আওয়ামী ইতিহাস বিকৃতির বিপক্ষে, ইতিহাস তুমি শাক্ষি দাও

-ইতিহাস নিয়ে যত চর্চা হবে ততই জিয়াউর রহমান সম্পর্কে নানা অজানা তথ্য বের হয়ে আসবে।
-লেখার শুরুটা করছি জাতীয় নেতা মরহুম মশিউর রহমান যাদু মিয়ার একটা লেখাকে উদ্দ্বৃতি করে ?
...এখানে কিছু পূর্ব কথা বলে রাখা প্রয়োজন।১৯৬৯ এর মাঝামাঝির দিকে ইন্টিলিজেন্সের এক অফিসার মেজর কমল (বর্তমানে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান) দেখা করে ছিলেন মৌলানার সাথে।তখন ইন্টেলিজেন্সের চীফ ছিলেন জেনারেল আকবর।মেজর কমল মওলানার সাথে স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।পূর্বাপর বিবচনা করে মওলানা ভীষণ ভাবে চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং এ সময়ে আমার সাথে তার অনেক আলাপ হয়েছে.. যাদু মিয়ার এই লেখা থেকে স্পস্ট যে জিয়াউর রহমান হঠাৎ ঘোষিত কোন নাম নয়।অনেকে জিয়াকে অবমূল্যায়ন করতে গিয়ে সে কোন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না এমন বাণী কানে এসে ধাক্কা খায়।মজার ঘটনা হলো ইতিহাস তার স্বয়ম্ভুতা নিয়ে সামনের দিকে অগ্রসরিত হয়।স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষনা নিয়ে আওয়ামী লীগ যে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে বা ইতিহাস বিকৃতি করে যে সমস্ত তথ্য উপস্থাপন করছে তাতে তাদেরই ক্ষতি বেশি হবে বলে মনে হয়।কারন থলির বেড়াল বেড়িয়ে আসার একটি সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।স্বাধীনতা যুদ্ধকে মুক্তিযুদ্ধ বলা।স্বাধীনতার আন্দোলনের চেতনাতে ধারন না করে মুক্তিযুদ্ধ শব্দ ব্যবহার আমাদের সংবিধানতো বটেই জনসাধারনকে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি বলে দাবীদারেরা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।তারা যদি মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি হয় তাহলে অন্যরা স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি হিসাবে দাবী জানাতে পারে।যাইহোক বিষয়টি ভিন্ন দিকের হলেও স্বাধীনতার দর্শনের সাথে সামঞ্জ্যস্যপূর্ণ নয় বলে অনেকে মনে করতে পারেন।
শহীদ জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক প্রকাশে হয়তোবা ছিলেন না।কিন্তু নেপথ্যের কারিগর হিসাবে তিনি থেকেছেন।তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এতটাই প্রখর ছিলো যে একজন সেনা সদস্য হওয়া সত্বেও কিভাবে রাজনৈতিক মেধা খাটিয়ে দেশ পরিচালনা করেছেন তা সবায় দেখেছে।স্বাধীনতার ঘোষনাকে অনেকে ঘোষোনাপত্র পাঠ হিসাবে চালিয়ে দেবার চেষ্ঠা করে থাকে।এই হলো আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা যুদ্ধের ভূমিকাকে খাটো করে দেখে সব স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তিকে পদদলিত করছি।শুধুমাত্র সুবিধাবাদের জন্য অনেক শিল্পী,সাহিত্যিক,রাজনীতিক কিংবা সুশীল সমাজ অনেক কিছুকে আড়াল করে নিজেদের মত করে ইতিহাস রচনায় মত্ত আছেন এমন কি ইতিহাস রক্ষার বদলে অনেকে দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত হয়েছেন ইতিহাস মুছে ফেলার প্রতিযোগিতায়।অনেকের স্বাধীনতার আগের ভূমিকা এবং স্বাধীনতার পরের ভূমিকা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে।হয়তো এমন কথা বার্তা উঠতো না যদি না ফাকা মাঠে আওয়ামী লীগ ইতিহাসের গোলপোষ্টে বল না পাঠাতো।
কায়দে আজম জিন্নাকে নিয়ে কবিতা লিখে সুফিয়া কামাল,মাযহারুল ইসলাম কিংবা পাকিস্তানি শাসনের সমর্থনে বর্তমানের জাতীয় অধ্যাপক কবির চৌধুরীসহ অনেকে নানা সুবিধা এবং পূরস্কার প্রাপ্ত হয়েছেন পাকিস্তান আমলে।তাদের উত্তসূরি বুদ্ধিজীবিরা স্বাধীনতার যুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদান কারি একজন নেতাকে নিয়ে যখন জনগনকে ইতিহাসের প্যারাসিটামল খাওয়ায় তখন বিষয়টা নিয়ে আতঙ্কিত হতে হয়।এটা সাধারন মানুষ বুঝতে পারে যে রাজনৈতিক সুবিধাবাদের জন্য এই সমস্ত কিছু করতে বা বলতে তাদের সমস্য হয়না।এখন তাদের চরিত্র সম্পর্কে তথ্য উপস্থাপন করলে নানা পদ্ধতিতে তাদের পক্ষে দেশি বিদেশি সমর্থন জোগাড় হয়ে যায়।এমন কি মিডিয়াগূলো প্রচারে গড়িমসি করে।যেটা অবশ্যই অণৈতিক একটি ব্যপার।এখনকার প্রজন্মকে নানা ভাবে ইতিহাসের উল্টোপাঠ দিয়ে আওয়ামী লীগের প্রতি এক ধরনের রাজণৈতিক সুবিধা নিয়ে রাখা হচ্ছে।যে সমস্ত বুদ্ধিজীবিদের দুধে ধোঁয়া তুলসি পাতা আজকের প্রজন্ম মনে করছে তাদের সম্পর্কেও সবার জানা উচিত।তারা মনে করছে যে এই প্রজন্ম কে চটকদার গান,নাটক কিংবা বিপ্লবী গান শুনিয়ে নিজেদের আয়ত্বে রাখতে পারবে।এই ধরনের প্রতারণা মূলক আচরণ দেশের মানূষের মানবিক মূল্যবোধ কে নষ্ট করে দিচ্ছে।অনেক ইতিহাসবিদ এবং লেখক মনে করেন যে শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি।তিনি অখন্ড পাকিস্তানের মানুষ।এমন কি তিনি মার্চে পশ্চিম পাকিস্তানি পক্ষের সাথে আলোচনাতেও এক পর্যায়ে বলেছিলেন আমি মুসলিম লীগার।তার এই কথার ভিতরে পাকিস্তানের পক্ষে এক ধরনের মানসিক সমর্থন লুকিয়ে ছিলো।যদি ভূট্টো মুজিবের সব দাবী মেনে নিতো তাহলে পাকিস্তান ভাংতো কিনা এই নিয়ে সবাই সন্দেহ করে।২৫ মার্চের গনহত্যার পর আওয়ামী লীগের ২৭ মার্চ দেশব্যাপী সাধারন ধর্মঘট সবার মধ্যে হতাশ,বিভ্রান্ত এবং সন্দেহ তৈরী করে।
গত বছর মার্চে প্রথম আলোতে প্রকাশিত মুহাম্মদ লূতফুল হকের একটা লেখাতে উল্ল্যেখ করেছেন-বিকেল ৫টার দিকে তীর-বল্লম-ডামি রাইফেলসহ রায়েরবাজার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একটি সশস্ত্র মিছিল ৩২ নম্বরে এলে শেখ মুজিব দোতলা থেকে ওদের সালাম গ্রহণ করেন। অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান ও বিখ্যাত পাকিস্তানি সাংবাদিক মাজহার আলী শেখ মুজিবের সঙ্গে একান্তে কথা বলেন। শেখ মুজিব তাঁদের সম্ভাব্য সামরিক আক্রমণের শঙ্কা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন সে রকম কিছু হলে এর ফল ভালো হবে না। তাতে বহু লোক মারা পড়বে এবং তাদের কবরের ওপর স্বাধীন বাংলাদেশ জন্ম নেবে। বিকেলের মধ্যেই শেখ মুজিব সবাইকে তাঁর বাড়ি থেকে বিদায় দিতে থাকেন।পাঁচটার পর থেকে তাঁর বাড়িতে থমথমে ভাব নেমে আসতে থাকে।এই থেকে বুঝতে পারা যায় যে শেখ মুজিব তার রাজণৈতিক ফায়দা লোটার জন্য বাংলার মানুষের জীব্নকে কিভাবে ব্যবহার করেছেন।যে নেতা দেশের মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে আগে আনলেন না বরং জনগনের রক্তকে তার ফায়দা লোটার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে তিনি বাংলার মানুষদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলেন।
প্রোব ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ভুট্টো ব্রোক পাকিস্তান নট মুজিবশিরোনামে বইটির রিভিউর সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন রবিউল ইসলাম (তার লেখা থেকে কিছু অংশ আমি এখানে দিচ্ছি):
শেখ মুজিব নয় জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তান ভেঙেছেন। ভুট্টো একগুয়ে অবস্থানের কারণেই ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ঐক্য বিনষ্ট হয়েছে শেখ মুজিবের ৬ দফার কারণে নয়। ভুট্টোর অনড় অবস্থান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে বিদ্রোহী করে তুলেছে। তিনি বাঙালিদের ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন যা পাকিস্তানকে বিভক্তির পথে নিয়ে যায়। পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান লাহোর হাইকোর্টে দেয়া ৫৭ পৃষ্ঠার গোপন এফিডেভিটে এমন বিবৃতিই দিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর ২৭ বছর পর ২০০৫ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তান সরকার এ গোপন নথি প্রকাশ করে। ওই এফিডেভিটে ১৯৭১ সালের আগে পরে তার শাসনামলের বেশকিছু স্পর্শকাতর ঘটনার বর্ণনা করেছেন ইয়াহিয়া খান। ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার ভূমিকাr ত্রুটি বিচ্যুতি ও ব্যর্থতার কথা তুলে ধরেছেন।লিখেছেন কীভাবে তাকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।পর্দার আড়ালে থেকে বিশ্বাসঘাতকরা কাজ করেছেন।কেন এবং কীভাবে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হামলে পড়েছে।বাংলাদেশে গণহত্যার পেছনে পাকিস্তানি জেনারেলরা কতটা দায়ী।এসবই তিনি তার গোপন নথিতে উল্লেখ করেছিলেন।এছাড়াও তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণকে সামিরক পরাজয় হিসেবে গ্রহণ করতে নারাজ ছিলেন। তিনি একে ভারতের ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেন। শেখ মুজিবকে দেশপ্রেমিক পাকিস্তানী হিসেবে উল্লেখ করলেও আওয়ামী লীগের একটি অংশকে কট্টর বামপন্থি হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইয়াহিয়া খান।
শেখ মুজিব আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানের লিখিত বিবৃতি বলেছিলেন-
"আমি কখনো পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান হইতে বিচ্ছিন্ন করার জন্যে কোন কিছু করি নাই কিংবা কোন দিনও এই উদ্দেশ্যে কোন স্থল নৌ বা বিমান বাহিনীর কোন কর্মচারীর সংস্পর্শে কোন ষড়যন্ত্রমূলক কার্যে আত্মনিয়োগ করি নাই.."সূত্র:বিচিন্তা ২৫ শে অক্টোবর ১৯৮৭
লন্ডন থেকে কলাম লেখক সৌরভ কামালের একটা লেখা থেকে কিছু অংশ আমি এখানে তুলে দিচ্ছি-
...সবচে বিস্ময়কর হচ্ছে জাতিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য উত্তেজিত করে ২৫ শে মার্চ মহাযুদ্ধের সিপাহসালার শত্রুর হাতে ধরা দিলেন. পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবতঃ এধরণের ঘটনা এটাই প্রথম। জাতিকে হত্যাযজ্ঞের মধ্যে ফেলে মুজিব শত্রুর নিরাপদ কারাগারে চলে গেলেন।আত্মসমর্ণের পক্ষে যুক্তি দেখানো হয় যে মুজিব ধরা না দিলে পাকিস্তানি সেনারা বাংগালী মেরে শেষ করে ফেলতো।শেখ মুজিবের আত্মসমর্পণের পর পাক(নাপাক) বাহিনী কী ৩০ লক্ষ বাংগালি হত্যা করেনি ? ২ লক্ষ বাংগালী নারীকে লাঞ্ছিত করেনি ? অজস্র মানুষকে পংঙ্গু করেনি ?দেশে ব্যাপক ধ্বংস যজ্ঞ চালায় নি?
২৫ শে মার্চের কাল রাত্রির আর্মি ক্র্যাক ডাউন-এর পর জাতি যখন কান্ডারিবিহীন তখন ২৬ মার্চ সকালে চট্টগ্রামের কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের কন্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে জাতি কিছুটা আশার আলো দেখতে পেলো। জিয়াকে এ গৌরবময় ঘটনা হতে বঞ্চিত করার জন্য বলা হয় মুজিব নাকি গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব মূহুর্তে ওয়্যারলেসে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। যে ঘোষণা জাতির শোনার সুযোগ হলো না সে ঘোষণার কী মূল্য আছে। আর চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থাকতে ওয়্যারলেসে ঘোষণা দিতে গেলেন কোন যুক্তিতে এবং কেনো ২৫শে মার্চের কাল রাত্রিতে? তিনি কী জানতেন ঠিক কয়টা সময় নাপাক আর্মি তাকে ধরতে আসবে এবং তাঁকে জীবিত-ই ধরবে? সেই নিশ্চয়তা তিনি কোথায় পেয়েছিলেন? বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা নিয়ে যে বিতর্ক এখনও চলছে এর জন্য শেখ মুজিব-ই দায়ী।
২৪ মার্চে যা ঘটে ছিলো তার একটা সংক্ষিপ্ত তথ্য এখানে দিচ্ছি-
সংবাদ সম্মেলনে শেখ মুজিব বলেন ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে আমরা মতৈক্যে পৌঁছেছি আমি আশা করি প্রেসিডেন্ট এখন তা ঘোষণা করবেন। এর আগে শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া কয়েকটি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান। এগুলো ছিল সামরিক আইন প্রত্যাহার প্রেসিডেন্টের ঘোষণা অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর ইয়াহিয়া খান অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি থাকবেন এবং কেন্দ্রীয় সরকার তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সাংসদদের জন্য পৃথক অধিবেশন বসবে এবং শাসনতান্ত্রিক আলোচনার জন্য পরবর্তীকালে একসঙ্গে বসে জাতীয় সংসদে সংবিধানের খসড়া তৈরি করা হবে। এই শেষ প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন ভুট্টো নিজে এবং ইয়াহিয়া এতে সম্মত হয়েছিলেন।অন্যদিকে বৈঠক থেকে ফিরে তাজউদ্দীন বলেন আওয়ামী লীগ আলোচনা আর দীর্ঘায়িত করতে প্রস্তুত নয়।এই খানে আবার দুই নেতার ভিতরে মত দ্বৈততা দেখতে পাই।এর অর্থ হচ্ছে শেখ মুজিব এই দেশে কি হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন।
দি ইকোনমিস্ট এর ১৩ মার্চ ১৯৭১ সংখ্যায় লেখা হয় -"এই সপ্তাহের শুরুতে ঢাকার পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবার সঙ্গে সঙ্গে এখানে অবস্থিত প্রবাসী নাগরিকেরা তাদের ব্যাগ গোছানো শুরু করে দিয়েছে। ব্রিটিশ সরকারসহ অন্য অনেক দেশ তার দেশের নাগরিকদের অতি প্রয়োজন ছাড়া পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছে।অনেকে মনে করছেন সামরিক শাসন পুনঃপ্রয়োগের ফলে সৃষ্ট দাঙ্গা বোধহয় শেষ হলো। কিন্তু বিদেশীরা মনে করছেন এই শান্ত অবস্থা হয়তো পরিস্থিতি আরও খারাপ হবারই পূর্বলক্ষণ।এটা সত্যি যে গত রোববারে (৭ মার্চ) শেখ মুজিবের পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার যে ঐতিহাসিক ঘোষণা দেবার কথা ছিল তা তিনি দেন নি।"
৭ মার্চ ১৯৭১ ঢাকার রোসকোর্সে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক জনসভায় যে দশ লাখের মতো মানুষ সমবেত হয়েছিল তারা শুনতে চেয়েছিল স্বাধীনতার ঘোষণা। শুনতে চেয়েছিল শেখ মুজিবের থেকে যে আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। জনগণ কিন্তু শেখ মুজিবের মুখ থেকে তেমন ঘোষণা শোনেনি। বক্তৃতার শেষে তিনি জয় বাংলা বলে জয় পাকিস্তান ও বলেছিলেন।
৭ মার্চের ভাষণে যেমন স্বাধীনতার ঘোষণা নাই তেমননি স্বাধীন বাংলাদেশের কথাও নাই।বরং বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা গেছে ১৯৭১ সালের ১ মার্চের যে এক-দফাভিত্তিক আন্দোলনের সূচনা হয় তার রাশ টেনে ধরার প্রতিই ছিল শেখ মুজিবের বেশি ঝোঁক।অসহোযোগ আন্দোলনকে তিনি ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রির পদ লাভের কৌশল হিসেবে।২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত করার পর তিনি উত্তেজিত হয়ে তাঁর এক শুভানুধ্যায়িকে বলেছিলেন, ওরা আমাকে ডুবিয়ে ছাড়বে।
একটি প্রবন্ধের সূত্র ধরে এখানে কিছু অংশ আমি তুলে ধরলাম:
২৩ মার্চ যখন পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে তাঁর বাসভবনে পাকিস্তানের পতাকার বদলে বাংলাদেশের পতাকা কিছু ছাত্রনেতা তুলে দিয়ে আসেন, তখন তিনি তাদের বলেছিলেন, 'তোরা ভেবেছিস কি?' অসহোযোগ আন্দোলনকে শেখ মুজিব ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পদ লাভের কৌশল হিসেবে।
মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে ফ্রান্সের নামকরা পত্রিকা লামন্ড এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিব নিজেই বলেছিলেন, "পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকবর্গ কি বোঝেন না যে, আমি হচ্ছি তাদের শেষ ভরসা? আমি না হলে এখানে কমুনিষ্টরা ক্ষমতা দখল করে নেবে? তারা কেন আমার সাথে আপোস রফা করছেন না?" এই বক্তব্যের মধ্যেই নিহিত আছে শেখ মুজবের রাজনৈতিক কৌশল। শেখ মুজিবের পাকিস্তানি সৈনিকদের নিকট আত্মসমর্পন একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার।বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে সকল জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছে তাদের কোনো একটিতেও দেখা যায় না যে, জাতীয় নেতা তাঁর প্রতিপক্ষের নিকট আত্মসমর্পণ করেছেন।
শুধু তাই নয়, শেখ মুজিবের আত্মসমর্পণের পরে পাকিস্তান সরকার তাঁর পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করে। যুদ্ধ চলাকালিন লাখো শহীদের রক্তের পবিত্র ধারা যখন প্রবাহিত হয়েছে তখন শেখ মুজিব যেমন নিরাপদ ও সুস্থ ছিলেন তার পরিবারের সকলেই নিরাপদ ও সুস্থ ছিলেন।এটা অবশ্যই আল্লাহর রহমত।ইতিহাসে দেখা যায়, লেনিনের ভাইকে লেনিনের অপরাধে ফাসিতে লটকানো হয়েছিল। মাও জে তুং এর স্ত্রীকে তার প্রতিপক্ষরা হত্যা করে।পাকিস্তানের জেল থেকে বেড়িযে, লন্ডনের হিথরো এয়ারপোর্টে শেখ মুজিবের প্রথম প্রশ্ন ছিলো, "সত্যই তোরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিস?"
সে যাইহোক জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের জনগনের আবেগকে শেখ মুজিবের মত কোন কৌশলগত অবস্থানে যাননি বরং তিনি সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছিলেন।তিনি কারো উপর নির্ভর করে কিংবা কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ঘোষনাটি দেন নি।নিজের কাছে বাংলাদেশের মানুষের দ্বায়ভার নিয়ে তারপর ঘোষনা দিয়েছেন।প্রথম ঘোষনাটিতে নিজেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে ঘোষনাটি দিয়েছিলেন।মজার ঘটনা হলো এই ঘোষনাটি জাতীয় সম্পদ হলেও মুজিব ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে সেটাকে ধ্বংশ করে দেয়।মুজিব জানতেন এই ধরনের দলিল থাকলে তাকে সামনের দিকে রাজনৈতিক ভাবে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে না।তার জিয়াউর রহমান,তাজউদ্দিনের উপর হিংসা আগের থেকেই ছিলো।এই দুইজনের অতীত তিনি শুনতে চাইতেন না ।এমন কি তাজউদ্দিন একবার মুজিবের কাছে কিভাবে তিনি তার (মুজিবের) অবর্তমানে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন বলতে চেয়েছিলেন কিন্তু মুজিব একবারের জন্য শুনতে চাননি।তাজউদ্দিন পরবর্তিতে এই ঘটনা তার কাছের মানুষদের কাছে বলে গেছেন।তিনি বলেছিলেন।মুজিব ভাই আমার কাছে কোনদিনও কিভাবে যুদ্ধে পরিচালিত হয়েছে তা জানতে চাননি।পরবর্তিতে আমরা তাজঊদ্দিঙ্কে কিভাবে প্রথমে দল থেকে পরে মন্ত্রী সভা থেকে তাকে বাদ দিতে দেখেছি।জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষনা মুজিব এক ধরনের ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ হিসাবে দেখেছে।পক্ষান্তরে জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবকে সন্মানের সাথে মূল্যায়ন করেছেন।অনেকে বলে থাকেন যে জিয়াউর রহমান মুজিবকে নিয়ে একটা লেখা লিখে নিজের উদারতার পরিচয় দিয়েছেন।আমাদের এখন অনেক বেশি ইতিহাস সচেতন হতে হবে।মনে রাখতে হবে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষনা দিয়েছেন যেমন একজন সরকার প্রধান কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান যুদ্ধের ঘোষনা দিয়ে থাকেন ঠিক সেই ভাবে।তাকে এর থেকে নিচে নামানোর ইতিহাস তৈরী করা যাবে না।
একজন মুক্তিযোদ্ধার লেখা থেকে জানা যায় কিভাবে অন্যায়ভাবে কোন কারণ ছাড়াই মেজর জিয়াউর রহমানকে সুপারসিড করে মেজর শফিউল্লাহকে সেনাবাহিনীর প্রধান নিয়োগ করে শেখ মুজিব সেনা বাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেন। এভাবেই সেনাবাহিনীর মধ্যে বিভিন্ন দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে জাতির মেরুদন্ড সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে রাখার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে ছিলেন শেখ মুজিব। সামরিক বাহিনীতে বিভেদ নীতি প্রণয়ন করার সাথে সাথে বিএলএফ পরবর্তিকালে মুজিব বাহিনী এবং অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে সেনাবাহিনীর মোকাবেলায় তৈরি করা হয় জাতীয় রক্ষীবাহিনী।
সেনা বাহিনী গঠন করার অনুমতি সরকার দিলেও সেনাবাহিনীকে গড়ে তোলার তেমন কোন উদ্যোগ বা প্রচেষ্টা সরকারিভাবে নেয়া হয়নি মুজিব আমলে।পক্ষান্তরে রক্ষীবাহিনীকে সামরিক বাহিনীর চেয়ে বেশি শক্তিশালী করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় ভারতীয় সহযোগিতায়। রক্ষীবাহিনীর প্রশিক্ষণের দায়িত্ব ছিল ভারতীয় সেনা বাহিনীর উপর। তাদের পোষাকও ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর পোষাকের মতো। ভারত সরবরাহ করে তাদের গাড়ি, অস্ত্র-শস্ত্র, সাজ-সরঞ্জাম, রসদপত্র এবং আনুসাঙ্গিক সমস্ত কিছু। এদের অফিসারদের প্রশিক্ষণ হত দেড়াদুনের ভারতীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। সৈনিকদের ভারতীয় বাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ দিত ঢাকার অদূরে সাভারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের রাজনৈতিক সম্পাদক জনাব তোফায়েল আহমদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হত রক্ষীবাহিনী। সামরিক অধিনায়ক ছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত প্রাক্তন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য কর্নেল নূরুজ্জামান। রক্ষীবাহিনী সাধারণ মানুষের উপর অকথ্য অত্যাচার করত। জনসাধারণ ক্রমশঃ রক্ষীবাহিনীর অত্যাচারে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি বিরূপ হয়ে পড়ে। রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের যে কাউকে বিনা বিচারে বন্দী এবং হত্যা করার ক্ষমতা প্রদান; অপরাধীদের দেশের প্রচলিত আইনে বিচার না করে গোপনে হত্যা করার প্রচলন এবং আওয়ামী লীগ বিরোধীদের নিবির্চারে অত্যাচার নিপীড়নের ফলে আওয়ামী লীগ তথা শেখ মুজিবের ভাবমুর্তি দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। তাছাড়া ভারতীয় বাহিনীর অনূরূপ জলপাই রং-এর পোষাক জনগণের মনে অবিশ্বাস ও সন্দেহের সৃষ্টি করে। তাদের মনে ধারণা জন্মে, প্রয়োজনে মৈত্রী চুক্তির আওতায় আওয়ামী সরকার মতলব হাসিল করার জন্য যে কোন সময় রক্ষীবাহিনীর আবরণে ভারতীয় বাহিনীকে দেশের অভ্যন্তরেও ডেকে নিয়ে আসতে পারে। উপযুক্ত কোন এক সময় বাংলাদেশ সেনা বাহিনীকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে সরকার রক্ষীবাহিনীকেই সেনাবাহিনী হিসেবে অধিষ্ঠিত করবে; এ ধরণের কথাও শোনা যাচ্ছিল সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের এ ধরণের বৈরী মনোভাবে এবং অবহেলায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা মনঃক্ষুন্ন হন।
এখন ইতিহাস ডাকাতি হচ্ছে ।জিয়াউর রহমানে স্বাধীনতার প্রথম ঘোষনা ধ্বংশ করে ফেলা হয়েছে।এই মূল্যবান দলিলকে নষ্ট করার পেছনে কি উদ্যেশ্য থাকতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।স্বাধীনতার যুদ্ধের প্রথন সমরিক এবং রাজণৈতিক নেতৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়ে এই দেশকে মুক্ত করার জন্য সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করেছেন।জিয়াউর রহমানের প্রতি স্বাভাবিক হিংসা তার সহকর্মিদের মধ্যে ছিলো।সেটাকেও প্রশ্রয় দিয়েছিলেন শেখ মুজিব।ধরে নেয়া যেতে পারে যে শেখ মুজিব রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পরও জাতীয় নেতা সুলভ আচরন করতে পারেন নি।এমন কি মাওলানা ভাসানীর পরামর্শকে তিনি নানা ভাবে প্রত্যাখ্যান এবং অবজ্ঞা করেছেন।ইতিহাস নিয়ে যত চর্চা হবে ততই জিয়াউর রহমান সম্পর্কে নানা অজানা তথ্য বের হয়ে আসবে।কবি শামসুর রাহমানের এটা লেখা দিয়ে শেষ করতে চাই যে লেখাটি তিনি জিয়াউর রহমানের উপরে লিখেছিলেন- "এই দেশ মাটি মানুষকে ভালোবেসেছিলেন মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।ব্যক্তিগত সুখ-স্বাছন্দ্য কিংবা স্বার্থ চিন্তা নয়,শুধু এদেশের মানুষের কল্যণের চিন্তাকে ঘিরে আবর্তিত হত তার জীবনের প্রতিটি দিন,প্রতিটি মুহুর্থ।একটু বিশ্রাম কিংবা অবসর নেবার প্রশ্ন তুললেই তিনি সব সময় বলতেন-?'আমাকে কাজ করতে হবে ।নষ্ট করবার মত সময় আমার নাই'।তাই দেশের মধ্যে থাকলে তিনি যেমন নিমগ্ন থাকতেন কাজে তেমনি দেশের বাইরে গেলেও তার মন পড়ে থাকতো এর মাটি আর মানুষের কাছাকাছি?"