যুগান্তর: আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বিশ্বাসই করতে পারছেন না, পরিবর্তনের পক্ষে এমন অকুণ্ঠ সমর্থন জানাবে দেশবাসী। শেখ হাসিনা ঘোষিত দিনবদলের সনদের প্রতি দেশের মানুষের নিরঙ্কুশ রায় মনে করিয়ে দেয় প্রাক-বাংলাদেশ ১৯৭০-এর নির্বাচনের কথা। সেবার এ ভূখণ্ডের মানুষ নিরঙ্কুশ গণরায়ের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ওপর অর্পণ করেছিল মুক্তির সনদ বাস্তবায়নের দায়িত্ব। স্বাধীনতার ৩৭ বছর পর ঠিক একই চেতনায় নিজেদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য আওয়ামী লীগের দিনবদলের আহ্বানে সাড়া দিয়েছে দেশের আপামর জনতা। ঘটিয়েছেন নীরব ভোট বিপ্লব। এদের বেশিরভাগই নারী ও নতুন প্রজšে§র ভোটার। ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচন কেবল গণতন্ত্রের পথে ফেরার নির্বাচন ছিল না, এ নির্বাচন দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের মূলোৎপাটন করে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে পরিবর্তনকামীদের ভোট বিপ্লব। দিনবদলের স্বপ্ন নিয়ে মহাজোটের পক্ষে নিরঙ্কুশ গণরায়ে আওয়ামী লীগ যেমন বিস্মিত, তেমনই স্তম্ভিত সাবেক ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত বেসরকারি ফলাফলে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিজয়ী হয়েছে ২৬৩টি আসনে। অন্যপক্ষে মহাজোটের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৩১টি আসন। বিএনপি প্রতিষ্ঠা লাভের পর এই প্রথম কোন নির্বাচনে এমন শোচনীয় পরাজয়ের স্বাদ নিল। নিজেদের ভরাডুবি ও বড় ব্যবধানে পরাজয়ের জন্য বিএনপি ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ৭২টি আসনে কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ এনেছে বিএনপি। দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষকরা সোমবারের শান্তিপূর্ণ নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ আখ্যায়িত করেছেন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের ফলাফল গ্রহণ করে নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে সংযত আচরণ প্রদর্শন করছে। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত দলীয় নেতাকর্মীদের বিজয় মিছিল ও সভা-সসমাবেশ করতে নিষেধ করছেন নবনির্বাচিত ভাবী প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এদিকে আগামী ১০ জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে মহাজোট সরকার শপথ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর ২৩ জুন দলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আওয়ামী লীগ সরকার শপথ নিয়েছিল। এই প্রথম তিন ডজনের বেশি হেভিওয়েট প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতা পরাজিত হওয়ায় নবম সংসদে বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়ার পাশে অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা অনুপস্থিত থাকবেন। তবে নতুন সংসদে দেখা যাবে একরাশ নতুন মুখ এবং এদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের।

৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে ভোট গ্রহণ করা হয় ২৯৯টি আসনে। নির্বাচন কমিশন ২৯৮টি আসনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেছে। একটি আসনের (নোয়াখালী-৩) ফলাফল স্থগিত রাখা হয়েছে। বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৬৩টি আসনে বিজয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। মহাজোটের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট পেয়েছে ৩১টি আসন। মহাজোটের শরিকদের মধ্যে দলগতভাবে আওয়ামী লীগ ২৩১, জাতীয় পার্টি ২৭, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ৩ ও ওয়ার্কার্স পার্টি ২টি আসনে নির্বাচিত হয়েছে।
চারদলীয় জোটের দলগত অবস্থানÑ বিএনপি ২৮, জামায়াতে ইসলামী ২ ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ১টি আসন। দুই জোটের বাইরে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৩টি আসন লাভ করেন।
বিভাগওয়ারি ফলাফলে দেখা যায়, বিএনপি ঢাকা ও সিলেট বিভাগে একটি আসনও পায়নি। চার দলের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীও ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে কোন আসনে জয়ী হতে পারেনি।
ঢাকা বিভাগের ৯৪টি আসনের মধ্যে ৯৩টিই পেয়েছে মহাজোট। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৮৭, জাতীয় পার্টি ৫ ও ওয়ার্কার্স পার্টি ১টি আসন পায়। মহাজোটের বাইরে একমাত্র আসনটি পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। ঢাকা বিভাগে চারদলীয় জোট একটি আসনেও জয়লাভ করতে পারেনি।
চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৮টি আসনের মধ্যে ৫৭টির ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, মহাজোট পেয়েছে ৩৮টি আসন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩৪, জাতীয় পার্টি ও জাসদ ২টি করে আসন। এ বিভাগে চার দল পায় ১৮টি আসন। এর ১৬টি বিএনপি ও বাকি ২টি জামায়াতে ইসলামী। এলডিপি ১টি আসনে জয়ী হয়েছে।
খুলনা বিভাগে ৩৬টি আসনের মধ্যে মহাজোট ৩৩টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। মহাজোটের আওয়ামী লীগ ৩০, জাতীয় পার্টি ২ ও জাসদ ১টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। বিএনপি ২টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ১টি আসনে নির্বাচিত হয়েছে।
রাজশাহী বিভাগে ৭২টি আসনের মধ্যে ৬৩টিতে বিজয়ী হয়েছেন মহাজোট প্রার্থীরা। এ বিভাগে আওয়ামী লীগ ৪৮, জাতীয় পার্টি ১৪ ও ওয়ার্কার্স পার্টি ১টি আসন লাভ করেছে। বিএনপি ৮টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ১টি আসন পেয়েছেন।
বরিশাল বিভাগে ২১টি আসনের ১৮টি অর্জন করেছে মহাজোট। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬ এবং জাতীয় পার্টি ২টি আসন পেয়েছে। বিএনপি ২টি ও বিজেপির ১টি মোট ৩টি আসন ঘরে তোলে চারদলীয় জোট।
সিলেট বিভাগে ১৯টি আসনের সবক’টিতে বিজয়ী হন মহাজোটের প্রার্থীরা। আওয়ামী লীগ ১৭টি এবং বাকি ২টি আসন পায় জাতীয় পার্টি।
২৯ ডিসেম্বর গত আটটি সংসদের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটার তাদের পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন। এর আগে ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে সর্বোচ্চ সংখ্যক ৭৫ দশমিক ৬০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছিলেন। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এবার কোন কোন আসনে ৯০ শতাংশেরও বেশি ভোট পড়ে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে ৯৩ দশমিক ২০, রংপুর-৫ আসনে ৯০ দশমিক ৬৬, জামালপুর-৪ আসনে ৮৯ দশমিক ০৮, চট্টগ্রাম-১৪ আসনে ৮৭ দশমিক ১৩, হবিগঞ্জ-২ আসনে ৮৫ দশমিক ০৭ ও ভোলা-১ আসনে ৭৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ ভোটার তাদের ভোট দিয়েছেন। প্রায় প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে তরুণ ও নারী ভোটারের উপস্থিতি ছিল বেশি।
এবার আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ প্রত্যেকে তিনটি করে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তারা সবাই প্রতিটি আসনে বিজয়ী হন। শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জ-৩, রংপুর-৬ ও বাগেরহাট-১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। খালেদা জিয়া ফেনী-১, বগুড়া-৬ ও বগুড়া-৭ আসনে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। এইচএম এরশাদ রংপুর-৩, কুড়িগ্রাম-৩ ও ঢাকা-১৭ আসনে বিজয়ী হন। আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও সাবেক মন্ত্রীদের মধ্যে নির্বাচিত হয়েছেনÑ জিল্লুর রহমান, সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আবদুল জলিল, মতিয়া চৌধুরী, আবুল মাল আবদুল মুহিত, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্পিকার আবদুল হামিদ, আবদুল মতিন খসরু, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, জাতীয় পার্টির ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, বিএনপির সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও এম কে আনোয়ার।
পরাজিতদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্প ধারার চেয়ারম্যান ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, বিএনপির প্রবীণ নেতা সাবেক অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর আহমদ, বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন, সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকী, সাবেক তথ্যমন্ত্রী এম শামসুল ইসলাম, চৌধুরী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী, অ্যাডভোকেট খোন্দকার মাহবুবউদ্দিন আহমাদ, লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, সাবেক মন্ত্রী ড. মঈন খান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আসম হান্নান শাহ, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সাবেক মন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী, তরিকুল ইসলাম, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ ও হারুনার রশীদ খান মুন্নু, সাবেক মন্ত্রী আসম আবদুর রব, একেএম মোশাররফ হোসেন, ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ও সাবেক সাংসদ মুফতি ফজলুল হক আমিনী, জামায়াত নেতা ও সাবেক সাংসদ মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন, সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমান পটল, সাবেক প্রতিমন্ত্রী কবির হোসেন, এবায়দুল হক চৌধুরী ও নুরুল হুদা, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রাজশাহীর মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, সাবেক ত্রাণ উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু প্রমুখ।
