জেঃ মইনের বিএনপি বিরোধী জুলুমের কাহিনী

আওয়ামী ভারত যোগসাজশে জেঃ মইনের বিএনপি বিরোধী জুলুমের কাহিনী|
জেনারেল (অবঃ) মইন উদ্দিন আহমদ এবং তার সামরিক ও বেসামরিক সহচরদের বিচার দাবি করেছেন বিএনপি নেতা সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। জেনারেল মইনের সহচর হিসেবে তিনি আর যাদের বিচার দাবি করেছেন তারা হলেন- (১) সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. ফখরুদ্দিন আহমদ (২) বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী (৩) সাবেক উপদেস্টা মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিন (৪) সাবেক সেনাপ্রধান ও দুর্নীতি দমন কমিশন প্রধান লে. জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী (৫) সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ফিল্ড ইন্টেলিজেন্সের সাবেক পরিচালক এবং আনসারের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আমীন আহমদ চৌধুরী এবং (৬) ফিল্ড ইন্টেলিজেন্সের সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ফজলুল বারী। জনাব মওদুদ যে ৭ জনের বিচার চেয়েছেন এদের মধ্যে ৪ জন এখন বাংলাদেশে রয়েছেন এবং অবশিষ্ট ৩ জন দেশের বাইরে রয়েছেন। যারা দেশের বাইরে রয়েছেন, তারা হলেন ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ। প্রথমে তিনি লন্ডন গেছেন। সেখানে কয়েকদিন তিনি তার এক আত্মীয়ের কাছে থাকবেন। তারপর নিউইয়র্কে বসবাসরত তার পুত্রের কাছে যাবেন। নিউইয়র্কে তার ছেলের সাথে তিনি নাকি লম্বা সময় কাটাবেন। লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী সেনাবাহিনীতে এখনও কর্মরত আছেন। এখনও তাকে অবসরে পাঠানো হয়নি। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে কর্মরত আছেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলুল বারীর চাকরির সঠিক স্ট্যাটাস কি সেটা আমরা জানি না। তিনি ওয়াশিংটনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত ছিলেন। কিছুদিন আগে বর্তমান সরকার দায়িত্বভার বুঝিয়ে দিয়ে তাকে ফেরত আসতে বলে। জনাব বারী তার দায়িত্বভার বুঝিয়ে দিয়েছেন। তবে দেশে ফিরে আসেননি। তিনি কি এখনও চাকরিতে আছেন নাকি তাকে সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে সে বিষয়ে আমরা এখনও অবগত নই।
যাই হোক, এদের বিচার দাবি করেছেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। তার এই দাবি উত্থাপনের পরপরই জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ জয়নাল আবেদীন ফারুক এক সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে দলীয়ভাবে অর্থাৎ বিএনপির তরফ থেকে এই দাবি উত্থাপন করেন। তারপর থেকেই কয়েকটি সংবাদপত্রে তাদের বিশেষ করে জেনারেল মইনের বিচারের দাবির প্রতিধ্বনি করা হচ্ছে। ছাত্রদলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনও এই দাবিতে রাস্তায় সভা ও শোভাযাত্রা করেছে। বিএনপির মহিলা সংগঠন এবং ৮০ দশকের ছাত্রদল নেতারা মিটিং ও মিছিল করে জেনারেল মইনের কুশপুত্তলিকা দাহ করা, মইনের পাদুকা সংবর্ধনা এবং মইনের ওপর গণথুথু নিক্ষেপের আয়োজন করে। সভা ও শোভাযাত্রা সফল হয়। কিন্তু অন্য কর্মসূচি পালন করতে গেলে পুলিশ বাধা দেয় এবং লাঠিচার্জ করে। পুলিশের প্রহারে বিএনপির একজন মহিলা নেত্রী আহত হন।
এদিকে আওয়ামী লীগের তরফ থেকেও মইন বিরোধী বিক্ষোভ কর্মসূচির প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রী মুহিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও জেনারেল মইনের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন। পক্ষান্তরে মহিউদ্দিন খান আলমগীর, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত প্রমুখ নেতা মইন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
আওয়ামী লীগের মুখপাত্র হলেন জনাব আশরাফুল হক। তিনি আওয়ামী লীগের অস্থায়ী জেনারেল সেক্রেটারি এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রী। জেনারেল মইনকে রাষ্ট্রদূত করে বিদেশে পাঠিয়ে পুরস্কৃত করা হবে কিনা সে ব্যাপারে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, এটি একান্তই সরকারের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ব্যাপার। সরকার ইচ্ছা করলে তাকে রাষ্ট্রদূত করতেও পারে, আবার নাও করতে পারে। এই হলো মইন এবং তার সহচরদের বিরুদ্ধে গণঅসন্তোষের সংক্ষিপ্ত বিবরণ। গত শুক্রবারও সাপ্তাহিক ?সোনার বাংলা'র উদ্যোগে অনুষ্ঠিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে দেশের বিশিষ্টজনরা কঠোর ভাষায় জেনারেল মইনের সমালোচনা করেন এবং তার বিচার দাবি করেন। তবে আওয়ামী সরকারের কথাবার্তা এবং মতিগতি দেখে বোঝা যাচ্ছে যে তারা জেনারেল মইন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিচার তো করবেই না, বরং সুযোগ পেলে এবং পরিস্থিতি অনুকূল দেখলে তাকে পুরস্কৃত করবে। সেটা তাকে পুরস্কৃত করেই হোক না অন্য কোনো উপায়ে হোক। তবে বিএনপির তরফ থেকে সরকারের প্রতি এই মর্মে আহবান জানানো হয়েছে যে, জেনারেল মইন যাতে দেশের বাইরে যেতে না পারেন তার জন্য বিমান বন্দরসমূহে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হোক। ঐদিকে জেনারেল মইন এবং জরুরি সরকারের প্রতি আওয়ামী সরকারের সমর্থন এবং পক্ষপাতিত্ব আর গোপন থাকছে না। সুতরাং তাদের কাছ থেকে তার বিচারের আশা করা বাতুলতা মাত্র। সেই পটভূমিতে বিএনপির তরফ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, আওয়ামী লীগ সরকার বিচার করুক আর না করুক, বিএনপি যদি কোনোদিন ক্ষমতায় যায় তাহলে বাংলার মাটিতে একদিন না একদিন মইনের বিচার হবেই হবে।
\ দুই \
জেনারেল মইনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও অসন্তোষের এই বহি:প্রকাশ আপাতদৃষ্টে আকস্মিক হলেও অস্বাভাবিক নয়। একটি দেশে সেনাবাহিনীর প্রধান হিসাবে তার উচিত ছিল রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দল সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকা। তিনি হলেন ঘাসের নীচে লুকিয়ে থাকা সাপ। বেগম জিয়া এবং বিএনপি তার চেহারা এবং চরিত্র সম্পূর্ণ ধরতে পারেননি। তাই পেশাগত দিক বিবেচনা করে বিএনপি তথা জোট সরকার তাকে সেনাপ্রধান হিসাবে নিয়োগ দেয়। কিন্তু তিনি সেনাপ্রধান হওয়ার পর থেকেই দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করার স্বপ্ন দেখতে থাকেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য একদিকে তিনি প্রভাবশালী বিদেশী কূটনীতিকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেন, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সাথে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করেন। জেনারেল মইন চিন্তা করেন যে, ষড়যন্ত্রের চোরাপথে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে হলে এবং সেই ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে বিশ্বশক্তি আমেরিকার সমর্থন প্রয়োজন। অন্যদিকে তিনদিক বেষ্টিত বিশাল প্রতিবেশী ভারতের সক্রিয় সমর্থনও অপরিহার্য। এভাবে ভারত, আমেরিকা ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে একটি ত্রিকোণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে তিনি জরুরী অবস্থা জারি করাতে বাধ্য করেন। একই সাথে তিনি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে ইস্তফা দানে বাধ্য করেন। ড. ফখরুদ্দীন আহম্মেদকে প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে নিয়োগদান বড়ই রহস্যময়। প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য সংবিধানে যে ৫টি স্তর বা ধাপ রয়েছে তার কোনোটাই অনুসরণের কোনো তোয়াক্কা তিনি করেননি। জনশ্রুতি আছে যে, একজন জেনারেল তার নির্দেশে নিজে গাড়ী চালিয়ে ড. ফখরুদ্দীনের বাসায় হাজির হন। তারপর ফখরুদ্দীনকে ঐ গাড়ীতে উঠিয়ে নিজেই গাড়ী চালিয়ে বঙ্গভবনে নিয়ে আসেন এবং প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে নিয়োগ দেন। পরের ঘটনাগুলো সকলেরই জানা।
জেনারেল মইন সব সময় চিন্তা করতেন যে, যেহেতু আওয়ামী লীগের সাথে রয়েছে তার গোপন অাঁতাত, তাই তার প্রধান টার্গেট ছিল বিএনপি এবং জামায়াত। তিনি জানতেন যে, বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান দলের মধ্যে বিশেষ করে দলের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অসাধারণ জনপ্রিয়। তার প্রধান লক্ষ্য ছিল বিএনপিকে ধ্বংস করা। এ জন্য বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানকে সাইজ-আপ করতে হবে। এখন বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বিএনপির নেতারা সরাসরি অভিযোগ করছেন যে, জেনারেল মইন উ আহমদের প্রত্যক্ষ নির্দেশে বন্দী তারেক রহমানের ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন করা হয়। এই নির্যাতনের ফলে তার মেরুদন্ডের দুটি হাড় ভেঙ্গে যায়।
অভিযোগ রয়েছে যে, বন্দী অবস্থায় তারেক রহমানকে শুধুমাত্র বেদম প্রহারই করা হয়নি, তাকে উপর থেকে নীচে ফেলে দেয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল ওপর থেকে নিচে পতনের ফলে তার হাড়হাড্ডি এমনভাবে ভেঙ্গে যাবে যে, তিনি চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে যাবেন আর না হয় মাথায় বা মস্তিষ্কে তিনি এমন আঘাত পাবেন যার ফলে বোধশক্তিহীন উন্মাদে পরিণত হবেন। কথায় বলে, ?রাখে আল্লাহ মারে কে, মারে আল্লাহ রাখে কে।' তারেক রহমান গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। তার মেরুদন্ডের হাড় ভেঙ্গে গেছে। কিন্তু তিনি পঙ্গু হননি। আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি জীবিত আছেন এবং তিনি নাকি সুস্থও হয়ে উঠছেন।
আজ জেনারেল মইনের বিরুদ্ধে অনেক প্রশ্ন। কারণ তিনি কুখ্যাত ওয়ান-ইলেভেনের প্রধান নায়ক। সামরিক শাসন জারি না করে তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেন কিভাবে? প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক না হয়েও তিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলেন কিভাবে? সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি ছিল শুধু ইলেকশন করার জন্য। সেখানে তারা পাঠ্য পুস্তকের সিলেবাস পরিবর্তন এবং বিশেষ রাজনৈতিক দিকদর্শন দেন কিভাবে? ভারতকে কেন্দ্রবিন্দু ধরে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির মোড় ঘুরানোর অনুঘটক হন কিভাবে? তার শক্তিতে শক্তিমান সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা কিভাবে বলেন যে, ভারতের সাথে এমন সম্পর্ক গড়া হবে যেখান থেকে ফিরে আসা আর সম্ভব হবে না। তার অঙ্গুলী হেলনে যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরিচালিত হয়ে না থাকে তাহলে তিন মাসের সরকার ২৪ মাস পার করে কিভাবে? সামরিক উর্দি পরে তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের মতোই সভা-সমিতিতে প্রধান অতিথি এবং রাজনৈতিক নেতাসুলভ আচরণ করেছেন কিভাবে?
\ তিন \
সবশেষে হলেও একটি প্রশ্ন মোটেই গুরুত্বহীন নয়। সেটি হল, তিনি জানতেন যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। সেই ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্ট রাখা হয়েছিল কেন? যেদিন থেকে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারান সেদিন থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট হিসাবে তার শেষদিন পর্যন্ত তার সমস্ত কার্যকলাপ সংবিধান বিরোধী এবং অবৈধ। তেমন একজন ব্যক্তিকে দিয়ে সেনাপ্রধান হিসাবে তার এক বছরের এক্সটেনশন তিনি কিভাবে সই করিয়ে নিয়েছিলেন? প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিনের মানসিক ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ার ঘটনা জেনারেল মইন জানা সত্ত্বেও সেটি চেপে গেছেন কেন?
এই ধরনের অসংখ্য অনিয়ম তিনি করেছেন। এসব অনিয়মের বিচার অবশ্যই হবে। তবে সেটি শুধু সময়ের ব্যাপার।

Tags: