ইত্তেফাকের গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

সরব দুর্ভিক্ষ চলছে, দুর্নীতি বেড়েছে আড়াইগুণ
ড. কামাল হোসেন বললেন মুমুর্ষু দেশ আইসিইউতে চিকিৎসাধীন

শামছুদ্দীন আহমেদ: দৈনিক ইত্তেফাক আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত বলেছেন, নিরব নয়, দেশে এখন যথেষ্ট সরব দুর্ভিক্ষ চলছে। ওয়ান ইলেভেনের পর দেশে দুর্নীতির হার ও ঘুষের পরিমাণ বেড়েছে আড়াইগুণ। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, মুমূর্ষু দেশ এখন ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। এখনই নাড়াচাড়া করলে রোগীর মতো মারাও যেতে পারে। বিএনপির যুগ্মমহাসচিব গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, বিচারের রায় যাই হোক দুই নেত্রীকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতেই হবে। নইলে কোনো রোডম্যাপই কাজে আসবে না। অন্য রাজনীতিকরা অভিন্নকণ্ঠে নির্বাচনের আগেই জরুরি অবস্থা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, সংশয় দূর করতে সর্বাগ্রে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং এখনই এর সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।

গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘সংসদ নির্বাচন, জরুরি অবস্থা ও আমাদের রাজনীতি’ শীর্ষক এই গোলটেবিল আলোচনায় অন্যান্যের মধ্যে আলোচনায় অংশ নেন আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, হান্নান শাহ, মোফাজ্জল করিম, নূরে আলম সিদ্দিকী, শেখ শহীদুল ইসলাম, জিএম কাদের, অধ্যাপিকা জাহানারা বেগম, সাদেক সিদ্দিকী, শাহাদাত হোসেন সেলিম প্রমুখ। বৈঠকে সঞ্চলক ছিলেন ইত্তেফাক সম্পাদক রাহাত খান। ড. কামাল বলেন, অসাম্প্রদায়িক ও গণতন্ত্রমনা দলগুলোকে সংলাপের মাধ্যমে ঠিক করতে হবে কখন জরুরি আইন প্রত্যাহার হবে। ধাপে ধাপে জরুরি আইন শিথিল করে একটি পর্যায়ে চুড়ান্তভাবে প্রত্যাহার করতে হবে। আইসিইউতে চিকিৎসাধীন মা যেমন সুস্থ হলে নিজ থেকেই হেটে হাসপাতাল ত্যাগ করে, তেমনি দেশকেও সুস্থ হতে সময় দিতে হবে। হঠাৎ আইসিইউ থেকে বের করা হলে অসুস্থ মা যেমন মারা যেতে পারেন , এক ধাপে জরুরি অবস্থা তুলে নিলে দেশের অবস্থাও সেরকম হতে পারে।

তিনি আরো বলেন, এখন কাউকে দোষারোপ করে লাভ নেই। আমরা অর্থবহ পরিবর্তন চাই, ওয়ান ইলেভেনের আগের পরিস্থিতিতে ফিরতে চাই না। শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ এখনো উপেক্ষিত। কালো টাকা ও পেশিশক্তিমুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে সে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে হবে। গণফোরামের উদ্যোগে তৈরিকৃত ঐক্যের সনদের ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, রাজনীতিকরা দেশের জন্য কাজ করেন। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ দলগুলোকে সে কাজ করার সুযোগ দেয়। নির্বাচন না হলে সে সুযোগ আসবে কীভাবে। তাছাড়া রোডম্যাপের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে দেশের পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তাও ভাবতে হবে। এ আশঙ্কা কাটাতে অবিলম্বে সারাদেশে ঘরোয়া রাজনীতি চালু এবং নির্বাচনের আগেই জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করতে হবে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হান্নান শাহ বলেন, বর্তমান সরকার আসলে কী চায়? নির্দ্বিধায় বলতে চাই, দ্রুত গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দল মাঠে নামেনি, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেনি। তাহলে এখনো জরুরি অবস্থা কার স্বার্থে? তিনি বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছেÑ এ সরকার দ্রুত নির্বাচন না করে কীভাবে তা বিলম্বিত করা যায় সে পথ বেছে নিচ্ছে। অথচ জাতি নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষমান।

অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত বলেন, ’৭১ এর চাইতেও এখনকার অবস্থা অনেক বেশি খারাপ। দেশ গভীর অন্ধকারে চলে যাচ্ছে। আমার হিসাব বলে ওয়ান ইলেভেনের পর দুর্নীতি আড়াইগুন বেড়েছে। যে কাজ আগে করা যেত ৫ শ টাকা দিয়ে, এখন তা করাতে ৫ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। সচেতনভাবে এখনই প্রয়াস না চালালে আগামী ৩ মাসে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে। তিনি বলেন, মৌলবাদীরা ১২টি সেক্টরে দলীয়ভাবে বিনিয়োগ করে মাসে ১২ শ কোটি টাকা আয় করছে। যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে জোট গঠনের কথা চিরতরে ভুলে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল দলকে এখনই এক হওয়ার জন্য আল্লাহর দোহাই দিয়ে তিনি রাজনীতিকদের প্রতি আহ্বান জানান। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, জিয়া এরশাদের সামরিক শাসনের মধ্যেও রাজনীতি ছিল। সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হলে সরকারই থাকবে না, সেজন্য তারা সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে চাইতো না। কিš' এখনকার সরকার সাংবিধানিক। সুতরাং জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকতে সাংবিধানিক কোনো বাধা নেই। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা ও জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার হলেই কেবল জনমনে বিরাজমান সংশয় দূর হতে পারে।

গয়েশ্বর রায় বলেন, ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন না করে ইসি এরইমধ্যে সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। সরকারের কথা সরকার বলে না। বলে অন্য জায়গা থেকে। তাহলে সরকার কে? শেখ হাসিনা জামিনে মুক্ত হয়ে নিজ দায়িত্বে বিদেশে চিকিৎসা করাতে যাবেন এবং ফিরবেন। সরকারের কাছে মুছলেকা দিয়ে যাবেন কেন? তিনি বলেন, ‘মাইনাস টু’ বাস্তবায়নের আগে নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই। কিš' দুই নেত্রীকে মাইনাস করার ক্ষমতা এ সরকারকে কেউ দেয়নি। দুই নেত্রীর প্রতি এ দেশের মানুষের অনেক আবেগ জড়িত। দুই নেত্রীকে লন্ডন, আমেরিকা যেখানেই হোক পাঠানো হয়তো যাবে, কিš' আবেগ রফতানি সম্ভব নয়।

ড. কামালের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে ওয়ার্কার্স পার্টি সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, আইসিইউতে থাকারও নির্দিষ্ট সময় আছে। এর অধীক সময় থাকলে রোগীর পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়, হাসপাতালের বিল পরিষোধের সামর্থ থাকে না। শেষ পর্যন্ত টাকার অভাবে লাশও নিতে পারে না। তিনি বলেন, নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করতে অসুবিধা কোথায়? রাজনৈতিক সরকার ছাড়া সমস্যা সমাধানের কোনো রাস্তা নেই। জাসদ সভাপতি ইনু বলেন, রাজনীতির মূল সমস্যা হচ্ছে আংশিক গণতন্ত্র ও নির্বাচিত স্বৈরাচার। দিনেদুপুরে লুণ্ঠন করব না, স্বৈরাচারের সঙ্গে আঁতাত করব না, প্রশাসনযন্ত্রকে দলীয়করণ করব না, এসব ব্যাপারে ঐকমত্য না হলে শুধু নির্বাচনের জন্য চিৎকার করে লাভ নেই।
সম্পাদনা: আনোয়ার চৌধুরী