৭ নবেম্বর ঃ আধুনিক বাংলাদেশের জন্ম |
প্রত্যেক জাতি রাষ্ট্রেরই দু'টি পর্যায় থাকে।একটি পর্যায়ে তার রাষ্ট্রীয় সত্তার জন্ম হয়।দ্বিতীয় পর্যায়ে শুরু হয় তার বিকাশ ও পূর্ণাঙ্গতা প্রাপ্তি।দ্বিতীয়টি প্রথমটি থেকে নানা কারণে পৃথক থাকে।প্রথমটিতে সাধারণত এন্টি এস্টাবলিস্টমেন্ট বা প্রাতিষ্ঠানিকতা বিরোধিতা বেশি থাকে।দ্বিতীয়টি প্রো-এস্টাবলিস্টমেন্ট বা প্রাতিষ্ঠানিকতা সহযোগিতা বেশি থাকে।প্রথমটির সাথে দ্বিতীয়টির সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি চলতে পারে না।আবার প্রত্যেক জাতি রাষ্ট্রের জন্মের আগে তাকে জনপদ, প্রদেশ, রাজ্য প্রভৃতি নানা রকম স্তর অতিক্রম করতে হয়। যেমন বলা যায় রাঢ়, বঙ্গ, সমতট প্রভৃতি জনপদই ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এসে পরিণত হয়েছিল বাংগালা মুল্লুকে। আগেই বলা হয়েছে নানাবিধ তফাৎ সত্ত্বেও রাষ্ট্র সত্তার জন্মের পর তার বিকাশ ও পূর্ণাঙ্গতা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। দ্বিতীয়টির বিকাশ না হলে প্রথমটি হয়ে পড়ে স্থবির। তাই দেখা যায় ঊনবিংশ শতাব্দীতেও বাংলা নাট্য সাহিত্যের দৈন্যতার কথা বলতে গিয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলেছিলেন, ‘‘অলীক কুনাট্য রঙ্গে, মজেলোক রাঢ়ে বঙ্গে।’’ তার মত জ্ঞানী ও শক্তিমান কবি বাংলার রাষ্ট্রীয় সত্তা (যা অবশ্য তখন অবাস্তব) দূরের কথা প্রাদেশিক সত্তাও কল্পনা করতে পারেনি। তাই তৎকালীন বাংলা তার কাছে নিছকই রাঢ়, বঙ্গ জনপদ মাত্র। অবশ্য এই উপমহাদেশে নানাবিধ ঐতিহাসিক কারণে রাষ্ট্র চিন্তা, রাষ্ট্র তত্ত্ব প্রভৃতির তেমন একটা বিকাশ ঘটেনি। বিশেষত ত্রয়োদশ শতাব্দীর পূর্বে উপমহাদেশ রাষ্ট্র চেতনা দূরের কথা প্রাদেশিক চেতনাও ছিল অনুপস্থিত। এ সম্পর্কে প্রখ্যাত উপমহাদেশ আল-বিরুণী তার কিতাবুল হিন্দ্ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘‘এ অঞ্চলের মানুষের জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় উৎকর্ষতা থাকলেও ইতিহাস ও ভূগোলের ব্যাপারে অজ্ঞতা বিস্মযকর। ইতিহাসের কথা জিজ্ঞাসা করা হলে তারা ১০,০০০, ২০,০০০ বছর আয়ু পাওয়া পৌরানিক রাজাদের কথা বলা শুরু করে আর ভূগোলের কথা জিজ্ঞেস করা হলে তারা শুরু করে দুধসাগর, ক্ষীরসাগরের গল্প’’, রাজনীতি, রাষ্ট্রের চাইতে এখানে সমাজ বেশি প্রাধান্য লাভ করেছে। রবীন্দ্রনাথ একে ‘চন্ডীমন্ডপ কেন্দ্রিক জীবনধারা' বলে এর পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। অবশ্য এর মধ্যে শশাংক ও পাল রাজাদের আমলে জনপদ স্তর থেকে রাজ্যের স্তরে উন্নীত হওয়ার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু বর্ণাশ্রম ও নানাবিধ কারণে তা সফল হয়নি। বস্তুত ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজীর বাংলা বিজয়ের পরই ক্রমান্বয়ে জনপদগুলোর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়। সমগ্র বাংলা ‘বাংগালা মুলুক' নামে অভিহিত হয়। তিনি কুতুব উদ্দিনের অধীনস্থ হয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তিনি বাংলা অভিযান করেছিলেন। ফলে ঠিক এই সময় থেকেই মুসলিম বাংলার স্বতন্ত্র ইতিহাসের সূচনা। এর কয়েক বছর পর বখতিয়ারেরই অনুচর আলী মর্দান খলজী ১২১০ খৃষ্টাব্দে দিল্লীর কর্তৃত্ব অস্বীকার করে স্বীয় নামে খোতবা পাঠ ও মুদ্রা প্রচার আরম্ভ করলেন। ঐতিহাসিকভাবে আলী মর্দান নিন্দিত ও বিতর্কিত চরিত্রের ব্যক্তিত্ব। কিন্তু তিনিই আবার বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান এবং পূর্বাঞ্চলীয় এই স্বাধীন সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা। তার পরবর্তী সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওজ খলজী শুধু স্বাধীন সুলতানই ছিলেন না; তিনি আববাসীয় খলিফার কাছ থেকে ‘আল-নাসির' উপাধি লাভ করেছিলেন যা ছিল উপমহাদেশের মধ্যে সর্বপ্রথম। এর ফলে তিনি ‘মালিক উপ-শাসক' বা পূর্বাঞ্চলীয় মালিক নামে অভিহিত হন। এর মাধ্যমে ‘বাংলা মুলুক' সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। পরবর্তীতে নানা পরিবর্তনের পথ বেয়ে ১৩৪২ খৃষ্টাব্দে সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ সমগ্র বাংলার আধিপত্য বিস্তার করে ‘শাহ-ই-বাংগালা' ও ‘শাহ-ই-বাঙ্গালী' উপাধি ধারণ করে সর্বপ্রথম জাতি রাষ্ট্রের পরিচয় সৃষ্টি করেন। যা প্রায় দুই শতাব্দী স্থায়ী হয়েছিল। পরবর্তীতে মোগল আমলে ‘বাংগালা মুলুক' কিছুটা সংকুচিত হয়ে আসলেও সুবে বাংলা হিসাবে এর মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছিল। আবার এই আমলের শেষ পর্যায়ে বিশেষত মুর্শিদকুলি খানের হিন্দু তোষণনীতি এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে একচেটিয়া সুবিধা প্রদানের ফলে সমগ্র বাংলার দুর্দিন শুরু হল। এরই পথ ধরে শেষ পর্যন্ত ইংরেজ রাজত্ব কায়েম হল। এরপর ওয়াহাবী-ফারায়েজী-বিদ্রোহী কৃষকদের সশস্ত্র প্রতিরোধ, মুসলিম লীগের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন এবং এরই ধারাবাহিকতায় '৪৭ এ পাকিস্তান, '৭১ এ বাংলাদেশ অর্জন এই ইতিহাস আর নতুন করে বলবার কিছু নেই। ইংরেজ রাজত্বে সূচিত প্রতিষ্ঠানিকতা বিরোধী আন্দোলন নানাবিধ রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অপরিপক্কতার কারণে পাকিস্তান আমলে চরমে পৌঁছেছিল। কিন্তু বন্দুক ছোঁড়া গুলী যেহেতু আর কখনো বন্দুকে ফিরে আসে না তাই তখনকার প্রাতিষ্ঠানিকতা বিরোধী আন্দোলন ও তৎজনিত কর্মসূচিও বাস্তব গণভিত্তি পেয়েছিল। আর সিপাহীদের সাথে জনতার সম্পর্ক এই উপমহাদেশে কখনও ভাল ছিল না। বাংলায় তো নয়ই। কেননা গত কয়েক শতাব্দী ধরে সেনাবাহিনীর অধিকাংশ সদস্যই ছিল বিদেশী বিভাষী এমনকি বিধর্মীও। কিন্তু '৭১ পরবর্তীকালে আর বিদেশী ইংরেজ, বিধর্মী হিন্দু এমনকি বিভাষী পাঞ্জাবীরাও নেই। নবগঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষেও আর '৭১ পূর্ববর্তী পথে চলা সম্ভব ছিল না। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার ফলে সেনাবাহিনীর পেশাদারি চরিত্রও অনেকটা ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। এরই প্রকাশ দেখা যায় সেনাবাহিনীর ভিতর সৃষ্ট গ্রুপিংয়ে। আবার এর বাইরে সৃষ্টি হয়েছিল রক্ষীবাহিনী, গণবাহিনী, প্রভৃতি দলীয় পেটোয়া বাহিনীর। শক্তিতে, সামর্থ্যে যারা তখন জাতীয় সেনাবাহিনীর সমকক্ষ ছিল; অনেকেই তখন সচেষ্ট হয়েছিলেন বাংলাদেশকে কম্বোডিয়া, লেবাননে পরিণত করতে। তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন রাস্তায় ল্যান্ডমাইন ছড়ানোর। ওয়ারলর্ড হওয়ার স্বপ্নও অনেকেই দেখতেন। '৭৫ সালে এই বাস্তবতা তার চরম পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। ১৫ আগস্ট, ৩ নবেম্বর এবং সর্বশেষ ৭ নবেম্বর সেই জটিল বাস্তবতায় নতুন যুগের গোড়াপত্তন ঘটিয়েছিল। সিপাহী জনতার এই মহামিলন এমনকি এক ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটিয়েছিল যার যাদুকরী হাতের স্পর্শে অর্থনীতি মুক্ত হয়েছিল হাজার বছরের দুর্ভিক্ষ থেকে। খুলে গিয়েছিল ৪০০ বছর পরে আবদ্ধ অর্থনীতির বদ্ধ দুয়ার। রাজনীতি ও দু'শ বছরের বন্ধ্যাত্ব থেকে মুক্ত হয়ে অগ্রসর হয়েছিল গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের পথে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অনুভূতি পেল রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। বাংলাদেশ অধিষ্ঠিত হল পূর্ণাঙ্গ জাতি রাষ্ট্রের মর্যাদায়। অবশ্য ষড়যন্ত্র কখনও থেমে ছিল না। '৮১ এর ৩০ মে ছিল এর নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। এরপর থেকেই এ ষড়যন্ত্র বিভিন্ন মাত্রায় চলছে। কখনও তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আবার কখনওবা দুর্নীতি দমন প্রভৃতি নানান ছদ্মবেশে এদের চক্রান্ত ক্রিয়াশীল। কিন্তু বাংলাদেশকে আর কম্বোডিয়ায় পরিণত করা সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতেও এদের অনেকেই ঘোলা পানিতে মাছ স্বীকারে তৎপর। কিন্তু ৭ নবেম্বর ও শহীদ জিয়া যে নীতি ও মূল্যবোধের অগ্নিশিখা জ্বালিয়েছে তা অনিবার্য। কোন চক্রান্তেই তা নির্বাপিত হওয়ার কথা নয়। তাই ৩৪ বছর পরও আধুনিক বাংলাদেশের জন্মদিন হিসেবে ৭ নবেম্বর জাতীয় জীবনে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বের দাবি রাখে।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর অনিবার্য ছিল।আওয়ামী ফেরাউনের বাহীনি যেভাবে ৪০ হাজার জাসদ কর্মী হত্যা করেছে আর যেভাবে দেশের কোটি মানুষকে দূভিক্ষে না খায়িয়ে মেরেছে তার জন্য ১৯৭৫ শাস্তি হিসাবে কিছুই না।সব আওয়ামীদের ফেরাউনের ভাগ্য বরন করা উচিত ছিল।জিয়ার সম্পর্কে কোণ অভিযোগ না পেয়ে তাকে সামরিক বাহীনির হত্যা কান্ডের জন্য দ্বায়ী করা হয়।বাস্তবতা এই যে যারা ততকালীন সেনাবাহীনির শৃক্ষলা ভেঙ্গে বিদ্রোহ করেছিল তাদের ফাসি দেওয়া হয়েছে।আরও বলতে চাই ১৯৭৫ সালে ৭ নভেম্বরের ঘটনায় জিয়ার কোন ভুমিকা পরিলক্ষিত হয় নি।উনাকে বন্দি রাখা হত না যদি উনি ১৫ আগষ্টের মত ৭ নভেম্বরের ঘটনায় সম্মতি দিতেন। জিয়া সুন্দরভাবে রেখে গেছেন এক আদর্শ যা ভারতের দাদাবাবুদের ওটার প্রতি যাদের টান আছে তাদের জন্য হূমকি।