আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ও ভারতের প্রত্যাশা পূরণ
-মো. নূরুল আমিন
১৯৯৬ সালে দ্বিতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পর প্রখ্যাত ভারতীয় সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার স্টেটস্ম্যান পত্রিকায় "New Government in Dhaka : New Delhi's Expectations" শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। নিবন্ধটি তিনি শুরু করেছিলেন মধ্যরাতের একটি টেলিফোন কল দিয়ে। তার শুরুটা ছিল এমন, আইকে গুজরালের বাসায় মধ্যরাতে হঠাৎ একটি টেলিফোন বেজে উঠলো। তিনি বিস্ময়ের সাথে দেখলেন, অপর প্রান্ত থেকে বাংলাদেশের নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আবদুস সামাদ আজাদ হ্যালো বলছেন। এতে জনাব গুজরাল সম্পর্কের উষ্ণতা অনুভব করলেন। হঠাৎ করে তার মধ্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সেন্টিমেন্ট ফিরে আসলো। একুশ বছর আগে শেখ মুজিবের মৃত্যুর সাথে সাথে বন্ধুত্বের যে অনুভূতির কবর রচিত হয়েছিল হঠাৎ তা জেগে উঠে দু'কূল প্লাবিত করলো। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত সহায়তা করেছে। তাদের অনেক সৈন্য প্রাণ দিয়েছে। শুনতে অদ্ভুত লাগবে যে, তাদের স্মরণে বাংলাদেশে কোনও স্মৃতিস্তম্ভ তো দূরের কথা একটা ইট দিয়ে তার চিহ্নও রাখা হয়নি। প্রবন্ধকার আশা প্রকাশ করে বলেছেন যে, এই স্মৃতিকে জিইয়ে রাখার জন্য আওয়ামী লীগ উদ্যোগ নেবে। তিনি বলেছেন যে, শেখ হাসিনার সরকার যে সময় ভারতীয় বাহিনী ও বাংলাদেশ মুক্তি বাহিনীর যৌথ রক্তে বাংলার মাটি রঞ্জিত হচ্ছিল সে দিনগুলোতে ফিরে যেতে চায়। তিনি আরো বলেছিলেন যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে দেশটির পররাষ্ট্র সচিব সালমান হায়দার তার প্রথম সফরে আওয়ামী লীগ সরকারের বন্ধুত্বের উষ্ণতায় অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। যে আমলারা পূর্ববর্তী সরকারের আমলে নিশ্চুপ ছিলেন, আস্তে আস্তে তারা সহজ হচ্ছেন।
কুলদীপ নায়ার এরপর দু'দেশের সম্পর্ক এবং দেনা-পাওনা নিয়ে অনেক কথা বলেছেন, বলেছেন তাদের প্রত্যাশার কথা। তিনি গঙ্গার পানি ভাগাভাগির সমস্যাকে বাংলাদেশের জন্য emotionally কাশ্মীর আখ্যায়িত করে বলেছিলেন যে, এই সমস্যাটির আশু সমাধান হওয়া প্রয়োজন। তার ধারণা অনুযায়ী পানি ভাগাভাগি প্রশ্নে ভারত-বাংলাদেশ চুক্তি হয়ে গেলে বিনিময়ে ভারত বাংলাদেশের উপর দিয়ে সাতবোন নামে খ্যাত তার গোলযোগপূর্ণ ও দুর্গম সাতটি রাজ্যের সাথে যোগাযোগের লক্ষ্যে ট্রানজিট করিডোর দাবি করতে পারে। পাশাপাশি তারা চট্টগ্রাম বন্দর, বাংলাদেশের গ্যাস ও কয়লা সম্পদ ব্যবহার এবং ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনের জন্য বাংলাদেশকে কাজে লাগাতে পারে। জনাব নায়ার অবশ্য তার প্রবন্ধে এই প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার পাশাপাশি একটি আশংকার কথাও বলেছেন এবং সেটি হচ্ছে, বিএনপি-জামায়াতের বিরোধিতা। তার ধারণা ভারতের চাহিদাগুলো পূরণ করতে গেলে বিএনপি এবং জামায়াত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রবল বিরোধিতা করবে এবং জনগণের ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্টকে উস্কিয়ে দেবে।
এই নিবন্ধটিতে আমি দু'টি বার্তা পেয়েছিলাম। এক. আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসায় ভারতীয় নেতৃত্বে বন্ধুত্বের উষ্ণতা ও মুক্তিযুদ্ধের সেন্টিমেন্টের প্রত্যাবর্তন এবং দুই. ভারতের পাঁচটি দাবী পূরণের পরিবেশ সৃষ্টি। এই দাবীগুলো হচ্ছে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে নিহত ভারতীয় সৈনিকদের স্মৃতিকে ধরে রাখা, ট্রানজিট করিডোর প্রদান, চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দান, বাংলাদেশের গ্যাস ও কয়লা ব্যবহারের সুবিধা দান এবং পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা প্রদান। এছাড়াও এতে আরেকটি বার্তা ছিল এবং তা হচ্ছে উপরোক্ত সুবিধাগুলো পাবার পথে জামায়াত-বিএনপির প্রতিবন্ধকতা। আওয়ামী লীগ ঐ সময় ৫ বছর ক্ষমতায় ছিল এবং তাদের নৈকট্যের সুযোগে ভারত এই সুযোগগুলো আদায়ের জন্য যে চেষ্টা করেনি তা নয়; কিন্তু জনপ্রিয়তা হারানোর ভয় অথবা অন্য যেকোন কারণেই হোক না কেন ভারতের এই দাবীগুলো তারা নিত্তি করতে পারেননি। এমনও হতে পারে যে, পুনরায় ক্ষমতায় যাবার ব্যাপারে তারা এতোই নিশ্চিত ছিলেন যে, তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত না নিয়ে আস্তে ধীরে চলার নীতিকেই তারা অনুসরণ করেছিলেন। ভারত অবশ্য শেখ হাসিনার সাথে ফারাক্কা চুক্তি করে ‘‘কাশ্মীর’’ সমস্যার সমাধান করেছে; ৫ বছর মেয়াদী চুক্তির পরিবর্তে ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তি উভয়ের দৃষ্টিতেই বদান্যতা, বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী পানি পাক বা না পাক সেটি ভিন্ন কথা। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। কিন্তু ভারত তার আশা ছাড়েনি। সবুরে মেওয়া ফলে। তারা সবর করেছে, অধ্যবসায়ী হয়েছে এবং কৌশল পরিবর্তন করে সাত বছর পর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছে। অভিযোগ রয়েছে যে, আর্মি, সিভিল ব্যুরোক্র্যাসি, নির্বাচন কমিশন এবং কেয়ারটেকার সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট উচ্চাভিলাষী কিছুসংখ্যক কর্মকর্তার যোগসাজশে পরিকল্পিত কারচুপি ও অাঁতাতের মাধ্যমে এই দলটি ক্ষমতায় এসেছে এবং প্রতিবেশী দেশটি এ ব্যাপারে অর্থ, বিত্ত, প্রযুক্তি ও পরামর্শ যুগিয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে মামলামুক্ত করার ব্যাপারেও তারা অবদান রেখেছে। জেনারেল এরশাদকে আওয়ামী লীগের সাথে জোটবদ্ধ হতেও তাদের অনুপ্রেরণা ছিল মুখ্য। বলাবাহুল্য, এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির মহাসচিব আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ২০০৬ সালে দৈনিক আমাদের সময়কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, ভারতের টাকা খেয়ে এরশাদ সাহেব বাংলাদেশে রাজনীতি করেন, ভারতের টাকায় তার পেট চলে। সংসার চালানো, রাজনীতি, বাহাদুরী সবকিছুই তিনি করছেন ভারতের টাকায়। আওয়ামী লীগের ভারত কানেকশন তো সকলেরই জানা।
ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী এমপি ও উপদেষ্টাদের কিছু বিষয়ে বিশেষ করে ভারতকে ট্রানজিট-করিডোর, বন্দর, গ্যাসসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ব্যাপারে অতি উৎসাহ আমাকে ১৯৯৬ সালের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ঐ সময়ে ফারাক্কা চুক্তি (তাও গ্যারান্টি ক্লজ ছাড়া) সম্পাদন করে তারা বাংলাদেশের কাছ থেকে উল্লেখিত সুবিধাগুলোর কোনটিই আদায় করতে পারেনি। এই মেয়াদে দলটিকে ‘নিরঙ্কুশ' সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতায় এনে প্রথম সুযোগেই তারা তাদের দাবিগুলো আদায় করে নিতে চাচ্ছে। আর আওয়ামী লীগও এ ব্যাপারে আগের তুলনায় অনেক বেশি অগ্রগামী বলে মনে হয়। স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান দেশে প্রত্যাবর্তন করে ১৯৭২ সালে ভারতকে বাংলাদেশ থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহারে বাধ্য করেছিলেন। এখন মনে হচ্ছে যে তারই দলের উত্তরসূরি সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্যের অবস্থান কামনা করে। মানুষের মধ্যে এই ধারণা সৃষ্টির কারণ হচ্ছে এই যে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে পিলখানায় বিডিআর হত্যাকান্ডের সময় যখন তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালকসহ আমাদের সেনাবাহিনীর সিনিয়র ও মধ্য সোপান পর্যায়ের দক্ষ ও চৌকস কর্মকর্তাদের জীবন বিপন্ন হয় এবং তারা তাদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য কামনা করে মোবাইল করেন তখন সরকার তাদের রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব না দিয়ে বিদ্রোহীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে সংলাপের নাটক শুরু করেছিলেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারকে বাঁচানোর জন্য তৎকালীন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জী ঢাকার অনুরোধের প্রেক্ষিতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী (তার ভাষায় ভারত-বান্ধব) ও তার সরকারকে রক্ষার জন্য বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য প্রেরণের প্রস্তাব করেছিলেন। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রণব বাবুর এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেনি, Kept in abeyance অবস্থায় রেখেছে। এ থেকে মানুষের সন্দেহ হচ্ছে যে, সরকার এখন দিল্লীর নির্দেশেই চলছে। এমনকি কেউ কেউ আগ বাড়িয়ে এও বলতে দ্বিধা করছে না যে, আমাদের মন্ত্রীদের তালিকাও তারা তৈরি করে দিয়েছেন। মানুষের এই ধারণা কতটুকু সত্য আমি জানি না তবে নিজ দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ভারতকে বিশেষ কোনো সুবিধা দেয়াকে কোন কোন মন্ত্রী যখন নিজের স্বপ্ন বলে ঘোষণা করেন তখন ভাবতে কষ্ট লাগে যে এই মন্ত্রী বা মন্ত্রীরা প্রকৃতপক্ষে এই দেশেরই সন্তান এবং এদেশের ভোটাররা তাদের ভোট দিয়ে পার্লামেন্টে পাঠিয়েছে।
আমি কুলদীপ নায়ারের নিবন্ধের বরাত দিয়ে বলেছিলাম যে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে প্রতিবেশী ভারতের নেতৃবৃন্দের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের Sentiment বা চেতনা ফিরে আসে। এই চেতনার ভিত্তিতে বাংলাদেশের কাছে তাদের প্রত্যাশা উল্লেখ করতে গিয়ে এও বলেছিলাম যে, যুদ্ধে নিহত ভারতীয় সৈন্যদের স্মৃতি সংরক্ষণ, ট্রানজিট-করিডোর ও বন্দর সুবিধা প্রদান, কয়লা ও গ্যাস সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দান এবং ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে সহায়তা প্রদান প্রভৃতি হচ্ছে তাদের প্রত্যাশা বা চাহিদা। কুলদীপ নায়ারসহ ভারতীয় সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, সামরিক-বেসামরিক আমলা, গোয়েন্দা সংস্থা সকলেই এ বিষয়ে একমত যে বাংলাদেশকে তারা স্বাধীন করেছে এই সুবিধাগুলো পাবার জন্য, তাদের আশ্রীত হিসেবে থাকার জন্য, স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে সমমর্যাদা নিয়ে টিকে থাকার জন্য নয়। বাংলাদেশের এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদকে তারা ক্ষমতার টোপ দিয়ে কিনে নিয়েছেন তাদেরই স্বার্থ দেখা শোনার জন্য। এদের পরিচয়ে আগে বিভ্রান্তি থাকলেও ওয়ান/ইলেভেনের পর পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। মানুষ এখন বলতে শুরু করেছে যে, একটি দুর্নীতিপরায়ণ স্বার্থপর রাজনৈতিক গোষ্ঠী যাদের স্বাধীনতাবিরোধী বলে গালি দিয়ে আসছিল প্রকৃতপক্ষে তারাই দেশপ্রেমিক, তাদের হাতেই এদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব নিরাপদ। আর যারা নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষশক্তি বলে পরিচয় দিয়ে আসছিল তাদের বৃহত্তর অংশ অর্থ ও ক্ষমতার বিনিময়ে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিক্রি করতেও কুণ্ঠিত নয়।
এখন ভারতীয় দাবি-দাওয়াগুলো নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যেতে পারে। মুক্তিযুদ্ধে নিহত ভারতীয় সৈন্যদের স্মৃতি সংরক্ষণে এখন বাংলাদেশে আর কোনো বাধা আছে বলে মনে হয় না। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য সম্প্রতি হাইকোর্ট সরকারকে যে নির্দেশ দিয়েছে তার আওতায় এই কাজটি সহজতর হতে পারে। সরকার এই দেশের কোটি কোটি বেকার ও দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়রে জন্য শিল্পায়ন ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের এখন প্রাধান্য দেবেন, না মৃত ব্যক্তিদের কবর ও শ্মশানে স্মৃতিসৌধ তৈরির জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করবেন সেই সিদ্ধান্ত তাদেরই নিতে হবে।
এশিয়ান হাইওয়ের নামে করিডোর দেয়ার সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে সরকার নিয়েই ফেলেছেন এবং দেশকে উপোষ রেখে কয়লা গ্যাস বিক্রির বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১২ জুলাই অনুষ্ঠিত এক সভায় শিক্ষক বুদ্ধিজীবী ও লেখকরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি দাবি জানিয়ে বলেছেন, আপনি সিদ্ধান্ত নিন, প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, না মুখ্যমন্ত্রী হবেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই দাবিটা তাদের, যারা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় নেয়ার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। এখন তাদের মোহমুক্তি ঘটেছে এবং দেশের স্বাধীনতা থাকবে কিনা তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। দেশবাসীও উদ্বিগ্ন। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহীদের দমনের ব্যাপারেও সরকার ভারতীয় প্রস্তাব বাস্তবায়ন শুরু করে দিয়েছে এবং এর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশের সৈন্য গোয়েন্দা সংস্থাকে ধ্বংস করে দেয়ার কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় সেনা গোয়েন্দা সংস্থার তৎকালীন প্রধানদের হেস্তনেস্ত করার অশুভ কাজটি ভারতীয় নির্দেশনায়ই পরিচালিত হচ্ছে বলে দেশবাসীর ধারণা। অবশিষ্ট আছে বন্দর। কেউ কেউ মনে করছেন যে, ভারতকে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে নিত্তি না হলে কেউ হয়ত আদালতে যাবার চিন্তা-ভাবনাও করতে পারেন। সরকারকে পক্ষ বানিয়ে যদি আদালতে রিট হয় এবং এডিবি-বিশ্ব ব্যাংকের সুপারিশকে ভিত্তি করে ভারতকে বন্দর দেয়ার অনুমোদন চাওয়া হয় এবং সরকার পক্ষ উপযুক্ত জবাব দিতে না পারেন তাহলে মহামান্য আদালত যৌক্তিক মনে করলে ভারতকে বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার জন্য সরকারকে নির্দেশ দিলেও দিতে পারেন। এক্ষেত্রে ভারতের পক্ষে বাংলাদেশের উপর দিয়ে তার পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর বিদ্রোহ দমনের জন্য অস্ত্রশস্ত্র ও সেনা আনা নেয়ায় আর কোনো সমস্যাই থাকবে না। অবস্থা যদি তাই হয় তাহলে সহজেই আমরা ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের টার্গেটে পরিণত হবো এবং বাংলাদেশের সামাজিক অর্থনৈতিক কোনো স্থাপনাই সন্ত্রাসী হামলা থেকে রক্ষা পাবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। আবার ভারতকে একবার অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ ও সেনা চলাচলের সুযোগ দিলে তা আর কখনো বন্ধ করা যাবে না। সেক্ষেত্রে এই দেশটি স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব হারিয়ে করদ রাজ্যে পরিণত হবার সম্ভাবনাও রয়েছে। বাংলাদেশের সমস্যা হচ্ছে, বিজাতীয় এবং আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে ভারতীয় স্বার্থ দেখাশোনার জন্য তার অভ্যন্তরে মীর জাফর আলী খানদের অভাব নেই কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থ দেখার জন্য ভারতের অভ্যন্তরে তার বন্ধু নেই বললেই চলে। এই মীর জাফরদের বিশ্বাসঘাতকতার সুযোগ নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশের এলিট ফোর্স বিডিআর-এর সেনা কমান্ডকে ধ্বংস করা হয়েছে এবং সেনাবাহিনী ধ্বংসেরও চক্রান্ত চলছে।
এখানে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রসঙ্গে কিছু কথা বলা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। দীর্ঘকাল ধরেই ভারত এই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশকে দোষারোপ করে আসছিল এবং বাংলাদেশ বরাবরই তা অস্বীকার করে এসেছে। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে এ ধরনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের তরফ থেকে যৌথ তদন্তের প্রস্তাবও দেয়া হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল যে, ভারতীয় অভিযোগ অনুযায়ী যেখানে যেখানে বিদ্রোহীদের ঘাঁটি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে বলে দাবি করা হচ্ছে সেগুলোর যথার্থতা যাচাই করার উদ্দেশ্যে যৌথ টিমের সুবিধার জন্য বাংলাদেশ হেলিকপ্টার দিতেও প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু ভারত উক্ত প্রস্তাব গ্রহণ করেনি বরং বারবার একই অভিযোগ করেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তারা আর এই অভিযোগ করেনি বরং ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় এই মর্মে রিপোর্ট বেরিয়েছে যে, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তাদের বাংলাদেশে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গুটিয়ে সিঙ্গাপুরের দিকে চলে গেছে। কি অদ্ভূত তথ্য!
ভারতের পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। আমার দৃষ্টিতে তাদের সমস্যা মানবিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং ভারতেরই সৃষ্টি। এ ব্যাপারে United States Institute of Peace এর ১৭১ নং Special Report টির বিশ্লেষণ প্রণিধানযোগ্য। এতে বলা হয়েছে, "One of the leitmotifs that has characterized New Delhi's relations with the North East is the tension between demands for regional autonomy and fears of secession. A number of northeastern ethnic and tribal groups have felt that most central governments in New Delhi were not specially sensitive to their needs. They also feared that the dominant culture of Hindi speaking heartland would, overtime, efface their distinctive cultural and ethnic heritage. These misgivings contribute to demands for autonomy and specially in the case of Nagas, for outright secession from India. এখানে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর যে আশংকার কথা বলা হয়েছে তা হচ্ছে তাদের সাংস্কৃতিক ও জাতিগত ঐতিহ্য এবং অস্তিত্বের বিলুপ্তি। তারা মনে করছেন এবং দেখে আসছেন যে, হিন্দি ভাষাভাষিদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন তাদের ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে বিলুপ্ত করে দিচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে তারা স্বায়ত্তশাসনকেই তাদের রক্ষাকবচ বলে মনে করছে। ভারত তাদের এই দাবিকে দেখছে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির প্রতি হুমকি তথা বিচ্ছিন্নতাবাদ হিসেবে। বিশ্লেষকদের ভাষায় "Regardless of the regime in New Delhi to Indian state tended to see all these demands through the Prism of potential threats to national unity and territorial integrity. This led it to adopt a rather unyielding stand towards most demands for autonomy. As a result it has repeatedly deployed troops in Assam and northeastern states to abrogate the civil and political rights of much of the population, using considerable forces to suppress insurgent movements." এখানে বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার। মিজো হোক নাগা হোক অথবা অসমীয় কিংবা অন্যকোন জাতি গোষ্ঠী, ভারত যদি তাদের এই গ্যারান্টি দিতে পারে যে, তাদের হাতে তাদের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং মূল্যবোধ নিরাপদ তাহলে এই Insurgency অব্যাহত থাকতে পারে না। কিন্তু ভারত এই গ্যারান্টি দিতে পারেনি বলেই বিচ্ছিন্নতার দাবি উঠেছে এবং অস্ত্র দিয়ে এই দাবি প্রতিহত করার নজির দুনিয়ার কোথাও নেই। অস্ত্র এই এলাকার শান্তিকে অনিশ্চিত করে তুলবে বলে আমার বিশ্বাস।
বাংলাদেশের জনসাধারণের ভয় হচ্ছে ভারত যে ট্রানজিট-করিডোর চাচ্ছে তার উদ্দেশ্য নিয়ে। উত্তর পূর্বাঞ্চলের সাতটি ভারতীয় রাজ্যের যাবতীয় তৎপরতা সম্পূর্ণভাবে তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। সেখানে কিছু সমস্যা হচ্ছে তা সমাধানের দায়িত্ব নিঃসন্দেহে ভারতের। কিন্তু আমরা যখন সম্পৃক্ত হতে যাব তখন অবশ্যই আমরা প্রশ্ন তুলবো, কেননা আমরা তাদের অঙ্গরাজ্য নই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। ৭টি রাজ্যের ঘটনাপ্রবাহ যেদিকে মোড় নিচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে যে, ভারত বড় আকারে সৈন্য ও অস্ত্র সমাবেশ করে পরিস্থিতি সামলে দিতে চায় এবং এজন্য তাদের বাংলাদেশ ভূখন্ড দরকার। ব্যাপক আকারে সৈন্য ও অস্ত্র মুভমেন্টের জন্য পাহাড় ও জঙ্গলে ঘেরা তাদের নিজস্ব পথকে তারা নিরাপদ মনে করতে পারছেন না। একই কারণে চট্টগ্রাম বন্দরও তাদের প্রয়োজন। প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কি ভারতের ‘বিদ্রোহী জনগোষ্ঠীকে' দমন তৎপরতায় অংশীদার হতে পারি? করিডোর দিয়ে অংশীদার হতে গেলে পরবর্তী ঠেলা কি আমরা সামাল দিতে পারবো? জেএমবি, সর্বহারা, পূর্ববাংলা কম্যুনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের উৎপাতে এমনিতেই আমরা বিব্রতকর অবস্থায় আছি। মিজো নাগাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এদেশের মানুষ নতুন বিপদ ডেকে আনতে চায় বলে আমি মনে করি না। আর সরকার যদি ইন্ডিয়ান আশীর্বাদে ক্ষমতায় থাকার জন্য তা করেন তা হলে নিজে যেমনি ধ্বংস হবেন দেশকেও তেমনি ধ্বংস করবেন। আমার বিশ্বাস দেশের মানুষ তা করতে দিবেন না।
