সঞ্জয় দত্ত। ছবি: সংগৃহীত

নায়ক না খলনায়ক?

সুনীল ও নার্গিস দম্পত্তির আদরের ছোট ছেলে সঞ্জয়। বাবা-মা দুজনই অভিনয়শিল্পী হওয়ায়, বলিউডি আবহেই বড় হয়ে উঠছিলেন তিনি।

আশরাফ ইসলাম
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০১৯, ১৬:২৮ আপডেট: ১১ জুলাই ২০১৯, ১৬:২৮
প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০১৯, ১৬:২৮ আপডেট: ১১ জুলাই ২০১৯, ১৬:২৮


সঞ্জয় দত্ত। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) ১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ, শুক্রবার একের পর এক বোমা বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে ভারতের মুম্বাই নগরী। ভয়াবহ ওই সিরিজ বোমা হামলায় কমপক্ষে ২৫৭ জন নিহত ও প্রায় সহস্রাধিক ব্যক্তি আহত হন। ওই হামলার সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও ভারতে অবৈধ মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে তোলার দায়ে প্রকাশিত দেশটির মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি তালিকায় তখন উঠে আসে হামলার মূল হোতা দাউদ ইব্রাহিমের নাম। এ ছাড়া যে বিষয়টি সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল, তা হলো বলিউডের আলো ঝলমলে দুনিয়ার সঙ্গে অপরাধজগতের সম্পৃক্ততার খবর। আর এসব কিছুই সাধারণ মানুষের নজরে এসেছে মাত্র একজন মানুষকে কেন্দ্র করে, তিনি হলেন ‘খলনায়ক’ সঞ্জয় দত্ত।

২৯ জুলাই ১৯৫৯ সালে সঞ্জয় দত্তের জন্ম হয়। ভালোবেসে ভক্তরা তাকে ডাকেন সঞ্জুবাবা। সঞ্জয় অভিনয়শিল্পী দম্পতি সুনীল দত্ত ও নার্গিস দত্তের সন্তান। ১৯৮১ সালে চলচ্চিত্রে অভিষেকের পর তিনি ১৮০-এর অধিক হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। যদিও দত্ত প্রণয়ধর্মী থেকে শুরু করে হাস্যরসাত্মক চলচ্চিত্রে শ্রেষ্ঠাংশে অভিনয় করে সফলতা অর্জন করেছেন। তবে নাট্যধর্মী ও মারপিঠধর্মী চলচ্চিত্রে গ্যাংস্টার, গুন্ডা ও পুলিশ অফিসার চরিত্রে অভিনয় করেও তিনি সমাদৃত হয়েছেন। এইসব চরিত্রে তার কাজের জন্য ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও দর্শক তাকে ‘ডেডলি দত্ত’ বলে অভিহিত করে।

বাবা ও মায়ের সঙ্গে সঞ্জয় দত্ত। ছবি: সংগৃহীত

সুনীল ও নার্গিস দম্পত্তির আদরের ছোট ছেলে সঞ্জয়। বাবা-মা দুজনই অভিনয়শিল্পী হওয়ায়, বলিউডি আবহেই বড় হয়ে উঠছিলেন তিনি। আর তাই যৌবনের প্রথম দিকেই অভিনেত্রী টিনা মুনিমের প্রেমে পড়েন। কিন্তু সেই প্রেমে ব্যর্থ হলে জীবনে প্রথমবারের মতো আবেগপ্রবণ সঞ্জু বেশ বড়সড় এক ধাক্কা খান। ওদিকে বলিউডে ছেলের অভিনয় ক্যারিয়ার শুরুর সময়েই ক্যানসারে মৃত্যুবরণ করেন নার্গিস। একদিকে ব্যর্থ প্রেমের যন্ত্রণা, অন্যদিকে মায়ের মৃত্যুশোক- সবমিলিয়ে একেবারে ভেঙে পড়েন সঞ্জয়। সব যন্ত্রণা ভুলে থাকতে মা-বাবার এই আদরের ছেলে ডুবে যান নেশার অতল অন্ধকারে।

নেশায় বুঁদ ছেলের সঙ্গে সে সময় বেশ দূরত্ব তৈরি হয় বাবা সুনীলের। সবকিছু মিলিয়ে সঞ্জয় জড়িয়ে পড়েন অপরাধজগতে। আর মুম্বাই মাফিয়া জগতের সবচেয়ে বড় ত্রাস দাউদ ইব্রাহিম সঞ্জয়ের সে সময়টাকেই কাজে লাগান।

সঞ্জয় ১৯৯১ সালে একটি সিনেমার শুটিংয়ে দুবাই যান। দাউদ ইব্রাহিমের ছোট ভাই আনিস সিনেমাটির সেট পরিদর্শনে আসেন। সে সময় আনিস বড় ভাই দাউদের নির্দেশে সঞ্জয়ের সঙ্গে দেখা করেন। সেই থেকেই সঞ্জয়ের সঙ্গে দাউদের সম্পর্ক গড়ে উঠে। ১৯৯২ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সঞ্জয়কে অপরাধ জগতের আরও কাছাকাছি নিয়ে যায়।

ওই সময় মাফিয়া ঘেঁষা আরও কয়েকজন বলিউড সেলিব্রেটির চাইতেও সঞ্জয়কে বেশি মূল্যায়ন করা হয়। সঞ্জয়কে ঘিরে গুঞ্জন উঠতে শুরু হয় যে তিনি বলিউডে আন্ডার-ওয়ার্ল্ডের অঘোষিত প্রতিনিধি।

হাতকড়া পরা অবস্থায় সঞ্জয় দত্ত। ছবি: সংগৃহীত

এরপর ১৯৯৩ সালের সিরিজ বোমা হামলায় সঞ্জয়ের মদদ ছিল বলে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পারে। আর এসবের পেছনে দাউদ ইব্রাহিমের হাত ছিল বলে জানা যায়। সঞ্জয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে তিনি ওই সময় দাউদের ভাই আনিসের কাছ থেকে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করেছিলেন। আদালতে প্রমাণিত হয় যে সঞ্জয় আনিস ইব্রাহিমের সাহায্যে ৩টি স্বয়ংক্রিয় একে-৪৭ রাইফেল ও ২০টির অধিক হ্যান্ড গ্রেনেড সংগ্রহ করেছিলেন। তবে তার বিপক্ষে আনা অন্য অভিযোগ, যেমন এইসব অস্ত্র দাঙ্গায় ব্যবহার করা হয়েছে- এমন কোনো প্রমাণ গোয়েন্দা সংস্থা দিতে পারেনি।

বাবা সুনীল দত্ত যখন জানতে পারেন ছেলেকে পুলিশ হন্য হয়ে খুঁজছে, তখন তিনি সে সময়ের পুলিশ কমিশনারকে জানিয়ে দেন সঞ্জয় মরিশাস থেকে সেই রাতেই ফিরছেন। পুলিশের জেরার মুখে সবকিছু স্বীকার করেন সঞ্জয়।

তেহেলেকা ম্যাগাজিনের করা তদন্তে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি এসেছে তা হলো ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর ভারতের মুম্বাই রাজ্যে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যার্থে সুনীল দত্ত সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। এতে উগ্রপন্থি হিন্দুরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সুনীল দত্তকে বেশ কয়েকবার আক্রমণ করার চেষ্টাও করে তারা। মুসলিমপ্রিয় স্বভাবের কারণে সে সময় সুনীল দত্ত রাজনৈতিকভাবে বেশ দুর্বল হয়ে পরে। ওদিকে, উগ্র হিন্দুবাদীদের টার্গেটে পরিণত হওয়া দত্ত পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টিও পড়ে যাচ্ছিল হুমকির মুখে। এ অবস্থায় সঞ্জয় মনে করেছিলেন, হয়তো তার বাবা শেষপর্যন্ত পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবেন না। আর এ কারণেই নাকি, অবৈধ পথে আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহে অগ্রসর হন সঞ্জয়।

পরবর্তী সময়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি পেলেও সহিংস ওই ঘটনায় ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্র বাড়িতে রাখার দায়ে করা মামলায় ২০১৩ সালের ২১ মার্চ সঞ্জয়কে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন ভারতের সর্বোচ্চ আদালত। তবে বিচারে দোষী প্রমাণিত হওয়ার আগেই ১৯৯৬ সালে ১৮ মাস জেলে থাকায় ওই পর্যায়ে তার ৪২ মাসের কারাবাসের নির্দেশ দেয় আদালত। 

২০১৬ সালে সাজা শেষে মুক্তি পান সঞ্জয়। ছবি: সংগৃহীত

মুম্বাইয়ের ইয়েরাওয়ারা কেন্দ্রীয় কারাগারের ১৬৬৫৬ নম্বরের কয়েদি ছিলেন সঞ্জয়। সেখানে কাগজের ফাইল বানানো আর বাঁধাইয়ের কাজ করেছেন তিনি। ওই কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক হিসেবে তিনি দিনে ২৫ থেকে ৪০ রুপি পেতেন।

কারাবাস শেষে অবশেষে ২০১৬ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে কারাগার থেকে মুক্তি পায় সঞ্জয়। সঞ্জয়ের জীবনের এত দিক দেখে বলিউডের নির্মাতা রাজ কুমার হিরানি সঞ্জয়ের জীবনের গল্প নিয়ে বায়োপিক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। সঞ্জয় দত্তের জীবনের গল্প নিয়ে তৈরি ‘সঞ্জু’ বায়োপিকটি মুক্তি পায় ২০১৮ সালের ২৮ জুন। ওই বায়োপিকে সঞ্জয়ের চরিত্রে দেখা যায় রণবীর কাপুরকে। বায়োপিক থেকে সঞ্জয়ের জীবনের আরও কিছু অজানা তথ্য সবার সামনে আসে। 

সঞ্জয়ের বায়োপিক ‘সঞ্জু’-তে অভিনয় করেন রণবীর কাপুর। ছবি: সংগৃহীত

বায়োপিকে জানা যায়, সঞ্জয় দত্তের ৩০৮ জন প্রেমিকা ছিল। বায়োপিক দেখানো হয়, কলেজে যখন নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতেন সেই সময়েই সঞ্জু মনস্থির করেন, তিনি অভিনেতাই হবেন। এক বছরের জন্য ডুবে গিয়েছিলেন অভিনয়ের কঠিন প্রশিক্ষণে। তবে অভিনয়ের ক্যারিয়ারের থেকেও সেসময়ে সঞ্জয়ের প্রেমিকার তালিকা নিয়েই হৈ চৈ হতো সবচেয়ে বেশি। মান্যতার চরিত্রে দিয়া মির্জা অভিনয় করেন।

চলুন জেনে নেওয়া যাক সঞ্জয়ের প্রেমিকার তালিকা-

‘রকি’ সিনেমার নবাগত টিনা মুনিমের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে যান সঞ্জয় দত্ত। তবে নেশা আর অতিরিক্ত নজরদারির অজুহাত এনে দুই বছরের মাথায়ই সঞ্জুর হৃদয় ভেঙে দিয়েছিলেন টিনা। যদিও সম্পর্ক বিচ্ছেদের পরও সঞ্জয় নজর রাখতেন টিনার ওপর।

টিনার সঙ্গে বিচ্ছেদের পর বলিউডের উদীয়মান তারকা কিমি কাটকারের সঙ্গে প্রেমে জড়ান সঞ্জয়। কিমি তখন বলিউডের তার ‘বোল্ড’ ক্যারেক্টারে পর্দায় আসার জন্য দারুণ প্রশংসিত ছিলেন। তবে এবারও প্রেম বেশিদিন টিকেনি সঞ্জয়ের জীবনে। বিচ্ছেদ ঘটে আবারও। শোনা যায় এবারও কালপ্রিট সেই সর্বনাশা মাদক।

রিচা শর্মার সঙ্গে সঞ্জয়। ছকি: সংগৃহীত

ক্যারিয়ারের সুসময়ে দেখা হয়েছিল বলিউড নবাগতা রিচা শর্মার সঙ্গে। ভালো লাগা থেকে প্রেম। এরপর এক বছরের মাথায়ই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ১৯৮৭ সালে বিয়ে করেন সঞ্জয়-রিচা। ১৯৮৮ সালে রিচার কোল জুড়ে আসে সঞ্জয়ের প্রথম সন্তান ত্রিশালা। তবে ভাগ্য খারাপ ছিল আবারও। ব্রেন ক্যানসারে আক্রান্ত হন রিচা। ক্যারিয়ার আর পরিবার দুটোতেই তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠেন সঞ্জু।

এমন খারাপ সময়েই ‘সাজান’ সিনেমার রূপালি পর্দার দারুণ জুটি সঞ্জয়-মাধুরী বাস্তব জীবনেও প্রেমের সূচনা ঘটান। এর সবকিছুই ঘটেছিল যখন রিচা নিউইয়র্কে একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠছিলেন তখন। মাধুরীর সঙ্গে প্রেমের ফলশ্রুতিতেই সৃষ্টি হয় পারিবারিক কলহ। ফলাফল রিচা শর্মার সঙ্গে বিচ্ছেদ। নিজের মেয়েকে কাছে রাখার অধিকারও হারান সঞ্জু।

১৯৯৭ সালে রিচা শর্মার মৃত্যুর বেশ আগেই বিচ্ছেদ ঘটেছিল মাধুরীর সঙ্গেও। কারণ ছিল অস্ত্র মামলায় সঞ্জয়ের জড়িয়ে পড়া। আর তাই তার নতুন প্রেমিকার তালিকায় নাম লেখালেন মডেল রিয়া পিল্লাই। ১৯৯৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে সঞ্জয় রিয়াকে প্রেম নিবেদন জানিয়ে চুপিচুপি মন্দিরের গিয়ে শুভ কাজটি সেরে নেন। এমনকি বাবা সুনীল এই বিয়ের ঘটনা জেনেছিলেন পত্রিকা মারফত। পুত্রের মাথার ওপর বরাবরই আশীর্বাদ ছিল সুনীলের। তবে এই বিয়েও বেশিদিন টেকেনি। রিয়ার পরকীয়ার ঘটনার জেরে অফিশিয়াল ডিভোর্স ছাড়াই কয়েক বছর দুজন আলাদা থাকেন এবং আনুষ্ঠানিক ভাবে দুজনের সম্পর্কের ইতি টানেন ২০০৫ সালে।

সঞ্জয় ও তার বর্তমান স্ত্রী মান্যতা। ছবি: সংগৃহীত

রিচার সঙ্গে সম্পর্ক টানাপোড়েনের সময় সঞ্জয়ের জীবনে এসেছিল মান্যতাও। পরে তৃতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন সঞ্জয়। ২০০৮ এ ধুমধাম করেই বিয়ে হয় সঞ্জয়-মান্যতার। ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর সঞ্জয় আর মান্যতা জমজ ছেলেমেয়ের পিতামাতা হন। মান্যতার সঙ্গে দাম্পত্য জীবন বেশ ভালোই চলছে এখন। আর প্রথম সন্তান ত্রিশালার সঙ্গেও বেশ ভালো সম্পর্ক সঞ্জুর।

বলিউডের অনেক হিট সিনেমার প্রধান অভিনেতা ছিলেন সঞ্জয়। সঞ্জয় অ্যাকশন, রোমান্টিক, কমেডি সব ধরনের সিনেমাতেই অভিনয় করে সাফল্য অর্জন করেছেন। সাফল্যের খাতায় যেমন রয়েছে ‘খলনায়ক’, ‘বাস্তব’, ‘শুটআউট অ্যাট লোখান্ডওয়ালা’, ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’, ‘পরিণীতা’, ‘লাগে রাহো মুন্নাভাই’, ‘অগ্নিপথ’-এর মতো সিনেমা, তেমনি রয়েছে ফিল্মফেয়ারসহ ভারতের নামিদামি সব অ্যাওয়ার্ডের সেরা অভিনেতার পুরস্কার।

বিভিন্ন সময় সঞ্জয়। ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছর সঞ্জয় অভিনীত নতুন সিনেমা আশুতোষ গোয়ারিকরের ‘পানিপথ’ মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে। এ ছড়া ২০২০ সালে ‘শামশেরা’ নামের আরেকটি সিনেমা মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে।  

প্রিয় বিনোদন/রুহুল