পাটকল শ্রমিক জাহালম (বামে) ও দুদকের লোগো। ছবি: প্রিয়.কম

জাহালম কাণ্ড: অবশেষে দুদকের দায় স্বীকার

প্রতিবেদন দাখিলের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বলে, সঠিক ঘটনা তথা সত্য উদঘাটন করে আদালতের কাছে উপস্থাপন করা তদন্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব।

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০১৯, ২১:৫০ আপডেট: ১১ জুলাই ২০১৯, ২১:৫০
প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০১৯, ২১:৫০ আপডেট: ১১ জুলাই ২০১৯, ২১:৫০


পাটকল শ্রমিক জাহালম (বামে) ও দুদকের লোগো। ছবি: প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদকের) দায়ের করা মামলায় প্রায় তিন বছর বিনাদোষে কারাগারে ছিলেন টাঙ্গাইলের পাটকল শ্রমিক জাহালম। জাহালমকে কারাগারে রেখে দুদক ভুল করেছে এবং এর দায় অস্বীকার করতে পারে না মর্মে  হাইকোর্টে একটি প্রতিবেদনও দাখিল করেছে এই সংস্থাটি। দীর্ঘ সাত মাসের মাথায় হাইকোর্টে দায় স্বীকার করলো দুর্নীতি দমনে কাজ করা দুদক।

১১ জুলাই, বৃহস্পতিবার দুপুরে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে দুদকের পক্ষ থেকে এ প্রতিবেদনটি দাখিল করা হয়।

দায় স্বীকার করে দুদকের প্রতিবেদন দাখিল

আজ দুপুরের দিকে দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান আদালতে ২৪ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে দুদক দায় স্বীকার করে বলে, ‘তদন্ত কর্মকর্তা, সরকারের পিপির সঙ্গে সমন্বয়হীনতার অভাবে এ ভুলের ঘটনা ঘটেছে।

এ ছাড়া দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভুলে জাহালমকে আবু সালেক হিসেবে শনাক্ত করার ঘটনাটি ঘটে। আর দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ভুল পথে চালিত করতে ভূমিকা রেখেছেন ব্র্যাক ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংকের কর্মকর্তারা এবং অ্যাকাউন্টের (ব্যাংক হিসাব) ভুয়া ব্যক্তিকে পরিচয় দানকারীরা। পাটকল শ্রমিক জাহালমের বিনা অপরাধে জেল খাটার ঘটনায় দুদকের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এমন তথ্য এসেছে।

প্রতিবেদন দাখিলের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বলে, সঠিক ঘটনা তথা সত্য উদঘাটন করে আদালতের কাছে উপস্থাপন করা তদন্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তা বা অন্য কারও ওপর এই দায়িত্ব অর্পণের কোনো সুযোগ নেই।

এ মামলার পরবর্তী শুনানি মঙ্গলবার

দুদকের আইনজীবীর সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী মঙ্গলবার এ মামলার শুনানির জন্য দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। বেলা ২টায় শুনানি করা হবে। আদালতে আজ রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ বি এম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার। অপরদিক ব্র্যাক ব্যাংকের পক্ষে শুনানি করেন আসাদুজ্জামান।

জাহালমকে ক্ষতিপূরণ দিতে হাইকোর্টের রুল

গত ৩০ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে ‘স্যার, আমি জাহালম, সালেক না’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি সেদিন বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাশ গুপ্ত। শুনানি নিয়ে আদালত জাহালমের আটকাদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে স্বতঃপ্রণোদিত রুল জারি করেন।

একই সঙ্গে নিরীহ জাহালমের গ্রেফতারের ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে দুদক চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি, মামলার বাদী দুদক কর্মকর্তা, স্বরাষ্ট্রসচিবের প্রতিনিধি ও আইনসচিবের প্রতিনিধিকে ৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় সশরীরে আদালতে হাজির থাকার নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।

জাহালমকে নিয়ে করা পত্রিকার প্রতিবেদনে যা ছিলো

দৈনিক প্রথমআলো পত্রিকায় ‘৩৩ মামলায় ভুল আসামি জেলে’, ‘স্যার, আমি জাহালম, সালেক না…’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আবু সালেকের (মূল অপরাধী) বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির ৩৩টি মামলা হয়েছে। কিন্তু আবু সালেকের বদলে জেল খাটছেন জাহালম। তিনি পেশায় পাটকল শ্রমিক, বাড়ি টাঙ্গাইলে।

যেভাবে মুক্তি পেলেন জাহালম

গত ৩ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে শুনানি নিয়ে সোনালী ব্যাংকের অর্থ জালিয়াতির অভিযোগে দুদকের করা সব মামলা থেকে নিরীহ জাহালমকে অব্যাহতি দিয়ে কারামুক্তির নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। আদালত বলে, ‘এক নির্দোষ লোককে এক মিনিটও কারাগারে রাখার পক্ষে আমরা না।’ এর পরের দিন কারামুক্ত হন জাহালম। একই সঙ্গে হাইকোর্ট এই ভুল তদন্তের সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করার নির্দেশও দেন। তা না হলে আদালত এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে বলে জানানো হয়।

কারামুক্তির পর ভাইকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছেন শাহানূর। ছবি: সংগৃহীত

জাহালমের ঘটনার শুরু যেভাবে

মূলত দুদকের একটি চিঠির মাধ্যমে ঘটনার শুরু। জাহালমের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঠিকানায় দুদকের একটি চিঠি যায়। সেই চিঠিতে ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় জাহালমকে হাজির হতে বলে দুদক। জাহালম তখন নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলে শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দুদকের ওই চিঠিতে বলা হয়, ভুয়া ভাউচার তৈরি করে সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত আবু সালেক নামের এক লোক, যার সোনালী ব্যাংক ক্যান্টনমেন্ট শাখায় হিসাব রয়েছে।

কিন্তু আবু সালেকের ১০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ভুয়া ঠিকানাগুলোর একটিতেও জাহালমের গ্রামের বাড়ির কথা নেই। রয়েছে পাশের আরেকটি গ্রামের একটি ভুয়া ঠিকানা। আর এটিই কাল হয়ে দাঁড়ায় জাহালমের জীবনে। নির্ধারিত দিনে দুই ভাই হাজির হন দুদকের ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। তখন জাহালম বুকে হাত দিয়ে বলেছিলেন, ‘স্যার, আমি জাহালম। আবু সালেক না। আমি নির্দোষ।’ দুদকে হাজিরা দেওয়ার পর জাহালম চলে যান নরসিংদীর জুট মিলে তার কর্মস্থলে। এর দুই বছর পর টাঙ্গাইলের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে জাহালমের খোঁজ করতে থাকে পুলিশ। সেখান না পেয়ে ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর ঘোড়াশালের মিল থেকে জাহালমকে আটক করা হয়।

আর তখন জাহালম জানতে পারেন, তার নামে দুদক ৩৩টি মামলা করেছে। ২৬টিতে অভিযোগপত্র দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে, তিনি অনেক বড় অপরাধী। পুলিশের কাছেও জাহালম একই কথা বলেন, ‘স্যার, আমি জাহালম। আবু সালেক না। আমি নির্দোষ।’ তখন কেউ শোনেনি তার আকুতি। তাকে পাঠানো হয় কারাগারে। এরই মধ্যে কারাগারে কেটে যায় আরও দুটি বছর। জাহালমকে যতবার আদালতে হাজির করা হয়, ততবারই তিনি বলেন, ‘আমি জাহালম। আমার বাবার নাম ইউসুফ আলী। মা মনোয়ারা বেগম। বাড়ি ধুবড়িয়া গ্রাম, সাকিন নাগরপুর ইউনিয়ন, জেলা টাঙ্গাইল। আমি আবু সালেক না।’

এদিকে তার ভাই শাহানূর দিনের পর দিন আদালতের বারান্দায় ঘুরতে থাকেন। হাজতখানার পুলিশ থেকে শুরু করে আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী যাকে পান, তাকেই বলতে থাকেন, ‘আমার ভাই নির্দোষ।’ অথচ ব্যাংক, দুদক, পুলিশ সবার কাছেই জাহালম হলেন ‘আবু সালেক’ নামের ধুরন্ধর ও ব্যাংক জালিয়াতিকারী।

জাহালমের ঘটনায় দুদক জড়িত কিনা তদন্ত করতে হাইকোর্টের নির্দেশ

গত ২৭ জুন আদালত জাহালমের ঘটনায় দুদকের দায় আছে কি না, তা নির্ণয় করে গঠিত কমিটিকে ১১ জুলাই (আজ) প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ‘স্যার, আমি জাহালম, সালেক না’ শিরোনামে গত ২৮ জানুয়ারি প্রথমআলোতে প্রতিবেদন ছাপা হয়। সোনালী ব্যাংক থেকে সাড়ে ১৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন আবু সালেক নামের এক ব্যক্তি। কিন্তু দুদক সালেকের স্থলে জাহালমকে জেলে ঢুকিয়ে দেয়। প্রতিবেদনটি সেদিন আদালতের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাশগুপ্ত। শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের একই বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত রুল দেন। গত ৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট জাহালমকে মুক্তি দিতে আইজি প্রিজনকে নির্দেশ দেন। প্রায় তিন বছর পর সেদিন মুক্তি পান তিনি।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। ফাইল ছবি

মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত

শাহানূর দুদকের কর্মকর্তাদের বারবার বলেছেন, তার ভাই নিরপরাধ। কিন্তু কেউ তার কথা বিশ্বাস করেনি। সুদের টাকা নিয়ে ভাইকে মুক্ত করার জন্য নিয়োগ দিয়েছিলেন আইনজীবী। তার ভাই জাহালম ও তার আইনজীবী আদালতকে বারবার বলেছিলেন, জাহালম সালেক নন। তিনি নিরপরাধ। মেলেনি জাহালমের জামিন। নিরুপায় জাহালমের ভাই শাহানূর গত বছর যান মানবাধিকার কমিশনের কাছে। শাহানূরের অভিযোগ পেয়ে মানবাধিকার কমিশনার কাজী রিয়াজুল হক ছুটে আসেন কাশিমপুর কারাগারে। কথা বলেন জাহালমের সঙ্গে। তিনি নিশ্চিত হন, জাহালম শ্রমিক। বাংলায় কোনোমতে স্বাক্ষর করতে জানেন। ব্যাংক জালিয়াতি মামলার আসামি সাগর আহম্মেদ তাকে জানান, প্রকৃত আসামি সালেককে তিনি চেনেন।

মানবাধিকার কমিশন তখন আসামি সালেকের জীবনবৃত্তান্ত জানতে চেয়ে ঠাকুরগাও স্থানীয় প্রশাসনকে চিঠি লেখেন। একইভাবে কারাগারে থাকা জাহালমের জীবনবৃত্তান্ত জানতে চেয়ে টাঙ্গাইলের নাগরপুরের প্রশাসনকে চিঠি লেখেন। স্থানীয় প্রশাসনের পাঠানো প্রতিবেদনে মানবাধিকার কমিশন নিশ্চিত হন, ব্যাংকের টাকা জালিয়াত চক্রের প্রকৃত আসামি সালেকের সম্পদ বেড়েছে।

প্রিয় সংবাদ/রুহুল

 

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...