পাঠাওয়ের লোগো

পাঠাও ফিরে পাবে তার জৌলুস—এই প্রত্যাশা

আশা করি, পাঠাও আবার তার জৌলুস ফিরে পাবে, ছড়িয়ে যাবে বিশ্বের নানা প্রান্তে।

রাকিবুল হাসান
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৮ জুন ২০১৯, ১৫:০৯ আপডেট: ২৮ জুন ২০১৯, ১৫:১৮
প্রকাশিত: ২৮ জুন ২০১৯, ১৫:০৯ আপডেট: ২৮ জুন ২০১৯, ১৫:১৮


পাঠাওয়ের লোগো

২৫ জুন। বিকেল পাঁচটা। চারটি ফোন আসে আমার নম্বরে। ব্যস্ত থাকায় ফোনটি তাৎক্ষণিক ধরতে ব্যর্থ হই। এর মধ্যে অফিস থেকেও কল দেওয়া হয়। পরে অফিসে কল ব্যাক করলে যে সংবাদ শুনতে পাই, তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না আমি। অফিস থেকে আমাকে জানানো হয়, পাঠাও থেকে ৩০০ কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে—বিষয়টি খোঁজ নেওয়ার জন্য।

এতটুকুই তথ্য ছিল আমার কাছে। এই তথ্য নিয়ে প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রবেশ করে চুলচেরা বিশ্লেষণ চালাই। না, কেউ কোনো শব্দ পর্যন্ত লেখেনি।

এবার সোর্সের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়। একজন সোর্স জানান, তিনি বাইরে রয়েছেন। এই মুহূর্তে এই বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না। তবে অফিসে গণ্ডগোল জাতীয় কিছু হয়েছে এইটা শুনেছেন।

‘গণ্ডগোল জাতীয় কিছু হয়েছে’, এই শব্দটি আমার মনে আরও চাপ সৃষ্টি করে। অর্থাৎ পাঠাও অফিসে কিছু-না-কিছু ঘটেছে। দ্বিতীয় সোর্সও আমাকে হালকা নিশ্চিত করে, ঘটনা ঘটেছে। তবে সংখ্যা নিশ্চিত নয়।

ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ৬টা ছুইছুই। এবার পাঠাওয়ের সংশ্লিষ্টদের ফোনে সরাসরি জিজ্ঞেস করি। একজন জানান, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। দ্বিতীয়জন বলেন, ছাঁটাই নয়, অনেকে চাকরি থেকে রিজাইন দিয়েছেন। এবার নিশ্চিত হই ঘটনা ঘটেছে।

ফোন দেই পাঠাওয়ের উচ্চপদস্থ পাঁচজন কর্মকর্তাকে। তারা বিষয়টি এরিয়ে যান। হঠাৎ করে পেয়ে যাই পূর্বপরিচিত এক ভাইকে। তিনি আমাকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। একসঙ্গে এত সহকর্মী হারানোয় নিজেই ভেঙে পড়েছেন, তার সঙ্গে কথা বলেই বুঝতে পারি।

তার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে এবং অপর আরেকটি সোর্সের কাছে পাওয়া একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে সন্ধ্যা ৭টায় একদিনে ‘৩ শতাধিক’ কর্মী ছাঁটাই করল পাঠাও শিরোনামে প্রতিবেদন করি। ঘটনাটি তাৎক্ষণিক ভাইরাল হয়ে যায়। দেশের জনপ্রিয় এই স্টার্টআপটি, যেটি কিনা বিদেশের মাটিতে দেশকে রিপ্রেজেন্ট করে, তার এমন হাল মেনে নিতে কষ্ট হয় অনেকের।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাচ্ছিল্যমাখা হাসির আওয়াজও শুনেছি। কারণ তাদের ধারণাই ছিল না পাঠাওয়ে এত কর্মী কাজ করেন। অনেকে তো নিউজ শেয়ার দিয়ে লিখেছেন, ‘ফেক নিউজ’। অনেকেই ফোন দিলেন ঘটনা সত্য কিনা। আমি তাদের জানালাম, ঘটনা সত্য।

যাই হোক, এরপর ওই দিন ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারসহ আরও কিছু সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

২৬ জুন। কর্মী ছাঁটাইয়ের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জানায় পাঠাও। বিবৃতিতে পাঠাও জানায়, অনাকাঙ্খিত ব্যয় বৃদ্ধি রোধে এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে কর্মী ছাঁটাই করেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রযুক্তিনির্ভর, সহজলভ্য, বিরতিহীন ও গ্রাহকবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে তারা নিজেদের প্রস্তুত করছে।

এবার ঘটা করে দেশের অন্যান্য সংবাদমাধ্যমগুলো সংবাদটি ছাপায়। এরই মধ্যে ডেইলি স্টার আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, নতুন বিনিয়োগ আনতে ব্যর্থ হওয়ায় আগের বিনিয়োগকারীদের রোষানলে পড়তে হয়েছিল পাঠাওয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হুসেইন মো. ইলিয়াসকে। এমনকি আগের বিনিয়োগকারীরা দেশীয় এই রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানটির এই সহ-প্রতিষ্ঠাতাকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

ডেইলি স্টারের বরাত দিয়ে বিনিয়োগকারীদের চাপের মুখে পাঠাওয়ের সিইও শিরোনামে প্রতিবেদনটি আমরাও করি। এ ছাড়া আমার কিছু সোর্সও আর্থিক সংকটের বিষয়টি আমাকে জানিয়েছিলেন।

এই সময়ের মধ্যে (২৫ জুন থেকে ২৬ জুন) ভুক্তভোগীদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার আলাপ হয় আমার। অনেকেই জানান, কীভাবে তাদের অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তারা জানান, অফিসে প্রবেশ করা মাত্রই তাদের আলাদা করে নিয়ে স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অব্যাহতি নিতে বাধ্য করা হয়েছে। জোরপূর্বক অব্যাহতি নিতে বাধ্য করার কারণ হিসেবে পর্যাপ্ত ফান্ডের অভাব, নেতৃত্বের অভাব ও অভিজ্ঞতার অভাবকে সামনে আনা হয়েছে।

ভুক্তভোগীরা এমনও বলেছেন, সবকিছু নিয়ে নেওয়ার পর তাদের অফিস ভবনের টয়লেট পর্যন্ত ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি। তারা কিছুই বলতে পারেননি। অফিসের ভেতর নিরাপত্তা কর্মীর সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। অন্য কর্মীদের সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতে দেওয়া হয়নি।

আমার সঙ্গে কয়েকজন ভুক্তভোগীর কথা হয়েছে। এদের মধ্যে একজন জানিয়েছেন, তিনি সম্প্রতি বিয়ে করেছেন। কোনো কারণ ছাড়াই হুট করে চাকরি হারিয়ে এখন অনেকটা দিশেহারা তিনি। আরেকজন জানিয়েছেন, সামনের মাসে তার সন্তান পৃথিবীর আলো দেখতে যাচ্ছে। এমন সময়ই চাকরি থেকে জোরপূর্বক অব্যাহতি নিতে বাধ্য করা হলো। এমন ভুক্তভোগীর সংখ্যা অনেক।

২৬ জুন কিছু সংবাদমাধ্যম মুখরোচক কিছু সংবাদও প্রকাশ করে। আবার দু-একজনকে প্রকাশিত কিছু সংবাদ আনপাবলিশড করতেও হয়।

২৭ জুন। জানতে পারি একমাসের বেতন (চলতি মাসের) দেওয়ার জন্য তৈরি পাঠাও। অন্যান্য মাসের বেতনের কি হবে এখনো জানা যায়নি।

একটি সোর্স জানিয়েছে, পাঠাও তার কর্মীদের পাওনা বুঝিয়ে দেবে। তবে কত মাসের তা জানা সম্ভব হয়নি (শ্রম আইন অনুযায়ী, চার মাসের পাওনা দেওয়ার কথা)।

এসব ছাড়াও জানতে পারি, ভেতরে বেশ কয়েকটি মিটিং হয়েছে। একটি মিটিংয়ে কর্মীদের বলে দেওয়া হয়েছে, পাঠাওয়ের জনসংযোগ বিভাগ এবং পিআর প্রতিষ্ঠান ব্যাতিত কেউ যেন মিডিয়ার সঙ্গে ভুল করেও কথা না বলেন।

আরেকটি সোর্স জানিয়েছে, পাঠাওয়ের সিইও মেইলে বর্তমান কর্মীদের শান্ত থাকার জন্য বলেছেন। সংবাদমাধ্যমে প্রাকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বিভ্রান্ত হতে মানা করেছেন।

সবশেষ একটি সোর্স জানিয়েছে, বাইরের দেশে বাংলাদেশকে পরিচয় করে দেওয়া এবং দেশের অসংখ্য যুবকদের কর্মসংস্থান তৈরি করে দেওয়া এই প্ল্যাটফর্মটির পিছিয়ে পড়ার কারণ মাত্র সিইও ইলিয়াসই নন। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সহ-প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বও।

আশা করি, পাঠাও আবার তার জৌলুস ফিরে পাবে, ছড়িয়ে যাবে বিশ্বের নানা প্রান্তে।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]