ভারতকে দেয়ার প্রশ্নে কার্পণ্য নেই সরকারের
৯ অক্টোবর সকালে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় হুদা'র কার্টুন দেখছিলাম। এতে দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের দিকে ট্রে এগিয়ে ধরে আছেন। ট্রে থেকে ‘এশিয়ান হাইওয়ে' লেখা থলেটি তুলে নিচ্ছেন মনমোহন সিং। এর নিচে রয়েছে ‘করিডোর' লেখা চাকু। পেছনে বাংলাদেশের মানচিত্র ক্ষতবিক্ষত হয়েছে ‘ফারাক্কা বাঁধ' ও ‘তালপট্টি' লেখা দুটি চাকুর আঘাতে। চাকু দুটি বাংলাদেশের বুকের ওপর বিঁধে রয়েছে। শেখ হাসিনা ‘সমুদ্র সীমা' এবং ‘টিপাইমুখ বাঁধ' লেখা আরো দুটি চাকু মনমোহন সিংকে উপহার দেয়ার জন্য প্রস্তুত রেখেছেন। মুখে বলছেন, ‘একে একে সবই পাবেন দাদা। স্বাধীনতার ঋণ শোধ করার জন্য আমরা তো আছিই...'।
বিষয়টিকে নিছক কার্টুন বলে হেসে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। কারণ, ক্ষমতায় বসতে না বসতেই আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের ইচ্ছা পূরণের জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে। ভারতের স্বার্থে সরকার একের পর এক এমন সব পদক্ষেপ নিচ্ছে যেগুলো এমনকি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্যও বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ। যেমন প্রথমে এসেছিল ট্রানজিটের নামে ভারতকে করিডোর দেয়ার প্রশ্ন। দ্বিতীয় পর্যায়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য সীমান্ত খুলে দেয়ার উদ্দেশ্য থেকে সরকার দক্ষিণ এশীয় টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছিল। পিলখানা হত্যাকান্ডকে এ ব্যাপারে চমৎকার অজুহাত বানানো হয়েছে। এদিকে করিডোরের পাশাপাশি এসেছে ভারতকে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার প্রশ্ন। ফারুক খানসহ মন্ত্রীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দেশকে ভাড়া খাটিয়ে অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে চলেছেন। কেউই লজ্জার ঘোমটা পর্যন্ত রাখার প্রয়োজন বোধ করছেন না। ভারতকে করিডোর ও চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার মতো বিষয়গুলোকে ‘জুজুর ভয়' হিসেবে চিহ্নিত করে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি নাকি ওই ‘জুজুর ভয়' পান না! প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে স্বাগত জানানো যেতো, তিনি যদি এসবের মধ্যে বাংলাদেশের লাভ ঠিক কতোটুকু সে কথা জাতিকে বোঝাতে পারতেন। কারণ, দেখা যাচ্ছে যা কিছু সরকার করছে ও করতে যাচ্ছে সেসবের কোনোটিতেই বাংলাদেশের এক ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিছু কিছু বিষয়ে এমনকি সর্বনাশও ঘটতে পারে।
এর আলামতও স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি গত মাস সেপ্টেম্বরে ভারত সফর করেছেন। তার সফর শেষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে নয়াদিল্লি থেকে প্রকাশিত যুক্ত বিবৃতিতে পরিষ্কার হয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী শুধু ভারতের দাবি ও ইচ্ছাই পূরণ করে এসেছেন, বাংলাদেশের স্বার্থে কিছুই আদায় করতে পারেননি। ভারতকে আশুগঞ্জ বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার সুবিধা একটি বড় উদাহরণ। যুক্ত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ভারতকে এই বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দিতে ‘সম্মত' হয়েছে। অন্যদিকে নেপাল ও ভুটানে যাতায়াতের জন্য বাংলাদেশের যে ট্রানজিট সুবিধা পাওয়া দরকার, সে প্রসঙ্গে যুক্ত বিবৃতিতে রয়েছে ‘কানেক্টিভিটির' উল্লেখ। বলা হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে দু'দেশের মধ্যে পরবর্তী সময়ে ‘আরো আলোচনা' হবে। অর্থাৎ অতীতের মতো এবারো ভারত বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে গেছে। এর অর্থ হলো, কথা যেখানে ছিল ভারত বাংলাদেশকে নেপাল ও ভুটানে যাতায়াতের জন্য ট্রানজিট সুবিধা দেবে, সেখানে ‘কানেক্টিভিটির' জন্যও বাংলাদেশকে ‘আরো আলোচনার' অপেক্ষা করতে হবে। ওদিকে দীপু মনি কিন্তু আশুগঞ্জের বন্দর সুবিধা ভারতকে দিয়ে এসেছেন। দর কষাকষি করার জন্যও ঝুলিয়ে রাখেননি। উল্লেখ্য, বাংলাবান্ধা থেকে নেপালে ও ভুটানে যাতায়াত করার জন্য বাংলাদেশের দরকার যথাক্রমে ৬১ ও ৬৮ কিলোমিটার ভারতীয় সড়ক ব্যবহার করা। কিন্তু নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এটুকু সুযোগও দিচ্ছে না ভারত। ফলে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারছে না।
অন্যদিকে ভারতকে আখাউড়া বন্দর শুধু নয়, রেল চলাচলের সুবিধা দিতেও ‘সম্মত' হয়ে এসেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এই সুযোগ দেয়া হলে ভারত আখাউড়া থেকে ত্রিপুরার আগরতলা পর্যন্ত সরাসরি রেল চলাচলের সুবিধা পাবে। শুরু হবে কলকাতা থেকে আগরতলা পর্যন্ত সরাসরি রেল চলাচলও। এর ফলে কলকাতা ও আগরতলার দূরত্ব ১৫০০ কিলোমিটারের স্থলে কমে হবে মাত্র ৩৫০ কিলোমিটার। সেই সাথে আশুগঞ্জের বন্দর সুবিধা দেয়া হলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে নৌপথে আশুগঞ্জ পর্যন্ত পণ্য এনে ভারত আখাউড়া-আগরতলা রেললাইনের মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পাঠাতে এবং ওই সব রাজ্য থেকে মূল ভূখন্ডে পণ্য নিয়ে যেতে পারবে। উল্লেখ্য, উভয় সরকারের পক্ষ থেকে সমগ্র বিষয়টিকে কেবলই ‘অর্থনৈতিক ইস্যু' হিসেবে সামনে আনা হয়েছে- যেন এর সঙ্গে রাজনৈতিক এবং সামরিক ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কোনো কিছু জড়িত নেই! অন্যদিকে বাস্তবতা হলো, ভারতকে বাংলাদেশের মধ্যদিয়ে জাহাজ, ট্রেন ও যানবাহন চলাচল করার সুবিধা দেয়া হলে দেশের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। কারণ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘সেভেন সিস্টারস' নামে পরিচিত রাজ্যগুলোতে বহু বছর ধরে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম চলছে। বন্দর ব্যবহার ও রেল চলাচলের সুযোগে ভারত বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে তার সেনাবাহিনী এবং অস্ত্রশস্ত্র আনা-নেয়া করবে। এর ফলে বাংলাদেশ অযথাই উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর স্বাধীনতা সংগ্রামীদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হবে। তেমন অবস্থায় বাংলাদেশকে ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যায় তথা সশস্ত্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে। এক পর্যায়ে ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়বে। ফলে বিপন্ন হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। একই কথা চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রেও সমান সত্য। বন্দর ব্যবহার করতে দেয়া হলে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ টার্গেটে পরিণত হতে পারে। কারণ ভারত চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর দিয়ে পণ্যের সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্রও আনা-নেয়া করবে। এর ফলে ভারতের প্রতিদ্বনদ্বী রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা চালাবে। বাংলাদেশ কখনো আক্রান্ত হলেও ভারতই ফায়দা হাসিল করবে। দেশটির পাশে দাঁড়ানোর যুক্তি দেখিয়ে তার সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেবে। পরিণতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে।
এখানেই আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি ও ভূমিকা বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। সরকার একই সঙ্গে এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত করার নামেও বাংলাদেশকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এ ব্যাপারে জানান দিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় সংসদে তিনি বলেছেন, এশিয়ান হাইওয়ে একটি আন্তর্জাতিক রুট। এই রুটে যুক্ত না হলে আমরা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বো। প্রধানমন্ত্রী বিশেষ জোর দিয়ে বলেছেন, এশিয়ান হাইওয়ে হলে ভারত সবকিছু নিয়ে যাবে- এই ‘জুজুর ভয়' দেখিয়ে দরজা বন্ধ করে রাখবো, অমন নীতিতে আমরা বিশ্বাসী নই। প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মতো অন্য একটি তথ্যও প্রকাশ করেছেন। জানিয়েছেন, মন্ত্রিসভার ১৬ জুনের বৈঠকে এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং এসকাপ হাইওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত করতে সম্মতি জানিয়েছে। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী রুটের ব্যাপারে বিস্তারিত জানানো থেকে সুকৌশলে বিরত থেকেছেন। শুধু বলেছেন, ভারত ও মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হবে। যুক্তরাষ্ট্র সফরকালেও একাধিক উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী সরকারের অবস্থান সম্পর্কে একই বক্তব্য রেখেছেন।
এশিয়ান হাইওয়ের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সঙ্গত কিছু কারণে সচেতন মানুষের মনোযোগ কেড়েছে। একটি কারণ হলো, বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম থেকে রাখঢাক করে এসেছে। মন্ত্রীরা অর্থনৈতিক প্রলোভন দেখালেও কখনো স্বীকার করেননি যে, মন্ত্রিসভা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। অন্যদিকে এতদিন পর সে কথাটা জানাতে গিয়েও প্রধানমন্ত্রী অযথাই ‘জুজুর ভয়' প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। অথচ দেশের কোনো দল বা গোষ্ঠিই কখনো এশিয়ান হাইওয়েতে বাংলাদেশকে যুক্ত করার বিরোধিতা করেনি। সকলেই বরং এতে যুক্ত হতে চায়, কিন্তু তার মাধ্যমে বাংলাদেশকে লাভবান করার সুযোগ থাকতে হবে। উল্লেখ্য, এসকাপের মূল পরিকল্পনায় ছিল বাংলাদেশের টেকনাফ এবং মিয়ানমারের মংড় ও আকিয়াব হয়ে ইয়াঙ্গুন পর্যন্ত মহাসড়ক। এ পথে বাংলাদেশের জন্য ইয়াঙ্গুন পর্যন্ত দূরত্ব হবে ৪৫০ কিলোমিটার। এর মধ্যে বেশিরভাগ সড়কই তৈরি অবস্থায় আছে। নির্মাণ বা মেরামত করতে হবে ৩০-৪০ কিলোমিটারের মতো। এটা তৈরি করা হলে আমরা সহজেই ইয়াঙ্গুন যাওয়ার এবং মিয়ানমার হয়ে চীন ও জাপান পর্যন্ত এশিয়ার যে কোনো দেশে যাতায়াত করার সুযোগ পাবো। কিন্তু ভারতের প্ররোচনায় এসকাপ বর্তমানে যে দুটি রুটের পরিকল্পনা করেছে, তার কোনোটিই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল নয়। কারণ, এএইচ-১ নামের রুটটি যশোরের বেনাপোল সীমান্ত থেকে ঢাকা ও সিলেট হয়ে তামাবিল সীমান্ত পর্যন্ত যাবে। এএইচ-২ নামের দ্বিতীয় রুটটিও পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা সীমান্ত থেকে ঢাকা ও সিলেট হয়ে একই তামাবিল সীমান্তে গিয়ে শেষ হবে। দুটি মহাসড়কই ভারতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ থেকে মেঘালয় ও আসামে ঢুকবে। এর মাধ্যমে ভারত সরাসরি করিডোর পেয়ে যাবে। এটা হয়ে উঠবে ইন্ডিয়ান হাইওয়ে। অন্যদিকে এই মহাসড়কে বাংলাদেশের কোনো লাভই হবে না। কারণ বাংলাদেশের দরকার একদিকে মিয়ানমার হয়ে চীন ও জাপান পর্যন্ত এবং অন্যদিকে ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান ও তুরস্ক হয়ে বুলগেরিয়া পর্যন্ত এবং তারপর ইউরোপের দেশগুলোতে যাতায়াত করার সুবিধা। কিন্তু বর্তমান হাইওয়ে দিয়ে মিয়ানমার পর্যন্ত যাওয়াই বাংলাদেশের জন্য কঠিন, এমনকি অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ, টেকনাফ হয়ে ইয়াঙ্গুন পর্যন্ত দূরত্ব যেখানে মাত্র ৪৫০ কিলোমিটারের মতো, সেখানে ইয়াঙ্গুন যাওয়ার জন্য বাংলাদেশকে আসাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড ও মিজোরামসহ ভারতের সাতটি রাজ্য পাড়ি দিতে হবে। ফলে দূরত্ব দাঁড়াবে ২০০০ কিলোমিটার। তাছাড়া প্রতিটি সড়কই যাবে ১০ থেকে ১৭ হাজার ফুট উঁচু দুর্গম ও বিপদসংকুল পাহাড়ের ওপর দিয়ে। প্রতি মুহূর্তে থাকবে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর ঝুঁকি। ওদিকে ‘সেভেন সিস্টারস' নামে পরিচিত রাজ্যগুলোতে চলছে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ। সুতরাং সকল দিক থেকেই বাংলাদেশকে মারাত্মক ঝুঁকি ও বিপদ মাথায় নিয়ে চলাচল করতে হবে। শুধু তাই নয়, দুর্গম পাহাড় কেটে প্রায় ১০৫০ কিলোমিটার সড়ক তৈরির ব্যয়ভারও বাংলাদেশকে বহন করতে হবে।
এসব কারণে টেকনাফ-ইয়াঙ্গুন মহাসড়কটিই একমাত্র গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু ভারতের স্বার্থে এসকাপ বাংলাদেশকে ঝুঁকি ও বিপদের মুখে ঠেলে দিতে চাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারও এর পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। অথচ তথ্যনির্ভর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রস্তাবিত হাইওয়েতে যুক্ত হলে বাংলাদেশের জন্য মোটেও লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এশিয়ান হাইওয়ের নামে ভারতকে আসলে করিডোর দেয়ার কৌশল নেয়া হয়েছে। এ ধরনের সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করেই দেশপ্রেমিকরা বর্তমান আয়োজনে এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হওয়ার বিরোধিতা করেছেন। তারা মনে করেন, এসকাপ যদি টেকনাফ-ইয়াঙ্গুন মহাসড়ককে প্রধান রুট করতে রাজি হয় তাহলেই শুধু বাংলাদেশকে যুক্ত করা যেতে পারে। এই মহাসড়কে চীনকে যুক্ত করা গেলে বাংলাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে ভারতের দার্জিলিং ও শিলিগুড়ি এবং ভুটান সীমান্ত সংলগ্ন তিববতের চুম্বি ভ্যালি হয়ে বাংলাদেশ সহজেই চীনের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে। যেতে পারবে জাপান পর্যন্ত। এই পথে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গেও বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হবে। অন্যদিকে বর্তমান প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে বাংলাদেশ শুধু ভারতের করিডোরেই পরিণত হবে না, একই সঙ্গে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তাও বিপন্ন হয়ে পড়বে। কারণ, পণ্যের নিরাপত্তা বিধানের অজুহাত দেখিয়ে এবং এসকাপের সহযোগিতায় ভারত বাংলাদেশে তার সেনাবাহিনীকে আনার চেষ্টা করবে। ষড়যন্ত্রের পথে এক সময় ভারতের সেনাবাহিনী এসেও পড়বে। তাছাড়া বাংলাদেশকে অযথাই ভারতের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে। প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়কেই ‘জুজুর ভয়' হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যঙ্গ করেছেন এবং দেশপ্রেমিকদের বিরোধিতাকে নাকচ করতে চেয়েছেন। ভারতের জন্য বাংলাদেশের দরজা খুলে দেয়ার ঘোষণাও তিনি জোরেশোরেই দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে তার পিতার উদাহরণ দিয়েছেন, যার ‘অনুরোধে' স্বাধীনতার পর ভারত বাংলাদেশ থেকে সেনাবাহিনী ফিরিয়ে নিয়েছিল। ইঙ্গিতে কোনো অস্পষ্টতা রাখেননি প্রধানমন্ত্রী। তিনি মনে করেন, পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অনুরোধে' কাজ হয়ে থাকলে তার ‘অনুরোধে' হবে না কেন? এখানেই ভুল করেছেন শেখ হাসিনা। কারণ, মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান বিরাট মাপের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নেতা ছিলেন। তার সঙ্গে অন্য কারো তুলনা চলে না। ওদিকে প্রধানমন্ত্রী কথায় কথায় যে ‘আন্তর্জাতিক বিশ্বের' কথা বলেন, সেখানে ‘ডিজিটাল' নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। অর্থাৎ ১৯৭২ সালে যেসব কারণে ভারত প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অনুরোধে' সাড়া দিয়েছিল সেসবের কিছুই উপস্থিত নেই বর্তমানে। তাছাড়া আওয়ামী লীগ কিভাবে ক্ষমতায় এসেছে সে সম্পর্কে সবকিছু ভারতই ভালো জানে। ফলে শেখ মুজিবের গুরুত্ব দিয়ে শেখ হাসিনার আহবানে সাড়া দেয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে না। একই কারণে একবার কোনোভাবে ঢুকে পড়তে পারলে ভারতের সেনাবাহিনীকে ভারতে ফেরৎ পাঠানো শেখ হাসিনার পক্ষে সম্ভব হবে না। আওয়ামী লীগ সরকার ‘বন্ধুরাষ্ট্রের' সেনাবাহিনীকে আদৌ ফেরৎ পাঠাতে চাইবেন কিনা, সেটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বটে।
এ ধরনের কোনো বিপদের আশংকাকেই বিবেচনায় নেয়ার সময় নেই আওয়ামী লীগ সরকারের। যেন সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে- এমনভাবেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছেন ক্ষমতাসীনরা। ভারতকে দেয়ার ব্যাপারে সর্বশেষ কিছু ‘কম্ম' সেরে এসেছেন দীপু মনি। কোনো রকম রাখঢাক না করে তিনি জানিয়েছেন, সরকার একটি ‘প্যাকেজের' আওতায় ভারতের সঙ্গে সকল সমস্যার সমাধান করতে চাচ্ছে। প্রস্তাবও নাকি তিনি সেভাবেই দিয়ে এসেছেন। অন্যদিকে প্রকাশিত সকল খবরে কিন্তু জানা গেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী শুধু দিয়েই এসেছেন, বাংলাদেশের স্বার্থে আদায়ের ব্যাপারে পারঙ্গমতা দেখাতে পারেননি। বিদ্যুতের কথাই ধরা যাক। কথাটা দীপু মনি এমনভাবে জানিয়েছেন যেন বিদ্যুৎ দিয়ে ভারত বাংলাদেশকে বিরাট কোনো সাহায্য করতে যাচ্ছে! অন্যদিকে সত্য হলো, ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশকে নগদ অর্থে বিদ্যুৎ কিনতে হবে। অর্থাৎ বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে ভারতের ওপর নির্ভরশীল করার পদক্ষেপ নিয়েছে। কারণ, শর্ত হলো, বিদ্যুৎ পেতে হলে ভারতকে বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যবহার করার সুযোগ দিতে হবে। অর্থাৎ মাত্র ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ- তাও নগদ মূল্যে বিক্রি করার বিনিময়ে ভারত বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করবে। শুধু তাই নয়, ভারত বাংলাদেশের এই গ্রিড দিয়ে তার এক অঞ্চলের বিদ্যুৎ অন্য অঞ্চলে নিয়ে যাবে। এজন্য দেশটিকে একটি টাকাও ব্যয় করতে হবে না। অথচ নিজের হলে ভারতকে এরকম একটি গ্রিডের জন্য শত কোটি টাকার অংকে খরচ করতে হতো। উল্লেখ্য, গ্রিডের কোথাও নষ্ট বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায় থাকবে বাংলাদেশের ওপর। গ্রিডের রক্ষণাবেক্ষণও বাংলাদেশকেই করতে হবে। এখানে উল্লেখ করা দরকার, আসাম ও মেঘালয় রাজ্যে কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত রয়েছে। কিন্তু এতদিন ভারত সেটা নিয়ে যেতে পারছিল না। ফলে ভারতকেও বিদ্যুৎ ঘাটতিতে থাকতে হচ্ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের বদৌলতে ভারত এবার তার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে। এতটাই ‘দেশপ্রেমিক' আওয়ামী লীগ সরকার!
এভাবে পর্যালোচনায় দেখা যাবে, আওয়ামী লীগ সরকার ভারতকে শুধু দিয়েই চলেছে। সরকার এশিয়ান হাইওয়ের নামে ইন্ডিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ভারতকে করিডোর দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশটিকে আশুগঞ্জ বন্দর ও চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করার এবং বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতীয় যানবাহন, পণ্যসামগ্রী ও অস্ত্রশস্ত্র পরিবহনের এবং গোপনে হলেও সেনাবাহিনী আনা-নেয়া করার সুযোগ দিতে যাচ্ছে। মাত্র ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের বিনিময়ে সরকার বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডও তুলে দিচ্ছে ভারতের হাতে। ওদিকে চলছে পুনর্গঠনের নামে বিডিআরকে ভারতের সেবাদাস বাহিনীতে পরিণত করার কর্মকান্ড। ইতোমধ্যে বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ রাখা হয়েছে। বিডিআরের পোশাক ও লোগো পাল্টে ফেলা হয়েছে। তারও আগে পিলখানা হত্যাকান্ডের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর কোমর ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। অর্থাৎ সব মিলিয়েই আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে ভারতের ইচ্ছাধীন রাষ্ট্র বানানোর আয়োজন সম্পন্ন করতে যাচ্ছে।
ভারতকে দেয়ার প্রশ্নে কার্পণ্য নেই সরকারের
Save Bangladesh: No more farakka
ভারতকে দেয়ার প্রশ্নে কার্পণ্য নেই সরকারের
Save Bangladesh: No more farakka