টেলি সামাদ। ছবি: প্রিয়.কম

‘অভিনয় ছাড়া বাঁচা আমার পক্ষে অসম্ভব’

একটা সময় এমন হয়েছিল, কৌতুক অভিনেতা মানেই টেলি সামাদ। বিকল্প কারো নাম ভাবার উপায় ছিল না।

মিঠু হালদার
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬ এপ্রিল ২০১৯, ১৯:০৬ আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০১৯, ১৯:০৬
প্রকাশিত: ০৬ এপ্রিল ২০১৯, ১৯:০৬ আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০১৯, ১৯:০৬


টেলি সামাদ। ছবি: প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) টেলি সামাদ—দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অভিনয় করেছেন অসংখ্য জনপ্রিয় চরিত্রে। তার অভিনয় দাগ কেটে রয়েছে দর্শক-মনে। একটা সময় এমন হয়েছিল, কৌতুক অভিনেতা মানেই টেলি সামাদ। বিকল্প কারো নাম ভাবার উপায় ছিল না। সমান তালে অভিনয় করেছেন চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে। ৬ এপ্রিল, শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে রাজধানীর পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এ গুণী অভিনেতা। ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে তিনি তার রাজবাজারের বাসায় মুখোমুখি হয়েছিলেন প্রিয়.কমের। তার সেই সাক্ষাৎকারটি প্রিয়.কমের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

প্রিয়.কম: যারা এখন মানসম্মত কমেডি করছে, তারা ফিল্মে আসছে না। পরিস্থিতিটা ঠিক এমন হলো কেন?

টেলি সামাদ: আমার এবং দিলদার—এর পর কেউ নতুন করে আমাদের অবস্থান দখলের চেষ্টাও করেনি। এখন আগের মতো সিনেমাও বানানো হয় না। আগে একটা সময় সিনেমাতে কমেডির ব্যবহার ছিল। এখন সেটা নেই বললেই চলে। বর্তমানে সিনেমাতে চিত্রনাট্যকার ও পরিচালকরা কমেডির সুযোগ দেন না।

প্রিয়.কম: আপনি এবং দিলদার—এর পরে বাংলা চলচ্চিত্রে সে ধরনের জাত কমেডিয়ান অভিনেতা দেখা যায়নি। যারা আসছেন, তারাও সেভাবে নিজেদের তুলে ধরতে পারছেন না; কেন?

টেলি সামাদ: অভিনয়টা আসলে মন দিয়ে উপভোগ করে করতে হবে। যদি শুধু চিন্তা থাকে যে টাকা আয় করব আর অভিনয় করব, তা হবে না। অভিনয়টাকে মনের মধ্যে লালন করতে হবে। আমি যখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি তখন শিক্ষক আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল আমি কী হতে চাই? তখন বলেছিলাম ত্রিকোণ গুণের অধিকারী অভিনেতা হতে চাই।

এখন আমার শিক্ষকরা যখন দেখে তারা আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলে, তুই যা বলেছিলি তা করে দেখিয়েছিস। কথা আর কাজে মিল রাখতে হবে। নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে। এ ছাড়া এখন যারা কৌতুক অভিনেতা হিসেবে অভিনয় করছে, তাদের একজনের অভিনয়ও পছন্দ হয় না। তাদের মধ্যে গুরুভক্তি নেই। কাউকে অনুকরণ করে লাভ নেই। তার চেয়ে বরং অনুসরণ করা উচিত।

কমেডি করা খুব কঠিন একটি কাজ। আমি খুব খুশি হতাম যদি সে ধরনের বা জাতের কোনো কমেডি অভিনেতা আসত, যে টেলিসামাদ বা দিলদারকে ছাড়িয়ে যাবে। বিষয়টা আসলে দুঃখজনক। কেউ সেভাবে আসতে পারেনি। এ ছাড়া এখন কমেডিনির্ভর ছবিও কম হয়।

প্রিয়.কম: আরেকটা সংকটের কথা প্রায়ই শোনা যায়, কমেডির নামে ভাঁড়ামি। আপনার কাছেও কি তাই মনে হয়?

টেলি সামাদ: কমেডি বলতে যা বোঝায় তা তো আর এখন হয় না। কে আসছে, কে যাচ্ছে, তাও জানি না। ছবির সংখ্যা কমে যাওয়ায় এ বিষয়টিও বলা যাচ্ছে না। কমেডি কী আর ভাঁড়ামি কী তা আগে জানতে হবে। ভাঁড়ামি দিয়ে বেশিদিন টিকে থাকা যাবে না।

প্রিয়.কম: একজন কমেডি অভিনেতা তৈরির ক্ষেত্রে নির্মাতার ভূমিকা ঠিক কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনি মনে করেন?

টেলি সামাদ: নির্মাতার ভূমিকার কথা কী বলব! প্রযোজক যা বলে পরিচালক তা-ই বানায়। তার আলাদা নিজস্ব কোনো সত্তা নেই; যার কারণে ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র থেকে কমেডির বিদায় ঘটছে। কমেডি তো ছবির গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। পরিচালকরা এখন যে কমেডির নামে ভাঁড়ামি শুরু করেছেন, এভাবে তারা বেশিদিন চলতে পারবেন না। দর্শক মন্ত্রমুগ্ব হয়ে আর কমেডি দেখবে না।

প্রিয়.কম: কমেডি অভিনেতা হিসেবেই দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সুনাম কুড়িয়েছেন। কিন্তু কখনো কি আপনার নায়ক হতে ইচ্ছে করেনি?

টেলি সামাদ: আমি ছোটবেলা থেকেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কমেডি চর্চা করতাম। আমার আশপাশে যারা থাকত তাদের হাসানোর জন্যে নানা অঙ্গভঙ্গি করতাম। যার কারণে এ বিষয়টি একটা সময় গিয়ে দর্শকদের হৃদয়ে গেঁথে গেছে।

আমি তো নায়ক হিসেবেও কিছু ছবিতে অভিনয় করেছিলাম। এরপর একটা সময় গিয়ে মনে হলো নায়কদের মধ্যে আবার দর্শক ভিন্নতা থাকে; ও একে পছন্দ করে, ওকে করে না। এর থেকে কমেডি অভিনেতা হলে সকলেই পছন্দ করবে।

প্রিয়.কম: যতটুকু জানি আপনার আসল নাম টেলি সামাদ না। কীভাবে আপনার নাম টেলি সামাদ হলো?

টেলি সামাদ: আমার কমেডি নিয়ে তখন টেলিভিশনসহ প্রায় সকল মাধ্যমেই বেশ আলোচনা চলছে। অনেক দিন পরে ভালো একজন কমেডি অভিনেতা পাওয়া গেছে। এরপর বিটিভি থেকে একদিন আমার বাসায় চিঠি এলো, আমাকে সেখানে যেতে হবে। সেখানে উপস্থিত হতেই বিটিভির ক্যামেরাম্যান মোস্তফা মামুন ভাই বললেন, তোর নাম আজ থেকে আবদুস সামাদ বাদ দিয়ে টেলি সামাদ। সেই থেকেই টেলি সামাদের জনপ্রিয়তার জয়রথ ছুটে চলছে।

প্রিয়.কম: অভিনেতার পাশাপাশি আপনি তো চারুশিল্পীও। আপনার আঁকা ছবিগুলোর একটি প্রদর্শনীর কথা ভাবছিলেন, সেটার কী অবস্থা?

টেলি সামাদ: যখন আমেরিকায় গিয়েছিলাম তখন অনেকগুলো রং আর তুলি কিনে নিয়ে এসেছি। আমেরিকাতে জল রং করা প্রায় ৩০টি ছবি আমার আত্মীয়স্বজনদের দিয়ে এসছি। এ ছাড়া আমার কাছে প্রায় ২০০ ছবি আছে, যেগুলো নিয়ে একটি প্রদর্শনীর কথা ভাবছিলাম কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে আর করা হয়ে ওঠেনি।সুস্থ হলেই আশা করি প্রদর্শনী করতে পারব।

প্রিয়.কম: অনেক দিন হলো পর্দায় আপনার দেখা নেই। কষ্ট হয় না...

টেলি সামাদ: আমি তো অভিনয়পাগল মানুষ। অভিনয়ের জন্য মন সবসময় টানে। কিন্তু বললেই তো আর ফিরতে পারি না। অনেক প্রস্তাব আসে কিন্তু শারীরিক অবস্থার কারণে করতে পারি না। তবে আশা করি মাস খানেকের মধ্যে ফিরব।

বাংলাদেশের মানুষের কাছে দোয়া চাই, যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে আবার অভিনয়ে ফিরতে পারি। অভিনয় ছাড়া বাঁচা আমার পক্ষে অসম্ভব। আমি শারীরিকভাবে ১৬ ভাগের মধ্যে ১৪ ভাগ সুস্থ।

দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন টেলি সামাদ

গত ৪ এপ্রিল টেলিসামাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে চলতি বছরের শুরুতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) বেশ কিছুদিন ভর্তি ছিলেন তিনি। কিছুটা সুস্থ হয়ে সম্প্রতি বাসায় ফেরেন। সে সময় তিনি ‘স্বাভাবিক জীবনে’ ফিরতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন চিকিৎসকরা।

তারও আগে গত ৪ ডিসেম্বর বুকে ইনফেকশনের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে টেলি সামাদ প্রথমে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। টানা দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে সেখানে তার চিকিৎসা চলে। এরপর টেলি সামাদকে ভর্তি করা হয় বিএসএমএমইউতে। শুরুতে কেবিনে রাখা হয়, পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়।

এর আগে ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে টেলি সামাদের বাইপাস সার্জারি করা হয়। এরপর ২০১৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে দেশে ফেরেন। দেশে আসার পর অক্টোবর ও নভেম্বরে দুই দফা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। গত বছরের ২০ অক্টোবর জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল তার বাম পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে।

কমেডিয়ান হিসেবে বেশির ভাগ দর্শক টেলি সামাদকে চিনলেও প্রায় ৪০টির বেশি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন তিনি। ‘মনা পাগলা’ ছবির সংগীত পরিচালনাও করেছেন তিনি।

১৯৭৩ সালে ‘কার বউ’ দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় টেলি সামাদের। গত চার দশকে ৬০০ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। সর্বশেষ অভিনীত চলচ্চিত্র ছিল ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জিরো ডিগ্রি’। ১৯৪৫ সালের ৮ জানুয়ারি ঢাকার বিক্রমপুরে জন্মগ্রহণ করেন এই অভিনয়শিল্পী।

মুন্সীগঞ্জ শহরের উপকণ্ঠ নয়াগাঁও এলাকার সন্তান টেলি সামাদ। প্রকৃত নাম আবদুস সামাদ থেকে পরে টেলি সামাদ নামেই পর্দায় পরিচিতি গড়ে ওঠে তার। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা টেলি সামাদের বড় ভাই বিখ্যাত চারুশিল্পী আবদুল হাইয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পড়াশোনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায়।

অসুস্থ টেলি সামাদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়ে তার চিকিৎসায় উদ্যোগী হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালে এই অভিনেতার হাতে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র তুলে দিয়েছিলেন।

প্রিয় বিনোদন/আজাদ চৌধুরী