হাসিনা ও ওবামা এখন একই সমস্যা ও সঙ্কটের সম্মুখীন...।

2009-05-17_Hasina.jpgGCALBOHO8CAR47U3RCAJ8XIF1CAVAT2IJCAM1NV91CAIIEIECCAHS4YIOCAFR5DVMCA2N0C3OCAE61Y5ZCASQ1CELCAN4RRQFCAQIZ0J0CAIIAZ2SCAHZTLJFCAZ1O667CAFSY44UCAN1V1G0.jpg
-------------------------------------------------------------------

সুত্র, সম্পাদকীয় কলাম,দৈনিক ইত্তেফাক,৮ ই নভেম্বর ২০০৯।

আজ কিছু অপ্রিয় কথা লিখতে চাই। সাংবাদিক ও রাজনীতিকদের মধ্যে পার্থক্য এই যে, রাজনীতিকরা অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও অপ্রিয় সত্য কথা বলতে অথবা লিখতে চান না। কারণ, তারা জনপ্রিয়তা হারাতে বা বিতর্কিত হতে ইচ্ছুক নন। তাদের ভোট দরকার। ক্ষমতায় যাওয়া দরকার। সাংবাদিক বা কলামিস্টের এসব বালাই নেই। তাদের নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়া বা ভোট পাওয়ার মাথাব্যথা নেই। জনপ্রিয়তা হারাতে বা বিতর্কিত হতে তাদের অনেকের আপত্তি নেই। এই শ্রেণীর সাংবাদিকেরা নিজের বিবেক ও বিশ্বাস মতো কথা বলার জন্য জনপ্রিয়তা হারাতে রাজি থাকেন। পরম বন্ধুর সম্পর্কেও অপ্রিয় কথা লেখেন এবং বলেন। কারণ জনপ্রিয় থেকে ভোট পাওয়ার তাদের দরকার নেই। তারা ক্ষমতায় যেতে চান না। নিজেদের বিবেক-বিশ্বাস অনুযায়ী সত্য কথা বলতে চান।

বিখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক ওয়াল্টার লিপম্যান বলেছিলেন, ‘একজন প্রকৃত সাংবাদিকের কোনো বন্ধু থাকে না।” আমি ওয়াল্টার লিপম্যানের মতো অতো বড় মাপের সাংবাদিক অথবা কলামিস্ট নই। তথাপি আমার সাংবাদিক-জীবনেও দেখেছি, প্রকৃত সাংবাদিকতায় নিষ্ঠ থাকতে হলে অনেক বন্ধু হারানোর, এমনকি তাদের শত্রুতে পরিণত করার ঝুঁকিও নিতে হয়। এই ঝুঁকি নিতে এখনো ইচ্ছুক বলেই আজ কিছু অপ্রিয় কথা লিখতে চাই।

আমার আজকের অপ্রিয় কথাটি হলো, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামা এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দু’জনেই এখন একই সঙ্কট ও সমস্যার সম্মুখীন। একজনের সমস্যা ও সঙ্কটের পরিধি বিশাল এবং বিশ্বব্যাপী। অন্যজনের সমস্যা ও সঙ্কটের পরিধি তার দেশ-কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দু’জনেরই সঙ্কটের চেহারা অভিন্ন। ওবামা সারা বিশ্বে আমেরিকার বিনষ্ট ভাবমূর্তি উদ্ধারে তার স্বদেশবাসীর মনে এবং বিশ্বকে যুদ্ধ, সংঘাত ও সন্ত্রাসমুক্ত করার কাজে সারা বিশ্ববাসীর মনে বিরাট প্রত্যাশা সৃষ্টি করে হোয়াইট হাউসে প্রবেশে সক্ষম হয়েছেন।

অন্যদিকে শেখ হাসিনা বিএনপি-জামায়াত সরকারের পাঁচ বছরের দু:সহ দু:শাসন থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত করা এবং সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও অপশাসন-মুক্ত একটি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার বিপুল প্রত্যাশা দেশের মানুষের বুকে জাগিয়ে নির্বাচনে বিশাল বিজয় লাভ ও সরকার গঠনে সক্ষম হয়েছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ওবামার বিরাট জয়লাভ শেষে তার যে ঐতিহাসিক অভিষেক হয়েছিল, তার বিশালত্ব দেখে মনে হয়েছিল আমেরিকায় এই কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট এখন সারা বিশ্বের প্রেসিডেন্ট। আর বাংলাদেশে এই সেদিনের কারা নির্যাতিত শেখ হাসিনাকে ১৯৫৪ ও ১৯৭০ সালের মতো ঐতিহাসিক নির্বাচন-জয়ী হয়ে তার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের দৃশ্য দেখে মনে হয়েছিল, তিনি এবার দেশকে পরিবর্তন করতে পারবেন। কারণ, তিনিও নিশ্চয়ই পরিবর্তিত হয়েছেন। নিজে বদলালে দেশটাকেও বদলানো যায়।

একটা মজার ব্যাপার এই যে, এবারে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনে ওবামা ও হাসিনার শ্লোগান ছিলো অভিন্ন। ওবামার ছিলো ‘চেঞ্জ’ এবং হাসিনার ছিলো ‘দিন বদল’। অনেকে মনে করেন ওবামার শ্লোগানটি হাসিনা ধার করেছেন। আর ধার না করেও উপায় ছিলো না। আমেরিকা এবং বাংলাদেশ দু’দেশের মানুষই নিজ নিজ দেশে একটা বড় রকমের পরিবর্তন ঘটার জন্য অধীর এবং অধৈর্য হয়ে উঠেছিল।

ওবামা তার দেশের সাদা-কালো নির্বিশেষে সকল নাগরিকের মনে এই পরিবর্তনের অধীর আকাঙক্ষা টের পেয়েছিলেন। বুশ জুনিয়রের প্রশাসনের সন্ত্রাসী নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার সারা বিশ্ববাসীর মনে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। বুশ প্রশাসনের যুদ্ধাপরাধ সারা গণতান্ত্রিক বিশ্বে আমেরিকার নৈতিক নেতৃত্ব ও ভাবমূর্তিই শুধু ধ্বংস করেনি, এই প্রশাসনের আকাশচুম্বি যুদ্ধব্যয় ত্রিশের মন্দার চাইতেও বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দার সৃষ্টি করেছে, সন্ত্রাস, দারিদ্র্য ও দুর্নীতি বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে।

তাই আমেরিকার জনগণ এবং সারা বিশ্বের মানুষ চেয়েছে, শুধু আমেরিকায় বুশের নেতৃত্বাধীন রামসফিল্ড-ডিক চেনিদের নিউ কন রাজত্বের অবসান নয়; গোটা প্রশাসন এবং প্রশাসনের নীতির আমূল পরিবর্তন। আমেরিকায় বর্ণবাদীদের দাপট কম নয়। তা সত্ত্বেও সেদেশের সাদা-কালো নির্বিশেষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটাররা যে তাদের কাম্য পরিবর্তন ঘটানোর জন্য একজন কালো প্রেসিডেন্ট বেছে নিয়েছে তার কারণ, বুশ প্রশাসনের দুঃশাসনের কবল থেকে মুক্ত হওয়া এবং একটি সার্বিক পরিবর্তন ঘটানোর জন্য তারা উন্মুখ হয়ে উঠেছিল এবং সাদা বা কালো যে কোনো ব্যক্তি এই পরিবর্তন ঘটানোর জোরালো আশ্বাস দিতে পারবেন তাকেই তারা ভোট দেবেন বলে স্থির করেছিলেন আমেরিকার মানুষের মনের এই ইচ্ছাটি ওবামা সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। ফলে তার নির্বাচনের মূল শ্লোগান হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন চেঞ্জ বা পরিবর্তনের ডাক। সেই ডাকে শুধু আমেরিকার মানুষ নয়, সারা বিশ্বের মানুষ সাড়া দিয়েছে এবং ওবামাকে দেখতে চেয়েছে সারা বিশ্বের প্রেসিডেন্ট হিসেবে।

বাংলাদেশে গত ডিসেম্বর নির্বাচনে ওবামার এই ‘চেঞ্জের’ শ্লোগানটি শেখ হাসিনা যে শখের বশবর্তী হয়ে বেছে নিয়েছিলেন তা নয়। তিনিও বাংলাদেশের মানুষের মনের তীব্র পরিবর্তন-আকাঙক্ষা বুঝতে পেরেছিলেন এবং চেঞ্জ বা দিন বদলের শ্লোগানটি তার নির্বাচন-যুদ্ধের শ্লোগান হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে হাওয়া ভবনের অত্যাচার, দুর্নীতির দাপট, সন্ত্রাসের বাড় বাড়ন্ত অবস্থা, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির রকেট গতি, প্রশাসনে স্থবিরতা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছিলো। মাঝখানে দু’বছরের ওয়ান ইলেভেনের সরকারও তাদের এ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারেনি।

এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের দিন বদলের শ্লোগানে দেশের মানুষ মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছে এবং শেখ হাসিনা যদি নির্বাচনে কলাগাছকেও মনোনয়ন দিয়ে থাকেন, তাকেই ভোট দিয়েছে। হাসিনা দেশের মানুষের মনে দিন বদলের যে বিরাট প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছেন, ক্ষমতায় গিয়ে তা পূরণে কতোটা কিভাবে সক্ষম হবেন তা আগে ভেবে দেখেছেন কি না তা আমি জানি না। ওবামাও কি ভেবে দেখেছেন, তিনি সারা বিশ্বের মানুষের মনে যে বিশাল প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছেন, ক্ষমতায় বসে অত্যল্প সময়ের মধ্যে তা পূরণের পথে অন্ততঃ এক পা এগুতে না পারলে ব্যাকলাশের সম্মুখীন হতে পারেন? তার এডমিনিস্ট্রেশনের দশ মাস না যেতেই তো তার জনপ্রিয়তায় ভাটার টান লক্ষ্য করা যায়। নইলে তার নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া নিয়ে সারাবিশ্বেই কি এতোটা বিতর্কের সৃষ্টি হতো?

‘যতো সাধ ছিলো সাধ্য ছিলো না’। রবীন্দ্রনাথের এই কাব্যোক্তিটি হাসিনা এবং ওবামা দু’জনের জন্যই সত্য মনে হয়। চেঞ্জ বা দিন বদলের প্রতিশ্রুতি পালনে ওবামা ও হাসিনার সদিচ্ছা, সততা ও আন্তরিকতায় কেউ সন্দেহ করেন না। সন্দেহ এই প্রতিশ্রুতি পালনে তাদের সক্ষমতা ও সুযোগ সম্পর্কে। ওবামা দিন বদলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। কিন্তু এই দিন বদলের অঙ্গীকার তিনি পালন করবেন কাদের দ্বারা? হোয়াইট হাউসে, স্টেট ডিপার্টমেন্টে পেন্টাগনে তিনি যে প্রশাসনের ইনহেরিটেন্স গ্রহণ করেছেন, তা শুধু আগের বুশ প্রশাসনের নয়, তার আগেরও অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল এবং আধিপত্যবাদী হোয়াইট এস্টাবলিসমেন্ট। ওবামা তাদের হাতে বন্দি। প্রশাসনের উঁচু পর্যায়ে কিছু মুখ বদল প্রশাসনের চরিত্র ও নীতি বদল নয়। এই হোয়াইট এস্টাবলিসমেন্টের হাতে ওবামা এখন কার্যত বন্দি।

ওবামা যখন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী এবং প্রত্যহ দিন বদলের (ঈযধৎমব) জোরালো ঘোষণা দিচ্ছেন, তখন আমেরিকারই এক জনপ্রিয় বর্ষীয়ান বুদ্ধিজীবী সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন যে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ওবামা যদি তার ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত করার কাজে দৃঢ়ভাবে এগোন, তাহলে লিঙ্কন ও কেনেডির ভাগ্য তিনি বরণ করতে পারেন। আর প্রতিশ্রুতিগুলো থেকে সরে এলে দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আশা তার নেই। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী একজন ব্যর্থ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাকে হোয়াইট হাউস ত্যাগ করতে হবে।

হোয়াইট হাউসে ঢোকার গত দশ মাসে প্রেসিডেন্ট ওবামা তার চেঞ্জের প্রতিশ্রুতি পালনে খুব একটা এগুতে পেরেছেন তার প্রমাণ নেই। ইরাকে তিনি যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেননি। সরে আসতে পারেননি আফগানিস্তান থেকে। বরং আফগানিস্তানে সৈন্য সংখ্যা বাড়ানোর বুশ-নীতি অনুসরণই তিনি করতে চাচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের দস্যুবৃত্তির তিনি টুটি টিপে ধরতে পারেননি। পারেননি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিবাদ মেটাতে। বরং হোয়াইট হাউস থেকে বিশ্ব-ধিক্কারের মুখে বুশ বিদায় নেয়ার পরেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী গদগদ কক্তে বলছেন, “বুশই ভারতের শ্রেষ্ঠ বন্ধু।”

উত্তর কোরিয়া ও ইরান সম্পর্কে বুশ-নীতি থেকে ওবামা সম্পূর্ণ সরে আসতে পারেননি। দেশে স্বাস্থ্য পরিসেবা সংক্রান্ত ওবামা তার পরিকল্পনা সম্পর্কে কট্টর কনজারভেটিভ রিপাবলিকান এবং তার দলেরও একাংশের বিরোধিতা কতোটা কাটিয়ে উঠতে পারবেন সে সম্পর্কে সন্দেহ আছে। হয়তো তাকে আপস ফর্মুলায় যেতে হবে। অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিশ্বমন্দা রোধে তার প্রশাসনের পরিকল্পনার সঙ্গে তার আগের প্রশাসনের পরিকল্পনার খুব একটা পার্থক্য নেই। বরং বলা চলে, প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ওবামার কথা আর প্রেসিডেন্ট পদে বসার পর তার কাজের মধ্যে পার্থক্য দ্রুত বাড়ছে। তার সমালোচকেরা বলছেন, বুশ প্রশাসনের অনেক নীতিই তিনি কিছুটা নমনীয় ও সহনীয়ভাবে অনুসরণ করে চলেছেন।

বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার অবস্থাও অনেকটা প্রেসিডেন্ট ওবামার মতো বলে তার শুভাকাঙক্ষীদের কেউ কেউ আশঙ্কা করেন। নির্বাচনের কর্মসূচি ও প্রতিশ্রুতি পালনে তার সততা ও আন্তরিকতায় কেউ সন্দেহ করে না। কিন্তু এই সরকারের গত দশমাসের কার্যাবলীতে তাদের মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে, বিএনপি-জামায়াত আমলের নির্লজ্জ দলীয়করণের শিকার সিভিল-মিলিটারি এডমিনিস্ট্রেশন দ্বারা তিনি কি কাঙিক্ষত দিনবদলের কাজে এগুতে পারবেন? আবার একটি গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষে রাতারাতি এডমিনিস্ট্রেশনের খোলনলচে বদল সম্ভব নয়। তাহলে তিনি কি করবেন?

এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া সহজ নয়, প্রেসিডেন্ট ওবামার মতোই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও যে একই ধরনের সমস্যা ও সঙ্কটের সম্মুখীন, তা বোঝা যায় তার সরকারের গত দশমাসের কার্যাবলীতে। তার সরকার ক্ষমতায় আসার অব্যবহিত পর দেশে খাদ্যমূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিলো। তা আবার বাড়তে শুরু করেছে। বোঝাই যায়, হাওয়া ভবন নেই। কিন্তু হাওয়া ভবনের আশ্রিত অসাধু ব্যবসায়ী-সিন্ডিকেটগুলো আবার নতুন অভিভাবক খুঁজে পেয়েছে এবং মাথা তুলতে শুরু করেছে।

দেশে সন্ত্রাস বেড়েছে। এক্ষেত্রেও বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার আবার শুরু হওয়া এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ শুরু হতেই ঘাতক চক্র এবং তাদের দেশি-বিদেশি পৃষ্ঠপোষকেরা সক্রিয় হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করাই তাদের এখনকার তৎপরতার লক্ষ্য। এক্ষেত্রে শুধু দেশের শান্তি ও নিরাপত্তাই নয়, শেখ হাসিনার জীবনের নিরাপত্তাও হুমকির সম্মুখীন। পাকিস্তানে বেনজির হত্যার ট্রাজেডি থেকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও গণতান্ত্রিক দলগুলোর শিক্ষা নেওয়া উচিত।

বাংলাদেশে নির্বাচন-জয়ী মহাজোট ও গণতান্ত্রিক শিবির এখন নিষ্ক্রিয়। দেশের সচেতন ছাত্র সমাজের একটি প্রধান দল ছাত্রলীগে চলছে টেন্ডারবাজি ও পারস্পরিক হানাহানি। আওয়ামী লীগের ভেতরের ঐক্যও সুদৃঢ় নয়। প্রবীণ নেতাদের উপর দারুণ সন্দেহের দরুন প্রধানমন্ত্রীকে একটি নতুন মুখের অনভিজ্ঞ সরকার নিয়ে দেশ চালাতে হচ্ছে। সঙ্কটের সময় প্রধানমন্ত্রীর আশেপাশে থাকা দরকার অভিজ্ঞ ও নির্ভরশীল সহকর্মী। একটি সরকারে অধিকাংশ মন্ত্রী অনভিজ্ঞ ও নতুন হলে আমলাদের পোয়াবারো। অচিরেই গণতান্ত্রিক শাসন তখন আমলাতান্ত্রিক শাসনে পরিণত হয়। তা কোনো দেশের জন্যই কল্যাণকর নয়।

প্রেসিডেন্ট ওবামার মতোই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন একই ধরনের সমস্যা ও সঙ্কটের সম্মুখীন। তার বিদেশ নীতি যতোই সফল হোক, তার স্থায়ী সাফল্য নির্ভর করে দেশের আভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে সক্ষমতার উপর। যদি তাতে তিনি সক্ষম হন, তাহলে বিএনপি জামায়াতের ফুটো বেলুনে যতোই বাতাস ভর্তি করা হোক, তা আকাশে উড়বে না। কিন্তু যদি সরকার এই সমস্যা ও সঙ্কট মোকাবিলায় দ্রুত সক্ষম না হন, তাহলে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আশা দূরের কথা, দল হিসেবেই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ প্রশ্ন বোধক হয়ে দাঁড়াবে। আমার এই হুঁশিয়ারি আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে অপ্রিয় কথা মনে হতে পারে। কিন্তু অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকবে না।

লন্ডন, ৭ নভেম্বর, শনিবার ।। ২০০৯ ।।

SalimC's picture

শেখ হাসিনা নিজেই সঙ্কট ও সমস্যার সৃষ্টি করছেন

নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণকে তাদের রায় প্রদানের সুযোগ দেয়া হয়। আর জনগণের রায় নেয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করতে হয়, জনকল্যাণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে হয়। এ চিত্র গণতান্ত্রিক রাজনীতির খন্ডচিত্র মাত্র। নির্বাচনের পরই প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির। এই পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে ক্ষমতাসীন দল যদি ইশতেহার বাস্তবায়নে সমর্থ হয়, জনকল্যাণে আন্তরিক হয় এবং আইনের শাসনের মাধ্যমে মানবাধিকার সমুন্নত রাখে, কেবল তাহলেই বলা চলে যে, গণতন্ত্রের পথে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এর ব্যতিক্রম হলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এ জন্যই বলা হয়, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হলেই যে সরকার গণতান্ত্রিক হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তো গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারকেই ফ্যাসিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা গেছে। এ কারণে গণতান্ত্রিক সরকারের আচরণকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হয় এবং সরকারের ত্রুটিপূর্ণ আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে হয় বিরোধী রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের। সরকারকে সুপথে রাখার এই গণতান্ত্রিক আয়োজন কিন্তু সব সরকারের পছন্দনীয় নয়। বিশেষ করে কোনো সরকার যদি দেশী-বিদেশী কায়েমী স্বার্থের সাথে সংযুক্ত হয়ে পড়ে কিংবা ক্ষমতার তাপে অহংকারী হয়ে ওঠে তখন দেশে লক্ষ্য করা যায় নানা অশুভ চিত্র। সরকার তখন গণতান্ত্রিক চাপকে অকার্যকর করার জন্য রাজনীতিক, পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের কতককে বিশেষ সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে ক্রয় করে ফেলেন। এদেরকে বরকন্দাজ হিসেবে ব্যবহার করেন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। এতেও সুবিধা করতে না পারলে ক্রমেই বেড়ে যায় সরকারের জুলুম-নির্যাতনের তৎপরতা। তখন দেশের প্রশাসন যন্ত্র দেশের স্বার্থরক্ষার পরিবর্তে সরকারের অপশাসনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এমনকি জনগণের শেষ আশ্রয়স্থল বিচার বিভাগেও শুরু হয় সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপ।
দুঃখের বিষয় হলো, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২ বছরের অপশাসনের পর আমরা তথাকথিত যে গণতান্ত্রিক সরকার পেলাম, তাদের নয় মাসের শাসন আমাদের আশান্বিত করতে পারেনি। এ কারণে বর্তমান সরকারের অংশীদার বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপিও গত ১৯ অক্টোবর নোয়াখালী টাউন হলে দলের জেলা সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, সরকারের দিনবদলের শ্লোগান আমরা বুঝতে পারিনি। এখন দিনবদলের অর্থ হচ্ছে ক্ষমতা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখল ও টেন্ডারবাজির হাতবদল। শুধু রাশেদ খান মেনন নন, একথা আজ দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সরকারের দিনবদলের অঙ্গীকার আসলে দলের নেতাকর্মীদের দিনবদলের অঙ্গীকারে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।ফলে দিনবদলের শ্লোগান এখন প্রহসনের এক শ্লোগান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দিনবদলের চিত্র এখন আদালত অঙ্গনেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।উচ্চ আদালতে সরকারের আইন কর্মকর্তাদের অসংযত ও আইন বহির্ভূত আচরণে দেশের উচ্চ আদালতের বিচারিক কাজে বিঘ্ন ঘটছে।সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ার পরও হাইকোর্টের বিচারপতিরা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা এটর্নি জেনারেল, অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এবং ডেপুটি এটর্নি জেনারেলরা প্রায় প্রতিদিনই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে দায়েরকৃত মামলায় এমন সব আচরণ করছেন, যা সংশ্লিষ্টদের দুর্ভাবনায় ফেলেছে। উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।তার ওপর সরকারের আইন কর্মকর্তাদের ভূমিকা ন্যায়বিচারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলের আচরণ ও কর্মতৎপরতায় অবাক দেশের আইন বিশেষজ্ঞরা। বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিক উল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও অঙ্গভঙ্গি আইনের শাসনের পরিপন্থী। তারা উচ্চ আদালতকে ভয়ভীতি দেখিয়ে সবকিছু আদায় করতে চাচ্ছেন। কিন্তু তা হয় না। ইতোমধ্যে তারা তা টের পেয়েছেন।
ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার রক্ষার শেষ ভরসা যে আদালত, সেই আদালতকেই যদি ভয়ভীতি দেখিয়ে সরকার স্তব্ধ করে দিতে চান তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? এসব কি গণতান্ত্রিক সরকারের লক্ষণ? এ পথই কি দিনবদলের পথ? শুধু এই ক্ষেত্রেই যে সরকারের পদস্খলন ঘটেছে তা নয়, আরো নানা ক্ষেত্রে সরকারের আচরণ মানুষকে আশাহত করেছে। দুর্নীতির দায়ে বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্ত ভোলা-৩ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি মেজর (অবঃ) জসিম উদ্দিনের সদস্যপদ রক্ষায় খোদ প্রধানমন্ত্রী এবং নির্বাচন কমিশন (ইসি) সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছেন। ৫ বছর আগের কার্যকারিতা দিয়ে অবসর আদেশ পরিবর্তন করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্বাচন কমিশন ব্যক্তি জসিমের স্বার্থে পরিবর্তন করেছে সংশ্লিষ্ট আইন। তবু হয়নি শেষ রক্ষা। সব অনৈতিক চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশে বাতিল হয়ে যায় জসিমের সদস্যপদ। নিজেদের প্রণীত আইন লঙ্ঘন করায় নির্বাচন কমিশন এখন পড়েছে ভাব মর্যাদার সংকটে, এ সংকট অবশ্য তারা নিজেরাই সৃষ্টি করে আসছেন শুরু থেকেই। এখন কমিশন সেনা দফতরের ওপর দোষ চাপিয়ে মুখ রক্ষা করতে চাইছে।
বিগত মাসগুলোতে সরকারের কর্মকান্ডে মানুষের মন থেকে দিনবদলের আকাঙ্ক্ষা লুপ্ত হয়ে গেছে।বরং ‘দিনবদলের' বদলে মানুষের মনে এখন জেগে উঠেছে সরকার বদলের আকাঙ্ক্ষা।তবে সরকার বদলের আগে দেশের মানুষের দুর্ভোগ হয়তো আরো বাড়বে, মানবাধিকারও লঙ্ঘিত হবে নানাভাবে।এ ক্ষেত্রে আদালতের দিকেই চেয়ে থাকবে জনগণ।আদালত নিজ অবস্থানে যতটা দৃঢ় থাকবে মানুষের কাঙ্ক্ষিত সুবিচার ততটাই নিশ্চিত হবে।

Pogo's picture

???? Doi we have to read it?

Wow, what a leader Hasina Begum is? She is in the news with Obama! The way Ittefaq presented her... looks like she is Obama's boss. Both brothers are oiling Hasina to get get out of troubles. They are monsters. These borthers killed many innocent people and they are now bosses of many journalists. However, this kind of editorial (???) did fall through the cracks in Mr. Hasan's homework. Keep an eye on your Hasina ballon. Otherwise, it may burst any time.

ধন্যবাদান্তে,
পোগো

farmer's picture

Obama has lots of problem. Hasina has problem too?

Obama has problems and Hasina has problems; but Obama's problems & Hasina's problems are not same. BD jornalists lacking in analyzing capabilities, tried to write on something which has no commonalities.
Obama has problems, he is solving them, they will be solved.
Hasina has problems, she does not know how to solve, those problems will become more complex.
It is not editorial, just idiocy.