতে ১২ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় দিলেন।’’
১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া রাওয়ালপিন্ডি থেকে ঢাকা এলেন এবং ওই দিনই তিনি তার জেনারেলদের নিয়ে বসলেন। পরদিন ১৬ এবং ১৭ মার্চ তিনি একান্ত বৈঠক করলেন শেখ মুজিবের সঙ্গে। মাসুদুল হক ‘বাঙ্গালী হত্যা এবং পাকিস্তানের ভাঙন' গ্রন্থে লিখেছেন,
‘‘ শুরুতেই সমস্যা দেখা দিলো আলোচনা কোথায় হবে দু'জনের মধ্যে এ নিয়ে। শেখ মুজিব বললেন তিনি ড্রইংরুমে কথা বলবেন না। কেননা গোপন মাইক্রোফোন থাকতে পারে। তাদের কথা টেপ হয়ে যাবে। তিনি কথা বলতে চান প্রেসিডেন্টের শোবার ঘরে বসে এবং এ নিয়ে কিছু সময় হালকা বিতর্কও হলো। শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন তিনি এবং প্রেসিডেন্ট দু'টো চেয়ার প্রেসিডেন্টের প্রধান শোবার ঘরের বাথরুমের পাশে নিয়ে বসতে নির্দেশ দিলেন। শুরুতেই শেখ মুজিব ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় ৪ দফা দাবি পূরণের আহবান জানান, তার কথা উল্লেখ করলেন। বললেন, এতে পরিস্থিতির একটি আইনগত স্বীকৃতি দেয়া হবে। এরপরই শাসনতন্ত্র রচনার কাজ শুরু হবে। জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত দুই প্রদেশের সদস্যরা বসবেন আলাদা আলাদাভাবে। তারপর দু' দলের রচিত খসড়া নিয়ে বসা হবে একসঙ্গে। ছাঁটকাট এবং নতুন সংযোজনের প্রয়োজন পড়লে করা হবে। শাসনতন্ত্র তৈরির এই অন্তর্বর্তী সময়ে ইয়াহিয়া খানই থাকবেন প্রেসিডেন্ট। সকল নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে তার হাতে। ইয়াহিয়া বললেন, তিনি ক্ষমতা হস্তান্তরে অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং সামরিক আইনের অবসান চান। মুজিবের পরামর্শ তিনি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবেন। তবে তার আগে মুজিবকে যা করতে হবে তা হচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় সমঝোতায় আসা। সরকার গঠনে তাকে দেশের দুই অংশের প্রতিনিধিত্ব রাখতে হবে। এজন্য তাকে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান দলের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে হবে। ইয়াহিয়া খান তাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, রাজনৈতিক দলগুলোর মতো প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে তারও নিজস্ব বিকল্প রয়েছে। যে ব্যবস্থা করা হোক না কেন তার অনুমোদন প্রয়োজন। এর চেয়ে সহজবোধ্য কথা আর কি হতে পারে? ইয়াহিয়া কি বলতে চাইছেন মুজিব তা বিলক্ষণ অনুধাবন করেন। সরকার গঠন করতে হলে তাকে ভুট্টোর সহযোগিতা নিতেই হবে, তার দলকে সরকারের অংশ করতে হবে। শেষ জানুয়ারিতে ভুট্টো যে কথা বলেছিলেন, তাকে ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী করতে হবে। ইয়াহিয়া সেই কথারই পুনরুক্তি করলেন। কি করবেন মুজিব? ভুট্টোকে সে সময় সরাসরি বিমুখ করেছিলেন। ইয়াহিয়াকে পারবেন কি? পারলেন না। সমঝোতায় এলেন ১৯ মার্চের একান্ত বৈঠকে। দু' দিনের ১৬ এবং ১৭ তারিখের একান্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট তার দু'জন সিনিয়র সামরিক উপদেষ্টাকে নিয়ে বসলেন শেখ মুজিবের সঙ্গে। তার পাশে বসলেন তাজউদ্দিন আহমদ, ড. কামাল হোসেন ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম। বৈঠকে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়া হলো এই- এক. সামরিক আইন তুলে নেয়া হবে, দুই. অন্তর্বর্তী সময়ে ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট থাকবেন, তিন. প্রাদেশিক সমস্যা নিরসনে কমিটি করা হবে-একটি পূর্ব পাকিস্তান এবং অপরটি পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য, চার. প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হবার পর দুই আঞ্চলিক কমিটি একটি একক বডি হিসেবে জাতীয় পরিষদে বসবে খসড়া শাসনতন্ত্র তৈরির জন্য। সিদ্ধান্ত হয় ১৮ তারিখ বৈঠক স্থগিত থাকবে। ইতিমধ্যে দু' দল সম্মত সিদ্ধান্ত এবং এর বাস্তবায়নে খুঁটিনাটি দিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে। এই যে সমস্ত সিদ্ধান্ত এতে কোনোভাবেই ধারণা করার সুযোগ নেই যে, ইয়াহিয়া এবং তার জেনারেলরা শেখ মুজিবকে নিয়ে খেলছেন। এতে পরিষ্কার মনে হবে তারা সদুদ্দেশ্য নিয়েই বৈঠক করছেন। এই ভালমানুষী চেহারার আড়ালে তারা তাদের দানবীয় তৎপরতাকে আড়াল করতে চাইছেন, এ আর কারো নজরে না পড়ুক-শেখ মুজিবের দৃষ্টিকে ফাঁকি দেয়া সম্ভব হয়নি। কেননা, তখনও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য আসছে অবিরাম। ১৬ তারিখে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একান্ত বৈঠক শেষে তিনি বৃটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশনে (বিবিসি) মাইকেল ক্লেটনকে এক সাক্ষাৎকার দেন, যা প্রচারিত হয় ওই দিনই। ক্লেটন প্রশ্ন করেন : যদি বর্তমানের অনিশ্চিত অবস্থা অব্যাহত থাকে, তাতে এ সম্ভাবনা রয়েছে যে, স্বাধীনতার শ্লোগান পরিস্থিতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যে ক্ষেত্রে সংকট সমাধানে সমঝোতার কোনো সুযোগ থাকবে না? শেখ মুজিব জবাবে বললেন, পশ্চিমা সৈন্যদের পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানো হচ্ছে। তারা নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির কাজে ব্যস্ত রয়েছে। এর পশ্চাতের উদ্দেশ্য কি? পূর্ব পাকিস্তানীরা নিরস্ত্র। আমরা শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম চালাতে চাই। এতো যুদ্ধ নয়। কিন্তু পরিষ্কার বলতে চাই যে, ৭ কোটি জনগণকে কোনো শক্তি দাবিয়ে রাখতে পারবে না। এক বা দুই বছর ধরে রক্তপাত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনাও প্রবল যে, কয়েকজন নেতার জীবন উৎসর্গ করতে হতে পারে। কিন্তু জনগণের সংকল্প দৃঢ় এবং অটল এবং তাদের দাবিয়ে রাখা যাবে না। নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হবে।
আর ১৭ মার্চ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক শেষে ধানমন্ডির বাসভবনে ফিরলে এক বিদেশী সাংবাদিক তার কাছে জানতে চান : এখনও যে বহু সৈন্য পূর্ব পাকিস্তানে আনা হচ্ছে, তা তিনি জানেন কি না। শেখ সাহেব বলেন, বাংলাদেশে যা কিছু হচ্ছে তার প্রতিটি খবরই আমি রাখি। ১৭ মার্চ দু' পক্ষ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও তার দুই সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তা এবং শেখ মুজিব ও তার সহকর্মীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, পরবর্তী বৈঠক বসবে একদিন পর ১৯ মার্চ। ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট তার আইন বিষয়ক উপদেষ্টা বিচারপতি এ আর কর্নেলিয়াসকে ডেকে পাঠান। তারা ১৮ তারিখেই পৌঁছে যান ঢাকা। ১৯ মার্চ সকাল ১১টায় শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে আবারও একান্তে বৈঠক হলো। প্রেসিডেন্ট হাউস থেকে বেরিয়ে আসার পর গাড়িতে ওঠার প্রাক্কালে এক বিদেশী সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করলেন : কবে পর্যন্ত অগ্রগতি সম্পর্কে জানাতে পারবেন?
শেখ সাহেব হেসে বললেন, অপেক্ষা করুন।
স্যার আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন না। কবে আপনি শেষবারের মতো হাসবেন?
উত্তর : এ বড় কঠিন প্রশ্ন। আপনি নিজেই আচ করুন।