ধীরে পিনাক চক্রবর্তী, ধীরে
-ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর ঔদ্ধত্য বহু আগেই সকল ধরনের কূটনৈতিক শিষ্টারের সীমা লঙ্ঘন করে গেছে। এ পর্যন্ত তার সকল বক্তব্যই ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ধারাবাহিক হস্তক্ষেপ এবং এই অপরাধের জন্য তাকে পার্সোনাল নন্ গ্রাটা ঘোষণা করে বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহার করে নিতে ভারত সরকারকে জানিয়ে দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে ভারতের বশংবদ সরকার আজ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো রকম ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তার বাড়াবাড়ি, ও আচরণ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
গত ২১শে জুন বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সমিতি ঢাকার একটি হোটেলে 'দক্ষিণ এশীয় যোগাযোগ : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ' শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তাতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি। আর বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ভারতের ঐ হাইকমিশনার পিনাক চক্রবর্তী। আর সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এ কে আজাদ চৌধুরী। সভায় তিনটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ, ড. আবুল বারাকাত ও সাবেক কূটনীতিক ড. এম রহমাতুল্লাহ। এছাড়াও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন সাবেক সচিব জনাব মার্গুব মোরশেদ, এফবিসিসিআই সভাপতি আনিসুল হক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর ড. আমেনা মহসিন।
সেমিনারে ভারতের ভব্যতাহীন কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন যেসব বক্তব্য রাখেন, সেগুলোর একটি ধারাক্রম তৈরি করলে যা দাঁড়ায়, তা হলো : (১) বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমমর্যাদার ভিত্তিতেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। এই সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বৃহত্তর দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের স্বার্থেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে। সড়ক, রেল, নৌ ও বিমান পথে এই যোগাযোগ ব্যবস্থা সঠিকভাবে স্থাপিত হলে তা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। শিলং থেকে সিলেট হয়ে ঢাকা এই রুটে খুব শীঘ্রই বাস ও ট্রেন চলাচল করবে।
(২) এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হওয়ার জন্য বর্তমান সরকারের মন্ত্রিপরিষদ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা খুবই ইতিবাচক, এটা সময়োপযোগী। (৩) ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি চুক্তি প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত নির্বাচনের পর আমাদের প্রত্যাশা ছিল আরও কিছু দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ইতিমধ্যে স্বাক্ষরিত হবে, যাতে দু'দেশই লাভবান হবে।
(৪) গঙ্গার পানি চুক্তি সম্পর্কে পিনাক চক্রবর্তী বলেন, এ সম্পর্কে অন্তঃসারশূন্য তথ্য দেয়া হচ্ছে। ভারত গঙ্গার পানি দিচ্ছে বলেই বাংলাদেশে ধানসহ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।
(৫) ফারাক্কা ইস্যুতে তথাকথিত কিছু পানি বিশেষজ্ঞ ভারতপ্রেমী বাংলাদেশী মানুষকে ভারত বিদ্বেষী করে তুলছে।
(৬) তিনি বলেন, যারা ট্রাক ভর্তি করে ভারতে সন্ত্রাসীদের কাছে অস্ত্র পাঠাতে চেয়েছিল তারাই এখন জনগণের মধ্যে ভারত ফোবিয়া তৈরি করছে।
(৭) ঐ মহলই টিপাইমুখ বাঁধ সম্পর্কে অবাস্তব সব তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। ভারতবিদ্বেষী করে তুলছে। এই বাঁধ নিয়ে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে ১৯৭২ ও ১৯৭৮ সালে আলোচনা হয়েছে। এটা নিয়ে বিগত ৪০ বছর ধরে আলোচনা চলছে। তারপরেও আমরা ঐ এলাকা পরিদর্শনের আহবান জানিয়েছি। বিদ্যুৎ উৎপাদন ছাড়া এ প্রকল্পের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই।
(৮) দাদাগিরির অভিযোগ সম্পর্কে পিনাক বলেন, এটা ৫০ বছরের পুরানো শব্দ। এটা মুছে ফেলুন। তবে এ অঞ্চলে তাহলে একজন বিগ ব্রাদার আছে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তুলতে।
ভারতীয় হাই কমিশনারের প্রতিটি বক্তব্য ঔদ্ধত্যপূর্ণ, অকূটনৈতিক অবজ্ঞাপ্রসূত, মতলবি এবং কোথায়ও কোথায়ও তা মূর্খতার শামিল। প্রথমত. তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক সমমর্যাদার ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত। তার এই বক্তব্য নির্জলা অসত্য। কারণ বাণিজ্য ক্ষেত্রে এ সম্পর্ক নেই। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে বিপুল ঘাটতি রয়েছে। কখনও কখনও এই ঘাটতি সামান্য পূরণের জন্য ভারত কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছাড় দেয়ার অঙ্গীকার করলেও সীমান্তে নানা ধরনের ট্যারিফ ও নন্-ট্যারিফ বাধা তৈরি করে ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রফতানিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ও রফতানি বন্ধ করে দেয়। এটাকে সমমর্যাদা বলে না। আবার বাংলাদেশের বিপদের দিনে ৩৪০ ডলার টন দরে চাল বিক্রি করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভারত দফায় দফায় ট্রাক ঠেকিয়ে সে চালের দর টনপ্রতি হাজার ডলারে তোলেন। এর নাম সমমর্যাদা নয়। গোটা বাংলাদেশের সড়ক, রেল নৌপথ ভারত করিডোর হিসাবে ব্যবহারের খায়েস পোষণ করলেও তিন বিঘা করিডোর গত ৩৬ বছরেও বাংলাদেশকে দেয়নি আবার-নেপালে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে মাত্র ২৫ কিলোমিটার পথ ব্যবহারের জন্য চুক্তি করেও একদিনের জন্যও সে করিডোর ব্যবহার করতে দেয়নি। এটা সমমর্যাদা নয়। এদিকে ভারত বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে ঢুকে প্রতিদিন নিরীহ-নিরস্ত্র বাংলাদেশীদের হত্যা করছে। একেও কি সমমর্যাদা বলতে চান পিনাক রঞ্জন?
দ্বিতীয়ত, এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হতে বাংলাদেশের ভারত-পূজারী বর্তমান সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাকে শ্রী পিনাক খুবই ইতিবাচক বলে অভিহিত করেছেন। এশিয়ান হাইওয়েতে বাংলাদেশের যুক্ত হবার বিষয়টি অনেক পুরানো। ব্যাংককভিত্তিক জাতিসংঘ সংস্থা-এর ২০০৫ সালে এশিয়ান হাইওয়েতে বাংলাদেশের সংযুক্তির নামে আসলে ভারতের করিডোর দেয়ারই প্রস্তাব করে। তারা ঢাকা থেকে মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াংগুন পর্যন্ত সবার জন্য মনিপুর এলাকার দুর্গম পথ ধরে যাবার প্রস্তাব দেয়। কক্সবাজারের উখিয়া থেকে সরাসরি মিয়ানমার যেতে যে পথ মনিপুর ঘুরে গেলে সে পথ হবে ১২০০ কিলোমিটার বেশি। ঐ পথ দুর্গম পাহাড়ি। ফলে উখিয়া দিয়ে মিয়ানমারের ইয়াংগুন যেতে যে সময় লাগবে, ঐ পথ ঘুরে যেতে লাগবে কমপক্ষে আরো তিনদিন বেশি। তাছাড়া মনিপুর জুড়ে স্বাধীনতার যে সংগ্রাম চলছে, ঐ পথে হামেশাই তাদের হামলার আশঙ্কার ফলে পথটি নিরাপদও নয়। ভারতের রাজধানী দিল্লী থেকে ঢাকা ঘুরে আবার ভারতের ওপর দিয়ে কেন আমাদের ইয়াংগুন যেতে হবে। আমরা দিল্লী হয়ে ঢাকা দিয়ে উখিয়ার পথে চলে যাব ইয়াংগুন। এটাই এশিয়ান হাইওয়ের কনসেপ্ট। তা না করে ভারতানুগত মন্ত্রিসভা এশিয়ান হাইওয়েতে সংযুক্তির নামে ভারতকে গোটা দেশ করিডোর করে দেয়ার প্রস্তাব নেয়ায় সেটাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন পিনাক।
২০০৫ সালে জোট সরকারের আমলে ভারত প্রভাবিত এসকাপ তো বলেই দিয়েছিল যে, বাংলাদেশ যদি ঐ করিডোর প্রস্তাবকে এশিয়ান হাইওয়ে হিসাবে মেনে না নেয়, তবে বাংলাদেশকে বাদ দেয়া হবে এশিয়ান হাইওয়ে থেকে। বাংলাদেশ সেটা মেনে নিয়েই নিজস্ব ব্যবস্থা করেছিল। মিয়ানমারকে এক কোটি ডলার অনুদান দিয়ে তৈরি করিয়েছিল উখিয়ায় সংযোগ সেতু ও সড়ক। সামান্য কিছু পথ পাকা করলেই আমরা সহজেই উখিয়া দিয়ে চলে যেতে পারি মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ায় ও চীন। তাহলে এতদিন পর আবার ঐ প্রস্তাবই বা দেন, আবার তা মেনে নেয়াই কেন। এটা ইতিবাচক কিছুই নয়। বরং বর্তমান সরকারের গোটা বাংলাদেশকেই ভারতকে করিডোর হিসাবে ব্যবহার করতে দেয়া।
তৃতীয়ত, ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানি চুক্তি ছিল একতরফা। তাতে কার্যত আন্তর্জাতিক গঙ্গা নদীর পানির অধিকার সম্পূর্ণরূপে ভারতের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়। গ্যারান্টি ক্লজ না থাকায় ভারত যথেচ্ছ পানি প্রত্যাহার করে নেয়। এ বছরও তারা ৮৩ হাজার কিউসেক পানি কম দিয়েছে। অথচ গ্যারান্টি ক্লজ না থাকায় বাংলাদেশ কোনো প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে পারেনি। তেমনি আরো চুক্তি চাই ভারতের।
চতুর্থত, পিনাকের ভাষ্য অনুযায়ী ভারত গঙ্গার পানি দিচ্ছে বলেই বাংলাদেশে ধানসহ কৃষি উৎপাদন হচ্ছে। না দিলে বাংলাদেশ কী করতে পারত? শ্রী পিনাককে মনে রাখা উচিত, আন্তর্জাতিক নদী গঙ্গার পানি ভারতের তালুক-মুলুক নয়। এই নদীতে ভারতের যে অধিকার, বাংলাদেশের অধিকারও তাই। এটা দায় নয়, অধিকার। সুতরাং শ্রী পিনাকের উচিত মুখ সামলে কথা বলা।
পঞ্চমত, ফারাক্কা ইস্যুতে নাকি বাংলাদেশের তথাকথিত কিছু পানি বিশেষজ্ঞ ভারতপ্রেমী বাংলাদেশী মানুষকে ভারত-বিদ্বেষী করে তুলছে। দু'পয়সার এক কূটনীতিকের ঔদ্ধত্যের মাত্রা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে যে, বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের সম্পর্কে খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে বসে তিনি একথা বলতে সাহস পেয়েছিলেন।
ষষ্ঠত, তিনি বলেছেন, যারা ট্রাক ভর্তি করে ভারতীয় সন্ত্রাসীদের কাছে ১০ ট্রাক অস্ত্র পাঠাতে চেয়েছিল, তারাই বাংলাদেশে ভারত-ফোবিয়া তৈরি করছে। এই বেআদব কূটনীতিকের এমন বেসামাল উক্তির জবাব সরকার না দিলে জনগণই এক সময় দেবে।
সপ্তমত, তিনি বলেছেন, টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে অবাস্তব সব তথ্য দিয়ে কিছু তথাকথিত বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে। এ সম্পর্কে খুব বেশি কিছু বলতে চাই না। শুধু বলতে চাই, মনিপুরের লোকেরা, এখন কেন এই বাঁধের বিরোধিতা করছে। তারা কেন বাংলাদেশে এসে বাংলাদেশকে বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে তোলার দাবি জানাচ্ছে? পিনাক শুধু এটুকুর জবাব দিলেই চলবে।
অষ্টমত, ভারত দাদাগিরির অভিযোগটি আহ্লাদের সঙ্গেই মেনে নিয়ে পিনাক বরং বলতে চেয়েছেন, এই দাদাগিরি থাকবেই। আর এর সবকিছুই ঘটেছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির সামনেই।
ভাল, ডা. দীপু মনি কোনো অর্থনীতিবিদ নয়, চিকিৎসায়ও হাত যশ আছে এমন কথা কখনও শোনা যায়নি। তেমনি যাকে বাফার স্টেট বলে, কূটনৈতিক শিষ্টাচার কী, একজন ব্যক্তি ও একটি দেশের আত্মমর্যাদার বোধ কী, এ সম্পর্কেও তার কোনো ধারণা আছে বলে মনে হলো না। তাছাড়া একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে একজন কূটনীতিক কতদূর বলতে পারে, না পারেন সে সম্পর্কেও তার কোনো ধারণা আছে বলে মনে হলো না। ফলে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের একজন বশংবদের মতো তিনি তার এসব অশ্রাব্য কথা শুনেই গেলেন, জবাব দিলেন না। বরং সভাশেষে সাংবাদিকদের মুখ লুকিয়ে পালিয়ে গেলেন। কী লজ্জার কথা।
কিন্তু দীপু মনিদেরও যেমন, তেমনি পিনাক বাবুদেরও সম্ভবত একথা মনে রাখা ভাল যে, এদেশের ১৫ কোটি মানুষ। তারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। অর্জিত স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য তারা এক সময় রুখে দাঁড়াবেই। তখন এসব মন্ত্রী আর কূটনীতিকরা খড়কুটোর মতো ভেসে চলে যাবে। আমরা সেই সুদিনের অপেক্ষায় আছি।
