বেপরোয়া ধর্ষণ-মিছিল দিন বদলের আলামত!

বেপরোয়া ধর্ষণ-মিছিল দিন বদলের আলামত!
পিরোজপুরে স্থানীয় ছাত্রলীগ ক্যাডার ও তার সহযোগিরা এক স্কুল ছাত্রীকে পাশবিকভাবে ধর্ষণ করে তার ভিডিও চিত্র ধারণ করেছে। এই পাশবিক ও বর্বর ঘটনায় এলাকায় ধিক্কার ও নিন্দাবাদের ঝড় উঠলেও পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন ধর্ষক ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করে আইনের হাতে তুলে দিতে গড়িমসি করছে। প্রশাসন ও পুলিশের এই আচরণে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ। এ ব্যাপারে স্থানীয় আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্যের নিরবতা এবং পরোক্ষভাবে ধর্ষকদের পক্ষ নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। উল্লেখ্য, পিরোজপুরের স্থানীয় সংসদ সদস্য ইতোমধ্যেই তার কর্মকান্ডের মাধ্যমে নিজেকে অঘোষিত দাপুটে মন্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখিও হয়েছে। তার দাপটে থানা পুলিশ ও প্রশাসন তটস্থ থাকে এবং বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক তৎপরতা পর্যন্ত বিঘ্নিত করা হচ্ছে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনার কারণে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন পিরোজপুরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। এসব কারণেই পিরোজপুরে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ তাদের অঙ্গ সংগঠনের ক্যাডাররা সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ধর্ষণসহ নানা অসামাজিক কাজে বেপরোয়া হয়ে মাঠে নেমেছে। তারা জানে যে, তারা যত অপকর্মই করুক, তাদের রক্ষক-গডফাদার রয়েছে এবং পুলিশ ও প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে না। কেননা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তাদের ক্যাডাররা গোটা দেশকে মগের মুল্লুকে পরিণত করেছে। প্রশাসন ও পুলিশের নিরঙ্কুশ দলীয়করণ করার পর আইনের শাসন মুখ থুবড়ে পড়েছে। পিরোজপুরের পরিস্থিতি তার চেয়ে ব্যতিক্রম নয়।
পিরোজপুরে ছাত্রলীগ নেতা ধর্ষক টাইগার মামুন ও তার সহযোগী গাজা মনির এখনও গ্রেফতার হয়নি। পুলিশ প্রশাসন বলছে, গ্রেফতার অভিযান চলছে। কিন্তু লাঞ্ছিতা স্কুল ছাত্রীর অভিভাবক এবং স্থানীয় জনগণ পুলিশের আন্তরিকতা নিয়ে সন্দিগ্ধ। অপরাধীরা সরকারি দলের ক্যাডার হওয়ায় এ ব্যাপারে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে। ধর্ষক মামুন অপরাধ ঢাকা দিতে প্রচার করেছে যে, উক্ত ধর্ষিতা স্কুল ছাত্রীর সাথে গোপনে তার বিয়ে হয়েছে। কিন্তু ধর্ষিতা ছাত্রী ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থিত হয়ে বলেছে, বিয়ে হওয়ার দাবি মিথ্যা এবং তাকে স্কুলে যাওয়ার পথে উক্ত মামুন ও তার সহযোগিরা জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে জনৈক এডভোকেট শাহ আলমের বাড়ি নিয়ে তার শ্লীলতাহানি করা হয়। টাইগার মানুনের সহযোগিরা এ ঘটনার ভিডিও চিত্র ধারণ করে ঘটনা প্রকাশ না করার জন্য তাকে হুমকি দেয়। স্কুল ছাত্রীটির সাথে আসামীর কোনো পূর্ব সম্পর্ক থাকলে এবং উভয়ের মধ্যে সমঝোতা থাকলে এ ধরনের পাশবিক ঘটনা ঘটতে পারে না। তাছাড়া ঘটনার ভিডিও চিত্র ধারণ এবং ধর্ষিতাকে শাসিয়ে দেয়ার মধ্য দিয়েই প্রমাণ হয় যে, এর মধ্যে কোনো পূর্ব সম্পর্কের ব্যাপার নেই। ধর্ষক নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করতে বলে বেড়াচ্ছে যে, স্কুল ছাত্রীটি তার মামাতো বোন। তবে স্কুল ছাত্রীটি এ ধরনের সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছে। যদি স্কুল ছাত্রীটি আসামী মামুনের বোনই হবে, তবে তার দায়িত্ব হচ্ছে বোনের সম্ভ্রম রক্ষা করা। তা না করে সে পাশবিক লালসার শিকার বানিয়ে ঘটনার ভিডিও চিত্র ধারণ করে নিজেকে বেপরোয়া পেশাদার অপরাধী হিসেবে প্রমাণ করেছে। সুতরাং এ ধরনের পাশবিক চরিত্রের দুর্বৃত্তদের সমাজদেহ থেকে উৎপাটন করা সম্ভব না হলে সমাজ ক্রিমিনালদের আখড়ায় পরিণত হবে।
পিরোজপুরের পুলিশ ধর্ষণের ব্যাপারে এডভোকেট শাহ আলমের বাসা থেকে জনৈকা আলেয়া রানীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যায়। এদিকে ধর্ষকদের গ্রেফতারের ব্যাপারে পুলিশের আন্তরিকতা ও জোর তৎপরতা না থাকায় এলাকাবাসী হতাশ ও উদ্বিগ্ন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, ধর্ষকরা এলাকা থেকে পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করতে পারে। এমনকি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতও চলে যেতে পারে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের চাপে পুলিশী অ্যাকশন মন্থর হয়ে আছে এবং সময়-সুযোগমতো আসামী পক্ষ বাদী পক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে মামলা তুলে নেবার চাপ দেয়ার কৌশল প্রয়োগের কথা ভাবছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দলের দুর্বৃত্ত-ধর্ষকদের ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা না নেবার ব্যাপারে এ রকম ঘটনা অহরহ ঘটছে।
এদিকে পিরোজপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার নারীবাদী ও সুশীল মানবাধিকার কর্মীরা পিরোজপুরের স্কুল ছাত্রীর গণধর্ষণের বিষয় নিয়ে কোনো প্রতিবাদ না করায় তাদের মানসিকতা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ ও নিন্দা জমে উঠেছে। নারী সংগঠনগুলো ও সুশীলদের সংগঠনগুলো সরকারিদলের অপরাধীদের ব্যাপারে প্রতিবাদ করাকে দায়িত্ব মনে করেন না। বরং এসব ব্যাপারে দায়িত্ব এড়ানোকেই তারা মহৎকর্ম বলে মনে করেন। পিরোজপুরের লোমহর্ষক ধর্ষণের ঘটনায় এসব সংগঠনের নীরবতায় প্রশাসন ও পুলিশও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার বৃত্ত ভেংগে আসামীদের গ্রেফতারে তেমন সিরিয়াস নয়। পুলিশ বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারলেই যেন বেঁচে বর্তে যায়। এই একই ঘটনা যদি কোন পুলিশ কর্মকর্তা বা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের কন্যা বা বোনের ক্ষেত্রে ঘটতো, তাহলেও কী তারা দায় এড়িয়ে যেতেন? উল্লেখ্য মাস কয়েক আগে এই পিরোজপুরেই বখাটে ছাত্রলীগ কর্মীদের বানোয়াট অভিযোগে স্থানীয় পুলিশ ৩ জন পর্দানশীন নারীকে জঙ্গি সন্দেহ করে গ্রেফতার করে এক ন্যক্কারজনক ইতিহাস তৈরি করেছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই পুলিশ তাদেরকে রিমান্ডে নিয়ে মানসিকভাবে নির্যাতন করে। এমনকি ঐ তিন নিরীহ পর্দানশীন নারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা পর্যন্ত পাঠানো হয়। সরকারি দলের লোকদের রাজনৈতিক চাপে পুলিশ তিন নারীকে নিয়ে যে ঘৃণ্য তৎপরতা চালিয়েছে, তা কোন সভ্য দেশে কল্পনাও করা যায় না। এসবই হয়েছে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক আনুগত্যবাদী পুলিশ-প্রশাসনের তাদের প্রভুমহলকে খুশী করার জন্য। পিরোজপুরে সেই একই পুলিশ প্রশাসন রয়েছে, যারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর দায়বদ্ধতা এবং আইনের শাসনের দাবি পূরণের চেয়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের সেবা করে চাকরি ও প্রমোশন নিশ্চিত করতে চান। এ ধরনের রাজনৈতিকভাবে অন্ধ প্রশাসনের কাছে ধর্ষিতা নারীর ন্যায় বিচার পাবার সুযোগ কোথায়? পিরোজপুরের স্কুল ছাত্রীর ধর্ষণের ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বিশেষ করে সরকারি দলের রাজনৈতিক ক্যাডারদের ধর্ষণের পাশবিকতার যদি বিচার না হয়, তাহলে গোটা দেশের নারীরা এসব দুর্বৃত্তদের ভয়ে আতংকিত থাকবে। পিরোজপুরের ধর্ষণের ঘটনাটি এ দেশের উচ্চকণ্ঠ নারীবাদী ও সুশীল অাঁতেলদের দৃষ্টি এড়ালেও এই ঘটনায় নেদারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত অ্যালফন হেনেকোস পর্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের কর্মীদের মাধ্যমে নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। ছাত্রলীগের কর্মীরা এক স্কুল ছাত্রীকে গণধর্ষণ করলেও তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তবে নেদারল্যান্ড রাষ্ট্রদূতের হয়তো এ খবর জানা নেই যে, এই আওয়ামী লীগেরই আর এক ছাত্র ক্যাডার মানিক জাহাংগীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের সেঞ্চুরী উদ্যাপন করেছিল। আওয়ামী লীগ তাকেও পুরস্কৃত করেছিল। ধর্ষক, দুর্বৃত্ত, চাঁদাবাজ, দখলদার, টেন্ডারবাজ, খুনী যদি আওয়ামী লীগ দলের কেউ হয়, তবে তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকার কখনও আইনী ব্যবস্থা নেয় না, বরং তাকে সর্বাত্মকভাবে রক্ষা করে। এটাই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আর এ কারণেই সারাদেশে আওয়ামী লীগের ন' মাসে নারীর ওপর সহিংসতা তথা ধর্ষণ ও এসিড নিক্ষেপ আবার বেড়ে গেছে। আওয়ামী লীগ ঘরানার দুর্বৃত্তদের খাঁচাবন্দী করা না গেলে এটা আরও বাড়বে।
এরই মধ্যে পটুয়াখালীর কলাপাড়া থেকে খবর এসেছে যে, সেখানে গণধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দেবার ব্যাপারে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা চেষ্টা চালাচ্ছেন। ধর্ষিতাকে অর্থ প্রদান ও ধর্ষককে দোররা মারার মাধ্যমে ধর্ষককে আইনী বিচার থেকে রক্ষার চেষ্টা চলছে। ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রামের শাহনাজ বেগম নামের এক স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার গৃহবধূ পিয়ারা বেগমের ওপর পাশবিক নির্যাতনের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে সারাদেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি নারীর সুরক্ষার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভিত্তি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সরকারের রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত পোষণ ও প্রশাসনকে দলীয়করণ করার কু-সংস্কৃতি বন্ধ না হলে ধর্ষণ-সংস্কৃতিও বন্ধ হবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের নারীরা দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে একজন শক্তিমান নারী প্রধানমন্ত্রী থাকতেও যদি নিরাপত্তা না পায়, তাহলে এর বিচার কার কাছে চাইবে? প্রধানমন্ত্রী এবারেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কাছে প্রধানমন্ত্রী পদে ‘নারীর' অধিষ্ঠানকে বাংলাদেশের জন্য গর্ব বলে উল্লেখ করে এসেছেন। কিন্তু একজন নারী প্রধানমন্ত্রীর শাসনকালেও যদি নারীরা সুরক্ষা না পায়, গণধর্ষণের বিচার না পায়, তাহলে তার দায় কার? নারী নির্যাতন বৃদ্ধি এবং ধর্ষিতা নারীদের বিচার না পাবার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকর দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকেই তদারক করতে হবে। অন্যথায় ধর্ষণ সংস্কৃতির কলংক সরকারের দিনবদলের স্বপ্নকে প্রহসনে পরিণত করবে।