স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার মহা-পরীক্ষায় জাতি |

-স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার মহা-পরীক্ষায় জাতি
দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব যখন বিপন্ন হয়ে পড়ে, তখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার পালাবদলের আটপৌঢ়ে টানাপড়েনের রাজনীতি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।রাজনীতির অতি প্রচলিত একটি কথা হচ্ছে এই যে, স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা আরও কঠিন ও ত্যাগ তিতীক্ষার দাবি রাখে। একটি জাতির জীবনে স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম যেমন স্বর্ণালী ইতিহাসের অনন্য অধ্যায় এবং এ ধরনের ঘটনা জাতির জীবনে যেমন বার বার আসে না, তেমনি স্বাধীনতার সংকটও বার বার আসে না। কিন্তু এ ধরনের সংকট যখন আসে, তখন দল-মত নির্বিশেষে রাজনীতিক ও সামাজিক শক্তির নেতৃত্বেই জাতির সংকট মোচনের মহাসংগ্রাম রচিত হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যে গভীর সংকটের প্রান্তে এসে উপনীত হয়েছে, এটা যে কোন রাজনীতিকের গলাবাজি বা জুজুর ভয় দেখানোর স্থূল বিষয় নয়, আমরা সেটা বুঝতে পারছি কিনা? আর যদি বুঝতে পারি তাহলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক আন্দোলনের পথ ধরে ক্ষমতার ঠিকানা খুঁজে পাবার চেয়ে এখন স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একাট্টা হয়ে জাতীয় শত্রুর বিরুদ্ধে মহাসংগ্রাম গড়ে তোলাই সময়ের দাবি। তাহলে তেমন দেশ কাঁপানো আন্দোলন গড়ে উঠছে না কেন? এ ধরনের আন্দোলন কি আকাশ থেকে ফেরেশতারা নেমে এসে গড়ে তুলবেন, নাকি বিদেশ থেকে অন্য কেউ এসে করে দেবে? এর কোনটাই সম্ভব নয়। ১৫ কোটি মানুষের এই দেশকে সংকটমুক্ত করতে মানুষের নেতৃত্বকেই এগিয়ে আসতে হবে। এ ধরনের বিবেকবান সংগ্রামী মানুষই জাতির ইতিহাস নির্মাণ করেন। স্বাধীনতার জন্য রক্তাক্ত সংগ্রামের ইতিহাস যে জাতির রয়েছে, সে জাতির সংকটে স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আরও বড় ধরনের আত্মত্যাগ স্বীকার করার সামর্থ্য ও ইচ্ছা নিশ্চয়ই রয়েছে। প্রয়োজন হচ্ছে, জনগণের সংগ্রামী চেতনাকে ধারণ ও লালন করে তাকে সঠিক নেতৃত্বে যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছে দেবার রাজনৈতিক উদ্যোগ ও সামাজিক উদ্যম। রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির সমন্বিত ধারাই জাতির প্রতিরক্ষার ধন্বন্তরী। প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছেন : স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে তারাই ‘জুজুর ভয়' দেখাচ্ছে, ‘যারা তলে তলে দেশ বিক্রি করতে চায় এবং যারা স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি।' তাহলে তার মতেও দেশে স্বাধীনতা বিক্রির জন্য ওঁৎ পেতে থাকা শক্তি আছে।
ভারতের মতো বিশাল দেশও স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব নিয়ে শংকিত হয়ে অতন্দ্রপ্রহরীর মতো জেগে থাকে। ভারতীয় নেতৃত্বও মনে করে না যে, তাদের স্বাধীনতা ও ভূ-খন্ডগত সার্বভৌমত্ব নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলায়ে রয়েছে। তারাও অভ্যন্তরীণ ও বাইরের দিক থেকে বিপন্ন হতে পারেন বলে সর্বদা প্রতিরক্ষাকে নিপুণ ও অভ্যর্থ নিশানায় বিন্যাস করে রেখেছেন। বছর কয়েক আগে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্ন্দান্দেজ বলেছিলেন, গণচীনই হচ্ছে ভারতের এক নম্বর প্রতিপক্ষ। প্রতিবেশী পাকিস্তানের সামরিকায়ন কিংবা পরমাণু শক্তির অধিকারী হওয়ায় ভারত নিজের পরমাণু শক্তির প্রসঙ্গ উহ্য রেখে নানা মাত্রায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে না হলেও পাকিস্তানভিত্তিক রাষ্ট্র বহির্ভূত সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ ও ভারতের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় ভেঙ্গে ভারতে আঘাত হানতে সক্ষম। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সবকথা বিশ্বাস করতে হলে, কয়েকমাস আগে মুম্বাইয়ে রাষ্ট্রহীন সন্ত্রাসীদের ভয়ঙ্কর হামলার পর এটা আরও বেশি সত্যি বলে মনে করা যায়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসএম কৃষ্ণা কয়েকদিন আগে বলেছেন, সামরিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মানদন্ডে ভারত বর্তমানে যে উচ্চতায় রয়েছে, তাতে পাকিস্তানকেই ভারতের সাথে সম্পর্ক রক্ষার পথ ও পন্থা কি হবে তা বের করতে হবে। এদিকে আমরা দেখছি, শিশুদের দাঁত ওঠার সময় নির্বিচার কামড়ানোর মতো উঠতি পরাশক্তি ভারতও প্রতিবেশিদের ওপর তার দাঁতের শক্তি ও সুতীক্ষ্ণ ধার পরীক্ষা করছে। এটা হয়তো বেশিদিন স্থায়ী নাও হতে পারে।
প্রবাদ আছে : ‘তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে।' ভারতের চেয়ে আর এক ধাপ বড় শক্তি এবং তার স্পর্শকাতর নিকটতম প্রতিবেশী গণচীনের সাথে ভারতের স্নায়ুযুদ্ধ এ অঞ্চলের রাজনীতিতে নয়ামাত্রা যোগ করেছে। ভারত ১৯৬২ সালের যুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক তাড়না থেকে এখনও মুক্ত হতে পারেনি। সীমান্তের ওপাড়ের চীনা সেনাদের মুভমেন্ট ভারতের সার্বক্ষণিক নজরদারির নয়া অনুষঙ্গ। লাদাঘ সীমান্তে চীনা সেনাদের খুঁটিনাটিও ভারতে সেনসেটিভ খবর। অরুণাচলকে ভারতভুক্ত করার বৃটিশদের ম্যাকমোহন লাইন গণচীন সরকার আন্তর্জাতিক সীমান্তরেখা হিসেবে মানে না। অরুণাচলকে তারা ‘দক্ষিণ তিববত' বলে অভিহিত করে। তিববতের প্রবাসী নেতা দালাইলামার সাম্প্রতিক তাইওয়ান সফর ভারত-মার্কিন অক্ষের চীন বিরোধী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে নয়ামাত্রা যোগ করেছে। ভারত অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতীয় সাত রাজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক অভিযান নয়াদিল্লীর অস্থিরতার প্রমাণ। নেপালে মাওবাদীরা এখনও সেখানে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি। নেপাল নিয়ে ভারত এখনও নিঃশংসয় হতে পারেনি। এ সব কারণে আঞ্চলিক ক্ষেত্রের এসব চাপ বাংলাদেশের ওপর অভিঘাত হিসেবে এসে পড়েছে। বিগত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগ-মহাজোট সরকারের ভরসায় ভারত বাংলাদেশকে ঘিরে যতো সব স্ট্র্যাটেজিক ও আর্থ-সামরিক কৌশল প্রণয়ন করেছে। তারা তার সফল প্রয়োগের আনুকূল্য পেয়েছে বলে তা আগ্রাসী ও আহলাদিত। ভারতের এই মনে করাটা যে কতটা যৌক্তিক, শেখ হাসিনা সরকার ভারতের সাথে নানামাত্রিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক বাঁক পরিবর্তনের চুক্তি সম্পাদনের সম্মতির মাধ্যমে তা প্রমাণ করেছেন। ভারতকে ট্রানজিট-করিডোর সমুদ্র বন্দর-রেল যোগাযোগ-নৌ-ট্রানজিট দেয়া, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ গ্রীডকে ভারতের বিদ্যুৎ গ্রীডের সাথে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ শেখ হাসিনার দুঃসাহসী কাজ। তবে এর পেছনে ভারতের সাথে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের প্রভু-গোলামের দায়বদ্ধতাও নিউক্লিয়াস হিসেবে কাজ করছে।
এতে যে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হারানোর ঝুঁকি রয়েছে এবং বাংলাদেশের সার্বভৌম শক্তির ওপর যে ভারতের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে, তা শেখ হাসিনাও জানেন, তবে মানেন না। ভারতের আগ্রাসী কূটনীতির কাছে শেখ হাসিনা প্রদীপমুখো পতঙ্গের মতো বেপরোয়া আত্মসমর্পণ করে দেশপ্রেমিক শক্তির প্রতিরোধকে প্রোভোক করেছেন বলেই আমি মনে করি। এখন তাই সময় হয়েছে দেশপ্রেমিক শক্তির জেগে ওঠার। কিন্তু দেশপ্রেমিক শক্তি যে নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা ও ভরসায় সময়ের জাবর কাটছেন, প্রতিরোধের চোয়াল ও পেশীশক্ত করছেন, সেই শক্তির দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। জাতীয়তাবাদী ঘরানার তাত্ত্বিক ড. মাহবুব উল্লাহও হতাশ হয়ে তাই লিখেছেন: ‘‘কিন্তু যারা ওয়াদা করেছিল, ভারতকে করিডোর দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করতে দেবে না, তারা কি করল? কিছু দায়সারা গোছের কথা বলা ছাড়া আর কিছুই তো করল না।
তারা নিজেদের সংগঠনটি পর্যন্ত গুছিয়ে উঠতে পারেনি। নেতৃত্বের লড়াইয়ে এই সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে কলহ-কোন্দলের কথা আজ কারও অজানা নেই। অথচ কলহ-কোন্দলে স্থবির হয়ে পড়া সংগঠনটিকে চাঙা করার একমাত্র উপায় ছিল রাষ্ট্রঘাতী এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রবল গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, ‘দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও, বেগম খালেদা জিয়ার ঘোষিত এই নীতির প্রতি বিন্দুমাত্র মমত্ববোধ থাকলে সংগঠনটির মধ্যে বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মী-আত্মঘাতী কলহ কোন্দলে জড়িয়ে পড়ত না। সময়টি ছিল দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষা দেওয়ার।’’ [‘তথাকথিত এশিয়ান হাইওয়ে চুক্তির খসড়া জমসমক্ষে প্রকাশ করুন', -ডঃ মাহবুব উল্লাহ : আমার দেশ : ১২.০৯.০৯]
প্রধান বিরোধী দল বিএনপি একদিকে সংসদে অনুপস্থিত। অন্যদিকে জাতীয় ইস্যুতে কোন সুনির্দিষ্ট কর্মসূচিও দেয়নি। তবে তেল-গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটির আজ সোমবারের অর্ধদিবস হরতালে তারা নৈতিক সমর্থন জানিয়েছে। প্রতিরক্ষাবাহিনীর ইফতার মাহফিলে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর এক টেবিলে ইফতার গ্রহণ এবং সহাস্য কুশল বিনিময় দুর্লভ রাজনৈতিক দৃশ্যপট হলেও এটি ক্ষণিকের বিদ্যুৎ-ঝলক ছাড়া জাতীয় রাজনীতিতে তেমন কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। জনগণের জন্য প্রীতিকর বিষয় হচ্ছে, উভয় নেত্রীই উভয়ের কুশল জিজ্ঞাসায় নির্ভার, শালীন ও মানবিকতার পরশ দিয়েছেন। শালীনতা রাজনীতিরই অনুসঙ্গ।
প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেত্রীকে সংসদে ফিরে আসার আহবান জানালেও বিরোধী দলীয় নেত্রী মূলত: তাঁর সহযোগিতার হাত ফিরিয়ে দেবার সরকারী নীতির প্রতি ইংগিত দিয়েছেন। বিএনপি'র মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার বলেছেন ঃ সংসদে ফিরে যাবার আগে সরকারকে তার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সম্ভবত: বেগম খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টস্থ বাড়ি, তাঁর ও তাঁর পুত্রদের বিরুদ্ধে কেয়ারটেকার আমলের দায়ের করা মামলাগুলো তুলে নেবার প্রতিই তিনি ইংগিত দিয়েছেন। বিএনপি তাদের কাউন্সিল অধিবেশনের আগেই তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন, তাঁকে মামলাজট থেকে মুক্তকরণ এবং দলের আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করার কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারের বাঁধা না দেবার প্রতিশ্রুতি পেতে চায়। তবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় তারেক রহমানের একটি মামলাও তুলে নেয়া হবে না। ছাত্রলীগের দাবী, তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে এনে তাকে বিচারে সোপর্দ করতে হবে। এদিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কথার সূত্র ধরে খোন্দকার দেলোয়ার বলেছেন, তারেক রহমানকে মামলাজট থেকে মুক্ত করা এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
জাতির বর্তমান ক্রান্তিকালে জাতীয় ইস্যুতে কর্মসূচী না দিয়ে বিএনপি তাদের সাংগঠনিক পুঁজি ও রাজনৈতিক শক্তি তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে এনে তার নেতৃত্বে বিএনপিকে আরও গতিশীল করতে চেয়ে সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কিনা, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকমহল সে প্রশ্ন তুলেছেন। বেগম খালেদা জিয়ার সাথে যারা তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তারেক রহমানকে শারীরিকভাবে পঙ্গু ও রাজনৈতিকভাবে কলংকিত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে, তারা জাতীয়তাবাদী শক্তির নেতৃত্বের ভূমিকায় তারেক রহমানের বীরোচিত প্রত্যাবর্তন চাইবে না। বিগত কেয়ারটেকার সরকারের মাধ্যমে যে অপশক্তিটি তারেক রহমানকে নিঃশেষ করে বিএনপি-র ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও নবীন রাজনীতিবিদদের নির্মূল করতে চেয়েছিল, সেই শক্তির প্রেতাত্মারা সরকারের চারপাশেই রয়েছে। তাদের বৈরীতার ব্যুহ ভেদ করে তারেক রহমানের নিষ্কণ্টক অভিষেক ঘটানো সম্ভব হবে কিনা, তা বলা যায় না। বিগত সরকার যেমন তারেক রহমানের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করতে চেয়েছে, বর্তমান নির্বাচিত সরকারও তারেকের মামলা বহাল রেখে বেগম খালেদা জিয়া ও তার দল বিএনপিকে আন্দোলন থেকে বিরত রাখার ব্ল্যাকমেইল নীতি নিয়েছে।
ড. মাহবুবউল্লাহ-র সাথে আমিও একমত যে, তারেক রহমানকে বিএনপি এ মুহূর্তে একমাত্র ইস্যু বানিয়ে ভুল করলো। সরকারী দল এখন বলতে পারে যে, বিরোধী দল জাতীয় ইস্যুর চেয়ে পারিবারিক ইস্যুকে বেশী গুরুত্ব দেয়। জাতীয় ইস্যুতে বিএনপি ও ইসলামী শক্তিসহ সকল দেশপ্রেমিক শক্তি ব্যাপক প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে রাজনীতির স্বাভাবিক গতিধারায় তারেক রহমান কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে চলে আসতেন। অনেকে মনে করেন, দুই নেত্রীকে সমঝোতার বাইরে রাখতে উভয় দলেই ভিন্ন দেশের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সক্রিয়। একইভাবে সরকারি ও বিরোধী দলে যে গৃহদাহ ও গৃহবিবাদ চলছে, তার পেছনেও গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের জাল বিস্তৃত রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থার নেপথ্য ইতিবাচক নেটওয়ার্কে জাতীয় ইস্যুতে দুই নেত্রী তথা দুই বড় দলকে ঐকমত্যে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এ যাবত সরকারের পক্ষে যারা নেপথ্য থেকে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে, তাদেরকে লন্ডভন্ড করে দেয়া হয়েছে। ১/১১-এর পর প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন দুই নেত্রীসহ রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও অন্যান্য পর্যায়ের নাগরিকদের ওপর অনাবশ্যক লক্ষ্যহীন নির্যাতন চালিয়ে যে দুর্নাম কুড়িয়েছে, তাতে করে এই সংস্থাটিকে জাতীয় সংকটে ইতিবাচক ভূমিকায় কেউ দেখতে চায় না। যদিও ভারতে জাতি-রাষ্ট্রের সুরক্ষা, জাতীয় ঐক্যে ‘র'-এর ভূমিকা আরও বেড়েছে। অবশ্য সরকারের দিক থেকেও রাষ্ট্রীয় এসব প্রতিষ্ঠানকে মহৎ ও গঠনমূলক জাতীয় কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হবার অনুমতি দেয়া হয় না।
আমরা বলবো, ১/১১ সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীকে কলংকিত করেছে। এর শাস্তিস্বরূপ এ সংস্থাকে অপ্রয়োজনীয় করে রাখা হয়েছে। আমরা এখনও মনে করি, পরিকল্পিতভাবেই প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে নির্যাতন করানো, ভারতীয় উলফা'র প্রশ্রয় দান এবং পাকিস্তানী আইএসআই'র দোসর হিসেবে চিহ্নিত করে আমাদের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাসমূহকে ভারতের স্বার্থে পঙ্গু ও অন্ধ করে রাখা হয়েছে। বিডিআর বিদ্রোহ ও জওয়ানদের হাতে সেনা অফিসার হত্যার মাধ্যমে যেমন বিডিআরকে কলংকিত করে পুনর্বিন্যাসের নামে ভারতের স্বার্থে বিডিআরের খোলস বদলানো হচ্ছে।
আমরা নানাভাবেই বলার চেষ্টা করেছি যে, ১/১১ ছিল ভারতসহ কয়েকটি দেশের প্ররোচনা ও পরিকল্পনায় একটি অঘোষিত সামরিক অভ্যুত্থান। এটা সামরিক বাহিনী ও তৎসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বিতর্কিত ও দুর্বল করে দিয়েছে। ভারতীয় মিডিয়া তাই একে ‘ফ্রেন্ডলী ক্যু' বলেছে। ১/১১-এর সরকারের সাজানো নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মহাজোট সরকারের ক্ষমতায় আসাটা যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ফল নয়, এটা যে বাইরের শক্তির নীল নকশারই অনুদান, তা সদ্য প্রকাশিত বাংলাদেশ-ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের যৌথ সংবাদ বিবৃতিতেও স্বীকার করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে ঃ "They also noted that recent elections have provided both countries with a historical opportunity to take India-Bangladesh relations to greater heights." তারা উভয়ই বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে উচ্চমাত্রায় উপনীত করার ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে।
আসলে এই সুযোগটি ১৯৭১ সালে ভারতের ‘পাকিস্তান ভাঙ্গার' শতাব্দীর মাহেন্দ্রক্ষণের মতোই আর একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলে ভারতীয় বিশ্লেষকরা মনে করেন। সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন এর অনুঘটক।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. দীপু মণির ভারত সফরের প্রাক্কালে ভারতীয় প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা বলয়ের তাত্ত্বিক হিরন্ময় কারলেকার ‘দি পাইওনিয়ার'-এ ৩ সেপ্টেম্বর-০৯ 'Importance of Dipu Moni's visit can't be overstressed' শীর্ষক এক লেখায় উল্লেখ করেছেন : "Considerable importance attaches to Bangladesh's Foreign Minister Dipu Moni's visit in next few days. Bangladesh is India's only neighbouring country where developments since the beginning of the year, when an Awami League-led Government assumed office, warrant satisfaction while Awami League has been traditionally toward this country, the government it led from 1996 to 2001, which also had Sheikh Hasina as Prime Minister, did not fulfil India's expectations as on several issues- ending by support by Bangladesh's intelligence agencies, primarily the Directorate General of Forces Intelligence, to rebel groups on North Eastern India, acting effectively against Pakistan Inter-Services Intelligence Directorate and Terrorist Organisations like the Harkat-ul-Jihad-Al-Islami Bangladesh using Bangladesh's territory for terrorist strikes against India, granting Indian goods transit facilities from the rest of the country to the north-eastern states through its territory and the sale of Bangladeshi natural gas to India." -পাঠকের অবগতি ও রেকর্ড রাখার জন্য এই দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিলাম। অনুবাদ না করলেও এর মর্মার্থ সবাই বুঝবেন।
জেনারেল জিয়া এবং ১৯৯১-১৯৯৬ সময়কালের সরকার প্রধান বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন হিরন্ময় কারলেকারের এই লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে। মিঃ কারলেকার একই নিবন্ধে লিখেছেন : "During the period, the disguised as well as undisguised military dictatorships under General Zia-ur-Rahman and Gen. HM Ershad, as well as the elected government of Begum Khaleda Zia during her ministerial incarnation(1991-1996), had swamed the bureaucracy, the Armed and Para military forces, and the intelligence agencies with Pro-Pakistan and antiIndian elements, while systematically trying to Islamise Bangladesh significantly,- General Zia-ur-Rahman had set up the DGFI, initially called Directorate Forces Intelligence, in November 1971, shortly after a visit to Dhaka by then ISI Chief, Lt. Gen Ghulam Jilani Khan. It is a clone of the ISI which has trained many of its officers." (প্রাগুক্ত)
হিরন্মময় কারলেকার জেনারেল জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়াকে ভারত বিরোধী ও পাকিস্তানপন্থী এবং বাংলাদেশকে ইসলামীকরণের উদ্যোগী হিসেবে বয়ান করেছেন। পাকিস্তানের আইএসআই-র আদলে বাংলাদেশের ডিজিএফআই-কে প্রতিষ্ঠার জন্য মিঃ কারলেকার জেনারেল জিয়াকে চিহ্নিত করে এই সংস্থাটিকে আইএসআই-র ‘জমজ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এ নিয়ে বিশ্লেষণ করার অবকাশ এ লেখায় নেই। তবে ১/১১-এর সরকার প্রতিষ্ঠায় তদানীন্তন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন তার অধীনস্থ প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বাহিনীকে প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা বাহিনী ‘র'-এর নীলনকশায় ভালোভাবেই ব্যবহার করেছেন। যার ফলে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের মাধ্যমে ভারতই পাচ্ছে। সুতরাং সেনাবাহিনী ১/১১-এর পূর্ব পর্যন্ত জাতীয় সংকটে এবং রাজনৈতিক বিভাজনে যে ঐক্য-দূতের ভূমিকা পালনের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানে ছিল এবং এ ব্যাপারে যে মানসিকতা ও দেশপ্রেম পোষণ করতো, তা-ও বর্তমানে নেই। তারপরও দুই নেত্রী কিন্তু প্রতিরক্ষা বাহিনীর ইফতারের আমন্ত্রণেই সাড়া দিয়েছেন। জাতীয় সেনাবাহিনী যদি অবক্ষয় ও বিপথগামীতার পথ পরিহার করে অতীতের মতোই সংকটকালে জাতীয় ঐক্যের গ্রন্থি রচনায় তার নিজের ভূমিকাকে পুনরাবিষ্কার করতে পারে, তাহলে বাইরের শক্তির অন্তর্ঘাতের ধারা ব্যর্থ করা সম্ভব।
বিবিসি'র সাথে সংলাপে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা ডা. মোদাচ্ছের আলী সম্প্রতি বলেছেন, ‘‘২০০১ সালে গ্যাস রফতানিতে রাজী না হওয়ায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারেনি।’’ [মানব জমিন : ৬-০৯-০৯]। একই কথা বললেন, তার ৫দিন পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ। তিনিও বলেছেন, ‘‘৫০ বছরের তেল-গ্যাসের মজুদ রেখে রফতানির নীতির কারণেই ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারেনি।’’ তাদের এই বক্তব্য সত্যি হলে ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসা চারদলীয় জোট সরকার বিদেশীদের তেল-গ্যাস না দিয়ে ক্ষমতায় থাকতে পারতো না। আর তারা যদি আওয়ামী লীগের কথামতো বিদেশীদের তেল-গ্যাস দেবার ব্যাপারে রাজী থাকতো, তাহলে ১/১১-এর ইমার্জেন্সীর আওতায় অঘোষিত সামরিক ক্যু'-র মাধ্যমে চারদলীয় জোটকে ক্ষমতার বাইরে রেখে নির্মূল করার অভিযান চলতে পারে না। শেখ হাসিনা ১/১১ এর সরকারকে তাদের আন্দোলনের ফসল বলেছেন।
১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত, সময়কার সন্ত্রাস, লুণ্ঠন, অপশাসনই আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছে। ২০০৭-এ ক্ষমতায় আসতে আওয়ামী লীগ শুধু তেল-গ্যাস উত্তোলনে বিদেশীদের সাথে জাতীয় স্বার্থের বিনিময়ে আপোষই করেনি। তারা আপোষের হাত আরো সম্প্রসারিত করে ভারতকে করিডোর-ট্রানজিট সমুদ্র বন্দরসহ বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় অবাধ ছাড়পত্র দিয়ে জেনারেল মইন সমর্থিত কেয়ারটেকার সরকার ও ইসি-র মাধ্যমে ডিজিটাল কারচুপিতে ক্ষমতাসীন হয়েছে। এতে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে চলেছে। এখন তারা ভারতের দায় শোধ করছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একদিকে নিজেকে স্বাধীনতা রক্ষার ‘জোয়ান অব আর্ক' হিসেবে উপস্থাপন করেও নিজে নিরাপত্তার জন্য কাঁচের দেয়ালে আত্মরক্ষা করছেন। ভারতকে এতকিছু দেয়ার পরও ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা তার ভূমিকায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। এমনকি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের মধ্যেও নাকি ‘পাকিস্তানপন্থী-ভারত বিরোধী' লোকদের শক্তিশালী লবী থাকায় ভারত পুরোপুরি সফল হতে পারেনি। ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া'র উদ্ধৃতি দিয়ে ‘নয়াদিগন্ত' (১২-০৯-০৯) একটি রিপোর্ট উল্লেখ করেছে : ‘ঢাকার কট্টর অবস্থান নিয়ে নয়াদিল্লী'। পত্রিকাটি তাদের ১১-০৯-০৯ তারিখের সংখ্যায় ভারতের ঊর্ধ্বতন নীতি-নির্ধারকদের মতামতের সূত্র ধরে লিখেছে : ‘‘ঢাকার হার্ডলাইন নিয়ে বিরক্ত নয়াদিল্লী।’’ পত্রিকাটি লিখেছে : ‘‘দিল্লীর কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল সত্ত্বেও এই আমলারা (উপদেষ্টাসহ) তাদের ভারত বিরোধী নীতিই অনুসরণ করে যাচ্ছে। ভারত মনে করে যে, শেখ হাসিনা তার সরকার থেকে এই ধরনের ব্যক্তিদের অপসারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।’’ টাইমস অব ইন্ডিয়ার এই মন্তব্য শেখ হাসিনার জন্যও ওয়ার্নিং।
আমি ব্যক্তিগতভাবে এই ধরনের মূল্যায়নকে শেখ হাসিনা সরকারের উপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল বলে মনে করি। ভারত বাংলাদেশের সামরিক শক্তির দিক থেকে চাপমুক্ত এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধের সম্ভাবনাও তারা ভন্ডুল করে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে নিজ নিজ অভ্যন্তরীণ সংকটে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। এটাই বাংলাদেশকে তাদের সাব-সারভিয়েন্ট রাষ্ট্র বানানোর উপযুক্ত সময় বলে তারা মনে করছে। তবে শেখ হাসিনা সরকার যাতে অভ্যন্তরীণভাবে সংকট বা প্রতিরোধের মুখে না পড়ে, তার নিশ্চয়তাও তারা দিবে। আমরা লক্ষ্য করছি, সরকার প্রধানকেও চাপ ও ঘোরের মধ্যে রাখা হয়েছে। শেখ মুজিবের মতো অবিসংবাদিত নেতার অঙ্গুলী হেলনে ভারত তার সেনাবাহিনী সরিয়ে নিলেও মুক্তিযুদ্ধের আত্মসমর্পণের দলিল সংশোধন করেনি। ২৫ সালা ‘মৈত্রী' চুক্তি করে ভারতের ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে হয়েছিল। ট্রানজিট-করিডোর দিয়ে ভারতের সামরিক বাণিজ্যিক শক্তি বাংলাদেশে ঢুকে গেলে শেখ হাসিনা হুংকার দিলেই তারা সরে যাবে না। শেখ হাসিনা তাঁর পিতার বিকল্প ব্যক্তিত্ব নন। প্রধানমন্ত্রী যাকে ‘জুজু' বলেছেন, তা মূর্তিমান বিভীষিকা। শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়াকে স্ব-স্ব রাজনৈতিক উৎসে ফিরে যেতে হবে। শেখ হাসিনাকে তাঁর পিতার রাজনীতির পুনরাবিষ্কার এবং খালেদা জিয়াকে শহীদ জিয়ার রাজনীতিকে পাথেয় করে এগুতে হবে।