দিনবদলের নামে প্রহসনের এক শ্লোগান
সভ্য সমাজেইতো নির্বাচন হয়। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণকে তাদের রায় প্রদানের সুযোগ দেয়া হয়। আর জনগণের রায় নেয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করতে হয়, জনকল্যাণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে হয়। এ চিত্র গণতান্ত্রিক রাজনীতির খন্ডচিত্র মাত্র। নির্বাচনের পরই প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির। এই পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে ক্ষমতাসীন দল যদি ইশতেহার বাস্তবায়নে সমর্থ হয়, জনকল্যাণে আন্তরিক হয় এবং আইনের শাসনের মাধ্যমে মানবাধিকার সমুন্নত রাখে, কেবল তাহলেই বলা চলে যে, গণতন্ত্রের পথে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এর ব্যতিক্রম হলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এ জন্যই বলা হয়, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হলেই যে সরকার গণতান্ত্রিক হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তো গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারকেই ফ্যাসিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা গেছে। এ কারণে গণতান্ত্রিক সরকারের আচরণকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হয় এবং সরকারের ত্রুটিপূর্ণ আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে হয় বিরোধী রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের। সরকারকে সুপথে রাখার এই গণতান্ত্রিক আয়োজন কিন্তু সব সরকারের পছন্দনীয় নয়। বিশেষ করে কোনো সরকার যদি দেশী-বিদেশী কায়েমী স্বার্থের সাথে সংযুক্ত হয়ে পড়ে কিংবা ক্ষমতার তাপে অহংকারী হয়ে ওঠে তখন দেশে লক্ষ্য করা যায় নানা অশুভ চিত্র। সরকার তখন গণতান্ত্রিক চাপকে অকার্যকর করার জন্য রাজনীতিক, পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের কতককে বিশেষ সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে ক্রয় করে ফেলেন। এদেরকে বরকন্দাজ হিসেবে ব্যবহার করেন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। এতেও সুবিধা করতে না পারলে ক্রমেই বেড়ে যায় সরকারের জুলুম-নির্যাতনের তৎপরতা। তখন দেশের প্রশাসন যন্ত্র দেশের স্বার্থরক্ষার পরিবর্তে সরকারের অপশাসনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এমনকি জনগণের শেষ আশ্রয়স্থল বিচার বিভাগেও শুরু হয় সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপ।
দুঃখের বিষয় হলো, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২ বছরের অপশাসনের পর আমরা তথাকথিত যে গণতান্ত্রিক সরকার পেলাম, তাদের নয় মাসের শাসন আমাদের আশান্বিত করতে পারেনি। এ কারণে বর্তমান সরকারের অংশীদার বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপিও গত ১৯ অক্টোবর নোয়াখালী টাউন হলে দলের জেলা সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, সরকারের দিনবদলের শ্লোগান আমরা বুঝতে পারিনি। এখন দিনবদলের অর্থ হচ্ছে ক্ষমতা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখল ও টেন্ডারবাজির হাতবদল। শুধু রাশেদ খান মেনন নন, একথা আজ দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সরকারের দিনবদলের অঙ্গীকার আসলে দলের নেতাকর্মীদের দিনবদলের অঙ্গীকারে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। ফলে দিনবদলের শ্লোগান এখন প্রহসনের এক শ্লোগান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দিনবদলের চিত্র এখন আদালত অঙ্গনেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উচ্চ আদালতে সরকারের আইন কর্মকর্তাদের অসংযত ও আইন বহির্ভূত আচরণে দেশের উচ্চ আদালতের বিচারিক কাজে বিঘ্ন ঘটছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ার পরও হাইকোর্টের বিচারপতিরা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা এটর্নি জেনারেল, অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এবং ডেপুটি এটর্নি জেনারেলরা প্রায় প্রতিদিনই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে দায়েরকৃত মামলায় এমন সব আচরণ করছেন, যা সংশ্লিষ্টদের দুর্ভাবনায় ফেলেছে। উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তার ওপর সরকারের আইন কর্মকর্তাদের ভূমিকা ন্যায়বিচারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এ প্রসঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তার বড় ছেলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা শুনানিকালের ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। মামলাটির শুনানিকালে একাধিকবার উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন এটর্নি জেনারেল। গত ১৫ অক্টোবর আদালতের রুল জারির আগে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম উত্তপ্ত কণ্ঠে বলেন, ‘চারদিন চড়া গলায় কিছু বলিনি, আপনারা এ মামলায় রুল ইস্যু করতে পারেন না'। এ সময় আদালত বলেন, আপনি এত রাগান্বিত হচ্ছেন কেন? উপস্থিত সিনিয়র আইনজীবীরা বলেন, ক্ষমতার দাপটে আদালতকে শাসন করা হচ্ছে। এদিকে গত ৭ অক্টোবর বিচারপতি তারিক উল হাকিম ও বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত চিকিৎসকের চাকরিচ্যুতির আদেশের ওপর রুল নিশি জারি করতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। আদালত রুল দিতে পারবে না, তার এমন বক্তব্যের পর ওই মামলায় আদালত স্থিতাবস্থা জারি করেন। গত ১৩ অক্টোবর বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ‘২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা' মামলা চলাকালে তাকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করার কারণে আদালত অ্যাটর্নি জেনারেলকে বলেন, ‘ক্ষমতা দেখাতে চাইলে আমাদেরও নির্যাতন করুন। আমরা এখানে কেন বসে থাকবো? হাইকোর্ট উঠিয়ে দিন। মামলার শুনানি চলা অবস্থায় অসুস্থ ব্যক্তির ওপর নির্যাতন অমানবিক ও দুঃখজনক।'
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলের আচরণ ও কর্মতৎপরতায় অবাক দেশের আইন বিশেষজ্ঞরা। বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিক উল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও অঙ্গভঙ্গি আইনের শাসনের পরিপন্থী। তারা উচ্চ আদালতকে ভয়ভীতি দেখিয়ে সবকিছু আদায় করতে চাচ্ছেন। কিন্তু তা হয় না। ইতোমধ্যে তারা তা টের পেয়েছেন।
ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার রক্ষার শেষ ভরসা যে আদালত, সেই আদালতকেই যদি ভয়ভীতি দেখিয়ে সরকার স্তব্ধ করে দিতে চান তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? এসব কি গণতান্ত্রিক সরকারের লক্ষণ? এ পথই কি দিনবদলের পথ? শুধু এই ক্ষেত্রেই যে সরকারের পদস্খলন ঘটেছে তা নয়, আরো নানা ক্ষেত্রে সরকারের আচরণ মানুষকে আশাহত করেছে। দুর্নীতির দায়ে বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্ত ভোলা-৩ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি মেজর (অবঃ) জসিম উদ্দিনের সদস্যপদ রক্ষায় খোদ প্রধানমন্ত্রী এবং নির্বাচন কমিশন (ইসি) সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছেন। ৫ বছর আগের কার্যকারিতা দিয়ে অবসর আদেশ পরিবর্তন করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্বাচন কমিশন ব্যক্তি জসিমের স্বার্থে পরিবর্তন করেছে সংশ্লিষ্ট আইন। তবু হয়নি শেষ রক্ষা। সব অনৈতিক চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশে বাতিল হয়ে যায় জসিমের সদস্যপদ। নিজেদের প্রণীত আইন লঙ্ঘন করায় নির্বাচন কমিশন এখন পড়েছে ভাব মর্যাদার সংকটে, এ সংকট অবশ্য তারা নিজেরাই সৃষ্টি করে আসছেন শুরু থেকেই। এখন কমিশন সেনা দফতরের ওপর দোষ চাপিয়ে মুখ রক্ষা করতে চাইছে।
বিগত মাসগুলোতে সরকারের কর্মকান্ডে মানুষের মন থেকে দিনবদলের আকাঙ্ক্ষা লুপ্ত হয়ে গেছে। বরং ‘দিনবদলের' বদলে মানুষের মনে এখন জেগে উঠেছে সরকার বদলের আকাঙ্ক্ষা। তবে সরকার বদলের আগে দেশের মানুষের দুর্ভোগ হয়তো আরো বাড়বে, মানবাধিকারও লঙ্ঘিত হবে নানাভাবে। এ ক্ষেত্রে আদালতের দিকেই চেয়ে থাকবে জনগণ। আদালত নিজ অবস্থানে যতটা দৃঢ় থাকবে মানুষের কাঙ্ক্ষিত সুবিচার ততটাই নিশ্চিত হবে।