গোলাম কিবরিয়া: অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার সঙ্গে গ্রামীণফোনের জড়িত থাকার বিষয়টিকে দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত বলে মন্তব্য করলেন টেলিনরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অন্য কোনো দেশে টেলিনরকে এ ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়নি। তাঁরা বলেন, বিশ্বের যেসব দেশে টেলিনরের কার্যক্রম চালু আছে, সবখানেই এ সংস্থাটি সে দেশের আইন ও নিয়ম মেনেই ব্যবসা করছে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হবে না।
উল্লেখ্য, ইন্টারনেটের মাধ্যমে টেলিফোনে কথা বলার প্রযুক্তি ভিওআইপি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন−বিটিআরসি গ্রামীণফোনকে মোট ৪১৮ কোটি টাকা জরিমানা করেছে।
গ্রাহক সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল ফোন কোম্পানি গ্রামীণফোনের সিংহভাগ অংশের মালিক টেলিনর পরিচালনা পরিষদের সদস্যরা দুই দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে গত সোমবার ঢাকায় আসেন। ওই দিন প্রথম আলোর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তাঁরা টেলিনর এবং গ্রামীণফোনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলাপ করেন। টেলিনরের শীর্ষ কর্মকর্তারা গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা ত্যাগ করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্রামীণফোনের শেয়ার প্রসঙ্গে টেলিনরের সঙ্গে গ্রামীণ টেলিকমের মতানৈক্যের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে টেলিনর পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান হ্যারল্ড নরভিক বলেন, নীতিগতভাবে গ্রামীণ টেলিকম এবং টেলিনরের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই। গ্রামীণফোনের এগিয়ে চলা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসার ক্ষেত্রে দুই পক্ষই একমত। তিনি বলেন, ‘গত মাসে অসলোতে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে গ্রামীণফোনের শেয়ারের বিষয়ে অত্যন্ত হূদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।’ তবে গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ড. ইউনুসের সঙ্গে আলোচনায় গ্রামীণফোনের মালিকানার অংশ ভাগাভাগির বিষয়টি নিষ্কপত্তি হয়েছে কি না−এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি হ্যারল্ড নরভিক।
টেলিনর কর্মকর্তারা এ প্রসঙ্গে বলেন, এ বিষয়টি আরও পরিষ্ককার করে বুঝতে হলে ১৯৯৬ সালে গ্রামীণফোনের প্রতিষ্ঠার সুচনালগ্নে ফিরে যেতে হবে। সে সময় এশিয়াতে টেলিনরের এটাই ছিল প্রথম বিনিয়োগ। এ বিনিয়োগের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে তখন গ্রামীণফোনের চুক্তিপত্রে বলা হয়েছিল, টেলিনর যদি মনে করে তবে তার শেয়ারের পরিমাণ কমিয়ে ৩৫ শতাংশের নিচে নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে ছয় বছর ব্যবসার পর টেলিনর এ দেশের বাজার সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পায় এবং সে অনুযায়ী মোবাইল ফোনসেবা সম্প্রসারণের জন্য পুনরায় বিনিয়োগ করে।
টেলিনর গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী জন ফ্রেডরিক বাকসাস এ প্রসঙ্গে বলেন, এ পর্যন্ত গ্রামীণফোন এ দেশে ১৭০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। এ বছরের শেষ নাগাদ এ বিনিয়োগ ১৮০ কোটি মার্কিন ডলারে দাঁড়াবে। গ্রামীণফোন এ পর্যন্ত শেয়ারহোল্ডারদের ১৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার লভ্যাংশ দিয়েছে।
ফ্রেডরিক বাকসাস বলেন, ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত গ্রামীণফোনে পুনর্বিনিয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয়। এ সময় বেসরকারি খাতে বিশ্বব্যাংকের ঋণদানকারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) গ্রামীণফোনে অর্থায়ন করে। তবে গ্রামীণফোনে টেলিনরের সিংহভাগ মালিকানা থাকতে হবে−এ শর্তেই এ দুটি সংস্থা অর্থায়ন করে। ফলে সে সময় এ কোম্পানির বেশির ভাগ শেয়ারের মালিক হিসেবে টেলিনর এতে বিনিয়োগ করে। এ দেশে দীর্ঘ মেয়াদে গ্রামীণফোনের ৫১ শতাংশের বেশি শেয়ার রাখার উদ্দেশ্য নিয়েই টেলিনর এই বিনিয়োগ করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
টেলিনরের এই বক্তব্যের সঙ্গে কারও ভিন্নমত থাকতে পারে, তবে গ্রামীণফোনের শেয়ারের ব্যাপারে এটাই টেলিনরের দৃষ্টিভঙ্গি বলে ওই সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
১৯৯৬ সালে যাত্রাকালে গ্রামীণফোনের ৫১ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিল টেলিনর। এ ছাড়া সে সময় গ্রামীণ টেলিকম ৩৫ শতাংশ, মারুবেনি করপোরেশন ৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গণফোন ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন ৪ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিল। পরে ২০০৪ সালের শেষভাগে মারুবেনি তাদের শেয়ার অপর তিনটি কোম্পানির নামে স্থানান্তর করে। সে বছরই গ্রামীণফোনের পরিচালনা পরিষদের অনুমোদন নিয়ে গণফোন তাদের শেয়ার টেলিনরকে হস্তান্তর করে। বর্তমানে টেলিনর গ্রামীণফোনের ৬২ শতাংশ এবং গ্রামীণ টেলিকম ৩৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক।
জন ফ্রেডরিক বাকসাস বলেন, গণফোন যখন শেয়ার হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়, সে সময় সুযোগ থাকা সত্ত্বেও গ্রামীণ টেলিকম সে শেয়ার কেনার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। কিন্তু অভিযোগ উঠেছিল, গণফোনের শেয়ার বিক্রির বিষয়টি গোপনে হয়েছে এবং গ্রামীণ টেলিকমকে সে ব্যাপারে কিছুই জানানো হয়নি−এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে জন ফ্রেডরিক বাকসাস বলেন, এ রকম কোনো অভিযোগ তিনি শোনেননি। তবে গ্রামীণফোনের নিয়ম অনুযায়ী যে কেউ তার শেয়ার বিক্রি করতে চাইলে তা অপর অংশীদারদের জানাতে হবে এবং তাদের কাছেই এই শেয়ার বিক্রি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম হয়নি।
টেলিনর কর্মকর্তারা বলেন, গ্রামীণফোন প্রাথমিক শেয়ার ছাড়ার ব্যাপারে সব প্রস্তুতি চুড়ান্ত করে এনেছে। খুব শিগগির বাজারে শেয়ার ছাড়া হবে। গ্রামীণফোনের ভবিষ্যতের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে গ্রামীণফোনের প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী আছে, যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংস্থাটিকে নানাভাবে সহায়তা দিয়ে আসছে। হাতে গোনা দু-একজন ছাড়া এদের সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। গ্রামীণফোনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করেন টেলিনর পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান হ্যারল্ড
নরভিক।
গ্রামীণফোনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যান্ডার্স ইয়ানসেন বলেন, গ্রামীণফোনের দুই কোটিরও বেশি গ্রাহককে উন্নত সেবা দেওয়ার জন্য সংস্থাটি সব সময়ই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে আসছে। মোবাইল ফোনে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে আগামী বছরের মধ্যেই থ্রি জি (তৃতীয় প্রজন্ন) প্রযুক্তি নিয়ে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এর ফলে গ্রামীণফোনের গ্রাহকেরা পকেটে ই-মেইল নিয়ে ঘুরতে পারবে। কয়েক বছর আগেও এটি ছিল কল্পনাতীত।
টেলিনর বিশ্বের নেতৃস্থানীয় এবং দ্রুত বর্ধনশীল মোবাইল যোগাযোগসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম। এশিয়া ও ইউরোপের ১২টি দেশে এর আছে ১৫ কোটি গ্রাহক, পাঁচ লাখ বিক্রয়কেন্দ্র, বিশ্বমানের অবকাঠামো এবং এর নেটওয়ার্কের আওতায় আছে ৬৫ কোটি মানুষ। বাংলাদেশে গ্রামীণফোন ছাড়া এশিয়ায় টেলিনরের অন্য অপারেটরগুলো হচ্ছে মালয়েশিয়ায় ডিজি, থাইল্যান্ডে ডিট্যাক এবং টেলিনর পাকিস্তান।