শুনানি শেষ, রায় ১৯ নভেম্বর
Thu, Nov 12th, 2009 1:40 pm BdST
Dial 2324 from your mobile for latest news
ঢাকা, নভেম্বর ১২ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- বঙ্গবন্ধু মামলার আপিলের রায় হবে আগামী ১৯ নভেম্বর। ২৯ দিন শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগ এ তারিখ ঠিক করেছে।
বঙ্গবন্ধু মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে আসামি পক্ষের আপিল শুনানির জন্য গত ৪ অক্টোবর বেঞ্চ গঠনের পরদিন এ মামলার শুনানি শুরু হয়।
মামলার পেপার বুক উপস্থাপন শেষ হলে ১৫ অক্টোবর থেকে শুরু হয় যুক্তিতর্ক। যুক্তিতর্ক শুনানির পর বৃহস্পতিবার জবাব দেওয়া শেষ করেন আসামিপক্ষের কৌঁসুলিরা।
বিচারপতি মো. তাফাজ্জাল ইসলামের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ আপিল আবেদনের ওপর ২৯তম দিনের শুনানি নিয়ে রায়ের তারিখ ধার্য করেন।
ওই বেঞ্চের অপর বিচারপতিরা হলেন- মো. আবদুল আজিজ, বি কে দাস, মো. মোজাম্মেল হোসেন ও সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এস কে সিনহা)।
রায়ের তারিখ ঠিক হওয়ার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, "জাতি এখন অধীর আগ্রহে রায়ের জন্য অপেক্ষা করছে।"
প্রায় একই কথা বলেন এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি আনিসুল হকও।
তিনি জানান, ২০০৭ সালের ২৩ জুলাই পাঁচটি যুক্তিতে আপিল বিভাগ আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেছে। যুক্তি পাঁচটি হলো হাইকোর্টের তৃতীয় বিচারপতি আইনসম্মতভাবে রায় দেননি, এজাহার দায়েরে বিলম্ব হয়েছে, সেনা বিদ্রোহ ও ষড়যন্ত্র হয়েছে এবং হাইকোর্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করেনি।
আনিসুল হক বলেন, "প্রত্যেক বিষয়ে আদালতে বক্তব্য রেখেছি। ২৯ দিন শুনানি শেষে আমরা একটি রায় পাবো। এটি জাতির জন্য, দেশের আইনের শাসনের জন্য ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি। এ মামলার বিচারের জন্য জাতির প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে।
এ সময় বঙ্গবন্ধুসহ ওই দিন যারা নিহত হয়েছেন, তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন তিনি।
আনিসুল হক বলেন, "আমরা ১৯ নভেম্বরের অপেক্ষায় আছি। ব্যক্তিগত আবেগপ্রকাশের সময় এখনো আসেনি।"
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। সেদিন হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও আরেক বোনের ছেলে শেখ ফজলুল হক মনিকেও।
শেখ মনির ছেলে শেখ ফজলে নূর তাপস বঙ্গবন্ধু মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্যানেল আইনজীবীর অন্যতম।
তাপস সাংবাদিকদের বলেন, "১৯ নভেম্বর রায়ের জন্য জাতির সঙ্গে আমিও অপেক্ষায় থাকবো।"
রাষ্ট্রপক্ষের আরেক প্যানেল আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু বলেন, "১৯৯৬ সালের এই দিনে দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বাতিল করার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছিলো। ৩৪ বছর অপেক্ষার পর বিচার কাজ শেষ হলো। আশা করছি, ন্যায় বিচার পাবো।"
১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মোশতাক সরকার দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারি করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করেছিলেন। ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার ওই অধ্যাদেশ বাতিল করে।
বৃহস্পতিবার শেষ দিনের শুনানিতে বক্তব্য রাখেন আসামিপক্ষের কৌঁসুলি খান সাইফুর রহমান ও আব্দুর রেজ্জাক খান।
আসামি সৈয়দ ফারুক রহমান ও মহিউদ্দিন আহমেদের কেঁৗঁসুলি খান সাইফুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, "মামলা দেরিতে দায়েরের কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা আদালতে উপস্থাপন করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। সেনা আইনের ধারা তুলে ধরে দেখিয়েছি, এর বিচার কোর্ট মার্শালে হতে হবে।"
সেনা আইনে ছাড়া বিচার হবে না দাবি করে তিনি জানান, সেনা আইনে যেমন মৃত্যুদণ্ড রয়েছে, তেমনি যে কোনো কম শাস্তিও রয়েছে। তবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নেই।
ন্যায় বিচার পাবেন বলে আশা করছেন কিনা- জানতে চাওয়া হলে প্রশ্ন এড়িয়ে তিনি বলেন, "ধন্য আশা কুহকিনী। আমি ভবিষ্যতদ্রষ্টা নই।"
বঙ্গবন্ধুর 'ঘাতক'-এর পক্ষে মামলা লড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, "এটা পেশাগত কাজ। রোগীর সঙ্গে ডাক্তারের যে সম্পর্ক; আইনজীবীর সঙ্গে তার মক্কেলেরও ওই সম্পর্ক।
"বাংলাদেশে মরুভূমি আমি দেখিনি। মরুভূমির সঙ্গে তুলনাও করতে চাইনা। আমি শ্যামলিমা দেখি।"
বৃহস্পতিবারের শুনানিতে খান সাইফুর রহমান জিয়া হত্যার বিচার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, জিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিদ্রোহের বিচার হয়েছে। হত্যা মামলার বিচার হয়নি।
সাইফুর বলেন, "বঙ্গবন্ধুকে যখন দোতলা থেকে নামানো হয়, তখন হত্যার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। এমনকি এ মামলার কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষীও বলেনি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হবে।"
তিনি আদালতকে জানান, "লন্ডনভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেলের ভিডিওতে সৈয়দ ফারুক রহমান ও খন্দকার আবদুর রশিদের যে সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়েছে, সেখানে তারা ১৫ আগস্ট বিদ্রোহের কথা বলেছে। তাই ১৫ আগস্ট সেনা বিদ্রোহ হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কোনো পরিকল্পনা ছিল না।
খান সাইফুর রহমানের পর আরেক আসামি সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খানের কৌঁসুলি আবদুর রেজ্জাক খান শুনানিতে অংশ নেন।
এতে তিনি দাবি করেন, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খানকে ১৭দিন রিমান্ডে রেখে তারপর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আফতাবউদ্দিন আহমেদ জঙ্গি বনাম বাংলাদেশসহ উচ্চ আদালতের তিনটি নজির উপস্থাপন করে তিনি বলেন, সঠিক বিধান মেনে শাহরিয়ার রশিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়নি।
হত্যার অভিন্ন উদ্দেশ্যর বিষয়ে প্রিভি কাউন্সিলের দুটি নজির উপস্থাপন করে রেজ্জাক খান বলেন, হত্যার অভিন্ন উদ্দেশ্য ছিল না।
ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চলের সর্বোচ্চ আদালতকে প্রিভি কাউন্সিল বলা হতো।
সাক্ষ্য উপস্থাপন করে তিনি বলেন, ঘটনার সময় শাহরিয়ার রশিদ ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে ছিলেন না। ঘটনার পর সে রেডিও স্টেশনে গিয়েছিল। সে ক্ষোভের জন্য চাকরি ছেড়ে দিয়েছিল। ১৫ আগস্ট চিফ অব জেনারেল স্টাফ (বিগ্রেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ) ডাকলে সে চাকরিতে যোগ দেয়।
রেজ্জাক খান আরো বলেন, শাহরিয়ার মেজর জেনারেল খলিলুর রহমানের স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পায়। শাহরিয়ার রশিদের ভূমিকা খলিলুর রহমানের মতো। এতে বলা যায়, ১৫ আগস্টের ঘটনায় কিছু সেনা কর্মকর্তা সাক্ষী, কিছু আসামি ও কিছু নীরব দর্শক।
এ মামলায় নিু আদালত ৬১ জন সাক্ষীর প্রত্যেকের সাক্ষ্য ও জেরা পর্যালোচনা না করে রায় দেয় বলেও উচ্চ আদালতের কাছে দাবি করেন তিনি।
খুনিদের ডিফেন্ড করছি না দাবি করে রেজ্জাক খান বলেন, "পেশাদার হিসেবে আইনজীবীর দায়িত্ব পালন করছি। আমরা ন্যায় বিচার চাচ্ছি। আশা করি, আদালত ন্যায় বিচার দেবেন।"
আসামিপক্ষের শুনানি শেষ হলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতে বলেন, "আজ শুনানির ২৯তম দিন। মরুভূমির মধ্য দিয়ে আমরা হেঁটেছি। আজ বিচারালয় মরু উদ্যানে পরিণত হয়েছে। মামলার ফল যাই হোক না কেন কোনো পক্ষের অসন্তুষ্টির কারণ নেই।"
আপিলটির দীর্ঘ শুনানি গ্রহণ করার জন্য আদালতকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, "আজ আমরা ইতিহাসের অংশ হলাম। এটি একটি বড় সুযোগ।"
এরপর আদালত সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, শুনানি শেষ হলো। ১৯ নভেম্বর রায় প্রদানের তারিখ ধার্য করা হল।
বঙ্গবন্ধু হত্যার ঘটনায় ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর ২৪ জনকে আসামি করে মামলা হয়। বিচারিক আদালত ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে হাইকোর্ট ১২ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখে। এরপর পাঁচ আসামি সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন।
শাহরিয়ার রশিদের কৌঁসুলি রেজ্জাক খান সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনার দিন যারা ওই বাড়িতে (বঙ্গবন্ধু ভবন) যান, তার মধ্যে শাহরিয়ার রশিদ ছিলেন না। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিলো না।
তিনি বলেন, শাহরিয়ার রশিদের বিরুদ্ধে এমন কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই যাতে তাকে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেতে পারে।
এ মামলায় তার বিরুদ্ধে হত্যায় সহযোগিতার অভিযোগ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
রেজ্জাক খান আরো বলেন, ১৫ আগস্ট ঘটনা ঘটেছে সকাল পাঁচটার মধ্যে। সেখানে শাহরিয়ার ছিল না। সে যায় রেডিও স্টেশনের ঘটনার পর। ঘটনার পর রেডিও স্টেশনে, বঙ্গভবনে যাওয়া ও থাকা এবং চাকরিতে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ হয় না। জনশ্র"তি ওপর ভিত্তি করে শাহরিয়ার রশিদকে এজাহারে আসামি করা হয়েছে। আমি ন্যায় বিচার চাই।
আপিলকারী অপর দুই আসামি বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিনের কৌঁসুলি ছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন।
এ মামলায় অ্যাটর্নি জেনারেলকে সহায়তা করতে সরকার ১৮ জন আইনজীবী নিয়োগ দেয়।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এটি/এজে/এমআই/এসএইচ/১৮৫৪ ঘ.
WARNING: Any unauthorised use or reproduction of bdnews24.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes copyright infringement liable to legal action.
