স্টাইলিশ রবীন্দ্রনাথ

সাহিত্যে শুধু স্বপ্ন বেচার গল্প নয়, বরং জীবন যাপনের ইতিবৃত্ত আর আগামী দিনগুলোর স্টাইল ভাবনা যে, উঠে আসতে পারে তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঠাকুর পরিবারের লালিত ঐতিহ্য আর নিজের ভেতরের এক স্বপ্নবাজ মানুষের অদ্ভূত মিশেলের কারণে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ভাবনায় উঠে এসেছে বাঙালি জীবন-যাপনের এক আলাদা বৈশিষ্ট্য, এক ভিন্নমাত্রা এবং আগামীর ভিন্ন এক নির্দেশনা।

ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ফ্রেমে আঁকা ছবির মতোই পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি এবং নিভাঁজ স্টাইলের এক দূর্দান্ত মানুষ। দূর থেকে অদ্ভূত এক শক্তি রবীন্দ্রনাথের কাছে সবাইকে নিয়ে যেতো ভেতরের এক অভেদ্য টানে। আবার ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ বাইরে কল্পনা পিয়াসী রবীন্দ্রনাথের চোখেও যে চরিত্রগুলো ধরা পড়তো তার বড় অংশজুড়ে ছিল পবিত্রতার এক ভাঁজহীন গল্প। সম্ভাবত সেই কারণেই রবীন্দ্রনাথের আইল ভাবনার এক বড় অংশ জুড়েই বিস্তার করে আছে সাদা রঙের রাজত্ব।

ফ্যাশনে নিজস্বতা ফুটিয়ে তুলতে রবীন্দ্রনাথ বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য সাদা ও লালের প্রতি নির্ভর করেছেন নিশ্চিতভাবে। শুধু রঙ কেন্দ্রিক নয়, বরং রবীন্দ্রনাথের স্টাইল ভাবনার একটা বড় অংশ আমরা খুঁজে পাই তার উপন্যাসগুলোর চরিত্র চিত্রণের স্বাভাবিক বিকাশে। যেখানে প্রধান প্রধান চরিত্রগুলো পোশাকের স্টাইলে যেমন সমকালীন তেমনি নিজেকে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তারা আধুনিক, নিজেকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তারা স্টাইলিস্ট। এই চরিত্রগুলোতেই আমরা যে রাবেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে পাই তার একটা বড় অংশ জুড়ে ঠাকুর বাড়ির প্রভাব যেমন আছে তেমনি আছে সেই সময়ের আমাদের সভ্যতায় ছড়িয়ে থাকা নিজস্ব স্টাইল ভাবনা।

রবীন্দ্রনাথ কল্পনা জুড়ে যেমন সাদার বিস্তার দেখতেন তেমনি ফ্যাশন ভাবনায় তিনি প্রকাশ করতেন উলম্ভ রেখা চিত্রের বিস্তার। তার সেই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে লম্বা কুর্তা কিংবা ঢোলা পাঞ্জাবি এবং সঙ্গে কুচি দেয়া ধুতি প্রাধান্য পেত ছেলেদের স্টাইল ভাবনায়। তৎকালীন ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবেও রবীন্দ্রনাথের পোশাক ভাবনায় প্রাধান্য পেয়েছে কুচি দেয়া প্যান্ট, ফুল বাবু শার্ট এবং চিকনাই টাই। স্টাইল ভাবনাতে সস্থান পেয়েছে লেপটানো চুল, মোটা আকারের জুলফি, গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা এবং পাতলা চটি। ছেলেদের ক্ষেত্রে খানিকটা প্রথাগত থাকলেও মেয়েদের স্টাইল ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অনেক বেশি গবেষণাধর্মী।

শুরু থেকেই ঠাকুর বাড়ির শাড়ি পরার ধরণ তৎকালীন ফ্যাশনকে প্রভাবিত করেছিল ব্যাপকভাবে। হালকা কিংবা বড় আকারের গহনা শুধু ঠাকুর বাড়ির ঐতিহ্য ছিল না বরং রবীন্দ্রনাথের নারী স্টাইল নির্ধারণে তা ভিন্নতাও এনেছিল। সামনের চুলে জটানো বেনী, পেছনে বড় ঝুল খোঁপা, বড় মালা, কুঁচকানো হাতার ব্লাউজ ইত্যাদি নানা দিক নির্দেশনায় রবীন্দ্রনাথ নারী জগতের কাছে তার ভিন্ন স্টাইল ভাবনা তুলে ধরেছিলেন খুব সহজেই।

হাতে কাঁকন বা বালার ব্যবহার, অঙ্গুরিতে বড় ধরনের আংটি, কখনো ঘটি হাতার সঙ্গে বাজুবন্ধ, কোমরে বিছা ইত্যাদি নানা বৈশিষ্ট রবীন্দ্রনাথ প্রয়োগ করেছিলেন নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে। রবীন্দ্রনাথের সেই স্টাইল ভাবনা এখনো ফ্যাশন প্রিয় মানুষদের মাঝে মাঝে আলোড়িত করে। বিশেষ ক্ষণগুলোতে তাই মুখোরিত স্থানগুলোতে যখন আমরা রবীন্দ্রনাথের স্টাইলে কাউকে দেখতে পাই তখন খুব বেশি অবাক হই না। ২৫শে বৈশাখ এমন একটি যখন রবীন্দ্রনাথের ভালোবাসা পুরোপুরি ফিরিয়ে দিতে ইচ্ছে জাগে নিজেকে রবীন্দ্রনাথের রূপে প্রকাশ করতে। সেই ইচ্ছের প্রকাশই কখনো কখনো নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায় অপরূপ রূপে। বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ কত বড় স্বপ্ন বিলাসী ছিলেন!