এই নিষ্ঠুর নিপীড়নের পথ পরিহার করুন
-ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
জিঘাংসা বা প্রতিশোধ স্পৃহায় সরকার কি একেবারেই অন্ধ, মানবিকতাবোধশূন্য নিষ্ঠুর এক যন্ত্রে পরিণত হয়েছে? সম্ভবত হয়েছেই তা না হলে ক্রসফায়ারের পক্ষে তারা এমন নির্লজ্জ অবস্থান নিতে পারত না।এই ক্রস ফায়ারের নামে সরকার প্রতিদিন বিচারবহির্ভূত পন্থায় নরহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ এরাই বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে এই ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিল।তারা কথা দিয়েছিল যে, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে ক্রসফায়ার তো হবেই না বরং সেই সময়ে ক্রসফায়ারে প্রতিটি হত্যাকান্ডের বিচার করা হবে। পাকচক্রের এই প্রতিশ্রুতি দানকারীরাই এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। ক্ষমতায় আসার পর ক্রসফায়ার বন্ধ হয়নি। সীমিতভাবে তা চলছিলই। তারপর সকল স্বাভাবিকতা উপেক্ষা করে দুর্বার গতিতে ক্রসফায়ারের মাত্রা বাড়ছে। এমন কোন দিন নেই যেদিন দেশে এভাবে বিচারবহির্ভূত পন্থায় নরহত্যা না হচ্ছে। আর এই প্রক্রিয়ায় নরহত্যা করতে গিয়ে সরকার সম্পূর্ণ নিরপরাধ লোকদেরও হত্যা করছে। নির্বিচার নরহত্যা চালাতে গিয়ে ভুল ভ্রান্তিও হচ্ছে। রাতে ক্রসফায়ারে খুন করে সকালে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করতে হচ্ছে। অসহায় নাগরিকরা প্রাণ হাতে নিয়ে এই নিষ্ঠুর দৃশ্য অবলোকন করছে। আপাতত তাদের হয়তো নীরব দর্শক বলা যাবে। কিন্তু এই নীরব দর্শকেরা চিরদিন নীরব থাকে না। তারা যখন সরব হয়ে ওঠে তখন পৃথিবীর কোন সরকারই আত্মরক্ষা করতে পারে না। এ পর্যন্ত পারেনি।
শুধু ক্রসফায়ারই নয়। সরকারের নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতা আর এক উদাহরণ যথেচ্ছ গ্রেফতার ও রিমান্ড। ২০০৭-০৮ সালের আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রঘাতী এক অসাংবিধানিক সামরিক সরকারকে ডেকে এনে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। আওয়ামী লীগের কাছে সব সময়ই গণতন্ত্রের চেয়ে সমরতন্ত্র বেশি প্রিয়। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকেও তারা ভালবেসে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। সেনাপতি এরশাদ যখন গণতন্ত্র হত্যা করে সামরিক আইন জারি করেছিল তখনও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেছিলেন, গণতন্ত্রের ঘাতক সামরিক সরকার আসায় ‘আমি অসুখী নই' (আই অ্যাম নট আন হ্যাপী)। সামরিক আইন পেলে হ্যাপী থাকে আওয়ামী লীগ। কিন্তু চারদলীয় জোটের যাত্রা ভঙ্গ করতে গিয়ে ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দীনের সরকারের কাছে তাদের যে নাক কাটা যায়নি তা নয়। শেখ হাসিনার নিজেকেও জেলের ভাত খেতে হয়েছে। তার দলের বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতাও ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দীনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সে সরকার শেখ হাসিনাকে বিশাল চোর প্রতিপন্ন করার জন্য ঐসব নেতাকে রিমান্ডে নিয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নানা কথা বলিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের ধরে নিয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করিয়েছেন। সেজন্য তার বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়েছে। তারা শেখ সেলিমকে দিয়ে এও বলিয়েছে যে, শেখ সেলিম ঘুষ নিয়ে সে টাকার একটা বিরাট অংশ শেখ হাসিনাকে দিয়ে বাকি টাকা তিনি নিজে ভোগ বিলাসে ব্যয় করেছেন। তা সত্ত্বেও এখন জালেমদের রক্ষার জন্য শেখ হাসিনা নিজেও এক ধরনের মরিয়া হয়ে উঠেছেন। দলীয় নেতাদের পরামর্শ দিয়েছেন তারা যেন ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দীনের সরকারকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেন।
বন্দী বা আসামীদের কাছ থেকে নিজেদের পছন্দমতো জবাব বের করে নেয়ার জন্য রিমান্ডের রেওয়াজ বহুদিনের। এক্ষেত্রে কোন সরকারই আইন-কানুনের খুব একটা তোয়াক্কা করেনি। মইনউদ্দীন-ফখরুদ্দীনের সরকার এটাকে লাইসেন্স হিসেবে গ্রহণ করে। তারা তথাকথিত অভিযুক্তদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে কথা আদায়ের রেকর্ড সৃষ্টি করেছিল। বর্তমান মহাজোট সরকার সেই সরকারেরই ধারাবাহিকতা মাত্র। ফলে এই সরকারে নীতি-আদর্শ, কর্মপন্থা, আচার-আচরণ, নির্যাতন একই রকম রয়ে গেছে। মইনউদ্দীন-ফখরুদ্দীনের সরকার নাগরিকদের রিমান্ডে নিয়ে যে নির্যাতন করেছে তার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষেরা। রাজনীতিবিদদের ওপর এই নির্যাতন শারীরিকের চাইতেও মানসিকভাবে অনেক বেশি ছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের ওপর তাদের নির্যাতন ছিল অবর্ণনীয়, অকল্পনীয়। আর তা ছিল শারীরিক। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা আয়োজিত অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষের ওপর সে নির্যাতনের কাহিনী শুনে অশ্রুসজল হয়ে উঠেছে সকল শ্রোতার মুখ। তখনও যে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা তারচেয়ে কাঙ্ক্ষিত জীবনের কাহিনী বের করে আনাই ছিল যেন মূল উদ্দেশ্য। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা ভঙ্গ করে সেসব রগরগে কাহিনী পত্রিকায় প্রচার করতে বেশি আগ্রহী ছিল। সংবাদপত্রগুলোও কখনও চাপের মুখে কখনও সকল নীতিমালা ভঙ্গ করে সেসব কাহিনী প্রচার করে পত্রিকার কাটতি বাড়াবার চেষ্টা করেছে। এখনও ঘটছে তাই।
সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে শেখ ফজলে নূর তাপসের মতিঝিলস্থ অফিসের সামনে কে বা কারা একটি বোমা নিক্ষেপ করে। তাতে বেশ কয়েক ব্যক্তি আহত হয়। ফজলে নূর তাপস সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বোমার অাঁচ তার গায়ে লাগেনি। বিএনপির একজন সাবেক এমপিও উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়। বোমাটি ফজলে নূর তাপসের উদ্দেশে নাকি বিএনপির ঐ সাবেক এমপির উদ্দেশে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল তাও কেউ নির্ণয় করার চেষ্টা করেনি। বরং শুরু থেকেই বলা হচ্ছে যে, বোমাটি ফজলে নূর তাপসকে লক্ষ্য করেই ছোঁড়া হয়েছিল। এবং সঙ্গে সঙ্গেই আওয়ামী মহল থেকেই একযোগে প্রচার করা শুরু হয় যে, শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীরাই বোমা মেরে ফজলে নূর তাপসকে হত্যা করতে চেয়েছিল।
আর যায় কোথায়। এই বোমা নিক্ষেপের লক্ষ্য ও অন্যান্য কারণ অনুসন্ধান বাদ দিয়ে এমনকি বোমার প্রকৃতি নির্ধারণ না করেই শেখ মুজিব হত্যাকারীদের পরিবারের সদস্যদের গণহারে গ্রেফতার করা শুরু হয়ে গেল। উল্লেখ্য, শেখ মুজিব হত্যা মামলার আপিল শুনানি এখন আদালতে চলছে।
এই ধরনের বোমা হামলার অন্য কোন সম্ভাব্য কারণ কেউ অনুসন্ধান করে দেখার চেষ্টা করল না। কেউ কেউ বলছেন, এই বোমা হামলা যদি তাপসকেই লক্ষ্য করে হয় তাহলে তা হয়ে থাকতে পারে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলে। কারও কারও অভিমত হচ্ছে, তাপসকে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিতে পারে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে। কিন্তু তার কোন পরিচিতি নেই। তার অনুকূলে সাড়া জাগিয়ে তোলার জন্যও এই বোমা হামলা হয়ে থাকতে পারে। আবার কারও কারও মতে, শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারের সদস্যদের আজীবন রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিধান করে যে আইন পাস করা হয়েছে তাতে নিরাপত্তা সুবিধা থেকে বাদ পড়েছেন মুজিব পরিবারের ঘনিষ্ঠ দুই সদস্য শেখ তাপস ও তার চাচা শেখ ফজলুল করিম সেলিম। ঐ বোমা নিক্ষেপের ঘটনার পর তাদের দু'জনকেও বেআইনীভাবে পুরো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সুবিধা দেয়া হয়েছে। কিন্তু মুজিব হত্যাকারীরাই এই বোমা হামলার জন্য দায়ী এরূপ প্রচার চালিয়ে তদন্তকারীদের দৃষ্টি অন্য কোনদিকে প্রসারিত করার পথও রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে।
ঐ হামলার জন্য ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে মুজিব হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত মেজর ডালিমের ছোট ভাই স্বপন বীর বিক্রমকে। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত কর্নেল রশীদের কন্যা মেহনাজ ও তার চার মাসের শিশু কন্যাকে। গ্রেফতার করা হয়েছে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত কর্নেল মহিউদ্দিনের দুই ছেলে মাহাবুবুল হাসান ও নাজমুল হাসানকে। আর গ্রেফতার হয়েছেন ফ্রিডম পার্টির নেতা বলে কথিত রহিম ও শফু।
এক্ষেত্রে মেহনাজ রশীদের গ্রেফতারের দৃশ্য ছিল অবর্ণনীয়। তার চার মাসের শিশুকন্যাসহ মেহনাজ রশীদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাপসের অফিসের সামনে বোমা হামলায় সে একজন অংশগ্রহণকারী। যে কায়দায় তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসা হয় তা ছিল নিষ্ঠুর ও অমানবিক। এক্ষেত্রে সরকার গ্রেফতার করেই ক্ষান্ত হয়নি। মেহনাজ রশীদকে তিন দফায় ১২ দিনের রিমান্ডে নিয়ে যে নির্যাতন করা হয় তাও অমানবিক এবং এদেশের মানুষের মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সারাদেশের মানুষ এই গ্রেফতারের ঘটনায় সরকারকে ধিক্কার দিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু কথিত যে বোমা হামলার ঘটনায় মেহনাজকে গ্রেফতার করা হলো সে ব্যাপারে তার কাছ থেকে কোন তথ্যই পাওয়া যায়নি, বরং তার ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনীগুলোকে রগরগে করে মিডিয়ায় বর্ণনা করল তদন্তকারী কর্মকর্তারা। যার সঙ্গে বোমা হামলার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। আর আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এই যে, দেশের সংবাদপত্রগুলো মেহনাজের ব্যক্তিগত জীবনের সে কাহিনী সোৎসাহে প্রচার করল, এক্ষেত্রে নীতি নৈতিকতার ধার ধারল না, এমনকি দেশের প্রাচীনতম কোন কোন সংবাদপত্রও। কেউ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করল না মেহনাজের এসব ব্যক্তিগত ঘটনার সঙ্গে বোমা হামলার সম্পর্ক কী। তাই কখনও কখনও মনে হয় আমাদের সমাজের যে অধোগতি, যে নৈরাজ্য তার জন্য মিডিয়াও কম দায়ী নয়।
মেহনাজ রশীদ ও তার চার মাসের শিশুকন্যাকে রিমান্ডে নেয়ার ঘটনায় সারাদেশে যে ছি ছি রব উঠেছে, তার প্রতি যে সহানুভূতি, যে সহমর্মিতার সৃষ্টি হয়েছে, তদন্তকারী কর্মকর্তারা সম্ভবত তা প্রতিরোধ করার জন্য বোমা হামলার চেয়ে মেহনাজের ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনী নিয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কিন্তু আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস এ সব রগরগে কাহিনীকে শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যাবে না। আমরা সরকারের কাছে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি চাই। সেটা সরকারের দায়িত্বও। সে দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হলে জনগণ তাদের ক্ষমা করবে না।
