পাগলা ঘন্টার বাংলাদেশ - ১

.
কারা চত্বরে ঠিকাদারকে পেটালেন যুবলীগ নেতা, বাজল পাগলা ঘণ্টা

নাটোর প্রতিনিধি, প্রথম আলো, জুন ২৪, ২০০৯

নাটোর জেলা কারাগারে পুলিশের সামনে গতকাল মঙ্গলবার এক ঠিকাদারকে বেদম পিটিয়েছেন যুবলীগের এক নেতা। এ সময় নিরাপত্তাহীনতায় কারা কর্তৃপক্ষ পাগলা ঘণ্টা বাজায়। পরে পিস্তল ঠেকিয়ে ওই ঠিকাদারকে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তুলে নিয়ে যান যুবলীগ নেতা। পরে ঠিকাদার দরপত্র তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

জানা গেছে, নাটোর জেলা যুবলীগের সহসভাপতি এহিয়া চৌধুরীর নিষেধ সত্ত্বেও জেলা কারাগারের কোটি টাকার খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ কাজের দরপত্র দাখিল করেছিলেন ঢাকার মিরপুরের রাজমণি এন্টারপ্রাইজের মালিক মশিউর রহমান। এ কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে এহিয়া এ কান্ড ঘটান।

নাটোর কারা কর্তৃপক্ষ সুত্র জানায়, কারাগারে কয়েদি ও হাজতিদের খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ কাজের দরপত্র বিক্রির শেষ দিন ছিল গত সোমবার। ওই দিন নাটোর জেলা যুবলীগের দুই নেতা ছাড়াও রাজমণি এন্টারপ্রাইজের মালিক দরপত্র কেনেন। কিন্তু যুবলীগের দুই নেতার বাইরে তৃতীয় ব্যক্তির কাছে কেন দরপত্র বিক্রি করা হয়েছে, তা জানতে চেয়ে এহিয়া চৌধুরী সোমবার সন্ধ্যায় কারা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। রাতেই কারা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পুলিশ সুপার ও ঊর্ধ্বতন কারা কর্মকর্তাদের জানান।
স্থানীয় সুত্র জানায়, গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত দরপত্র দাখিলের সময় নির্ধারিত ছিল। বেলা ১১টার দিকে রাজমণি এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক মশিউর রহমান ও তাঁর ভগ্নিপতি শামীম নাটোর সদর থানায় রাখা বাক্সে দরপত্র দাখিল করতে গেলে এহিয়া চৌধুরী ও তাঁর অনুগতরা বাধা দেন। এ সময় সেখানে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নুরুজ্জামান ও দায়িত্বরত কর্মকর্তা সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) বাদশা উপস্িথত ছিলেন। একপর্যায়ে এহিয়া ও তাঁর লোকজন মশিউর ও শামীমকে ধাਆা দিয়ে থানাচত্বর থেকে বের করে দেন। থানা থেকে বেরিয়ে মশিউর কারাগারে রক্ষিত বাক্সে দরপত্র জমা দেন। খবর পেয়ে এহিয়ার নেতৃত্বে কয়েকজন যুবক কারাগার চত্বরে চলে আসেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, নিষেধ সত্ত্বেও কেন দরপত্র দাখিল করা হলো−বলে মশিউরের দিকে তেড়ে আসেন এহিয়া। তিনি ও তাঁর লোকজন কারাচত্বরে মশিউরকে বেদম মারধর করেন। পরিস্িথতি বেগতিক দেখে কারা কর্তৃপক্ষ পাগলা ঘণ্টা বাজাতে শুরু করে। একপর্যায়ে মশিউরের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে এহিয়া তাঁকে কানাইখালীর নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তুলে নিয়ে যান। দরপত্র প্রত্যাহার করে না নিলে তাঁকে হত্যার হুমকি দেন। এরপর মশিউর ফোনে কারা তত্ত্বাবধায়ক মোশারফ হোসেনকে দরপত্র তুলে নেওয়ার কথা জানান। ঘণ্টা দুয়েক আটকে রাখার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

মশিউর অভিযোগ করেন,‘নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি প্রথমে সদর থানায় দরপত্র জমা দিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশের নিষ্কিত্র্নয়তায় তিনি হতবাক হয়েছেন। এহিয়া ও তাঁর লোকজন তাঁকে মেরে থানা থেকে বের করে দিলেও পুলিশ প্রশাসন কোনো সহযোগিতা করেনি। সদর থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা এএসআই বাদশা দাবি করেন, ঘটনার সময় তিনি কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তাই থানার বারান্দায় দরপত্র ফেলার বিষয়টি তদারকি করতে পারেননি। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওয়ারেছ আলী জানান, ঘটনার সময় তিনি থানায় ছিলেন না। থানার ভেতরে এ ধরনের ঘটনার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন এবং তাৎক্ষণিক দায়িত্বরত কর্মকর্তাকে তিরস্কার করেন।

যুবলীগের নেতা এহিয়া চৌধুরী দাবি করেন, এবার তিনি মেয়র পদে নির্বাচন করবেন। তাই তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য দরপত্র জমাদান নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে এ ধরনের মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে। তবে নাটোর কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক মোশারফ বলেন, দরপত্র দাখিল করা নিয়ে এমন ঘটনা তিনি তাঁর চাকরিজীবনে দেখেননি। তিনি আরও জানান, দরপত্র বাছাইয়ের জন্য সাত সদস্যের কমিটি রয়েছে। কমিটির উপস্থিতিতে বুধবার দরপত্র খোলা হবে। কমিটির সভাপতি হিসেবে তিনি আইনের বাইরে কিছুই করবেন না।