দাবা খেলার দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

দাবা খেললেই কি বুদ্ধি বাড়ে?

এই সমীক্ষায় দেখার চেষ্টা হয়, দাবা খেলে—এমন শিশুদের সঙ্গে দাবা খেলে না—এমন শিশুদের পরীক্ষার ক্ষেত্রে ফলাফলে কোনো প্রভাব পড়ে কি না?

রুহুল আমিন
জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০১৯, ২০:৪৭ আপডেট: ১১ জুলাই ২০১৯, ২০:৪৭
প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০১৯, ২০:৪৭ আপডেট: ১১ জুলাই ২০১৯, ২০:৪৭


দাবা খেলার দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্কুলে দাবা খেলাকে অনেকটা পাঠ্যসূচির সহায়ক হিসেবে ভাবা হয়। কারণ অনেকে বিশ্বাস করেন, দাবা খেললে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হন। যেমন দাবা খেলার মাধ্যমে স্মৃতিশক্তি, আইকিউ, সমস্যা সমাধানে দক্ষতা ও মনোযোগী হয়ে উঠা যায়। তবে এটাও সত্য যে, দাবার মাধ্যমে এসব হয় তার স্বপক্ষে খুব শক্তিশালী কোনো প্রমাণও নেই।

এ নিয়ে দুটি সমীক্ষা (সমীক্ষার ফল এখনো প্রকাশ হয়নি) চালিয়েছে দ্য কনভারসেশন ডটকম। দুটি এসব সমীক্ষায় দেখা যায়, শিক্ষক ও অভিভাবকরা বিশ্বাস করেন, দাবা খেলা থেকে অনেক কিছু শেখা যায়। বলা যায়, দাবার শিক্ষামূল্য অনেক। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ভিন্নতা। দাবা খেলেছে এবং খেলেনি—এমন দুই দল শিক্ষার্থী আমাদের সমীক্ষায় অংশ নেয়। ফলাফলে দেখা যায়, দুই দলের মধ্যে বুদ্ধির ক্ষেত্রে তেমন কোনো পার্থক্য নেই।

অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, শেখার সক্ষমতা বৃদ্ধি করে দাবা খেলা

প্রথম সমীক্ষায় দাবা খেলার উপকারিতার বিষয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন, তা দেখা হয়। ২০১৬ সালে চালানো এই সমীক্ষায় অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ও নিউ সাউথ ওয়েলস থেকে মোট ৩১৪ জন অংশ নেয়। এদের মধ্যে স্কুলের প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক, দাবা শিক্ষক ও অভিভাবকরা ছিলেন। অনলাইনে চালানো এই সমীক্ষায় অবশ্য তাদের নাম-পরিচয় গোপন রাখা হয়।

দাবা খেলার মাধ্যমে উপকার বা শিক্ষার্থীদের ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিংয়ের সক্ষমতা বাড়ে—এমন ৩৪টি প্রশ্ন করে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে জানতে চাওয়া হয়, তারা এতে কতটুকু একমত বা দ্বিমত পোষণ করেন। অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী দাবায় উপকারের বিষয়ে জোরালো অভিমত দেয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রায় ৮০ ভাগ (উত্তর দেওয়া ৩১৩ জনের মধ্যে ২৪৯জন) অংশগ্রহণকারী দাবা খেলায় শিক্ষা ক্ষেত্রে শিশুদের উপকার হয় বলে জোরালোভাবে অভিমত দেন।

এ ছাড়া ৮৭ ভাগ ( উত্তর দেওয়া ৩১০ জনের মধ্যে ২৬৯ জন) অংশগ্রহণকারী দাবা খেলা শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে বলেও জোরালোভাবে অভিমত দেন। আর ৫৯ ভাগ (৩১৪ জনের মধ্যে ১৮৪ জন) অংশগ্রহণকারী জোরালোভাবে মনে করেন যে, দাবা আদিবাসী ও দীপের শিশুদের শিক্ষায় সহায়তা করে। এই সমীক্ষাটিতে অংশগ্রহণকারীদের মন্তব্য করার সুযোগও রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকটি মন্তব্য নিচে দেওয়া হলো—

একজন বলেন, সব শিশুদের জন্য দাবা খেলায় অংশগ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল কর্তৃপক্ষের করা এই কার্যক্রমটি শিশুদের সামাজিক, অনুভূতি সংক্রান্ত ও একাডেমিক উন্নয়নে সহায়তা করে।

আরেক অভিভাবক বলেন, দাবার ক্লাস শুরুর পর আমার ছেলে পাক্কা ছাত্র হয়ে ওঠে এবং সামাজিক পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে এখন বেশ পরিপক্ক। দাবা তাকে ভিন্নভাবে ভাবতে সাহায্য করছে।

আসলেই কি তাই?

আগেও এমন সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। যেখানে দাবায় শিশুদের শিক্ষা ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি বিষয়ে মিশ্র ফল পাওয়া যায়। কিছু সমীক্ষায় আবার দেখা গেছে, দাবার সঙ্গে চিন্তার সক্ষমতার একটা যোগসূত্র আছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০১২ সালের নিউ ইয়র্ক সমীক্ষা। ওই সমীক্ষায় দেখা যায়, যেসব শিশুরা দাবা অথবা গান শিখছে, তারা অন্য শিশু—যারা কিছুই শিখেনি তাদের চেয়ে পারদর্শিতায় কিছুটা এগিয়ে। তবে ওই সমীক্ষায় এটাও দেখা গিয়েছিল, দাবা খেলুড়ে শিশুদের এই উন্নতি বলার মতো কিছু ছিল না।

আর ২০১৭ সালে ইংল্যান্ডে চার হাজার শিশুর ওপর চালানো এক সমীক্ষায় দেখা যায়, বিজ্ঞান বিষয়ের পরীক্ষা, পড়া বা গণিতে দাবা খেলা কোনো ধরনের প্রভাব ফেলেছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

দ্য কনভারসেশন বলছে, তারা এমন একটা সমীক্ষা করতে চেয়েছিল, যেখানে দাবা খেলা শেখার সঙ্গে যেকোনো প্রকার দক্ষতা বৃদ্ধির কোনো সংযোগ আছে কিনা, তা বোঝা যাবে। তেমনই একটি সমীক্ষা চালানো হয় কুইন্সল্যান্ডের বেসরকারি এক স্কুলে। এতে গ্রেড ওয়ান থেকে গ্রেড ফাইভের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়।

এই সমীক্ষায় দেখার চেষ্টা হয়, দাবা খেলে—এমন শিশুদের সঙ্গে দাবা খেলে না—এমন শিশুদের পরীক্ষার ক্ষেত্রে ফলাফলে কোনো প্রভাব পড়ে কি না।

অভিভাবকদের অনুমতি নিয়ে ২০৩ জন শিক্ষার্থী এই সমীক্ষায় অংশ নেয়। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে তাদের চারটি দলে ভাগ করা হয়।

চারটি দল হলো—

  • দাবা খেলা শিখেছে ৪৬ শিক্ষার্থী
  • গান শিখেছে ৪৮ শিক্ষার্থী
  • দাবা ও গান উভয়টি শিখেছে ৩৭ শিক্ষার্থী
  • গান অথবা দাবা কোনোটিই শেখেনি ৭২ শিক্ষার্থী

৮৩ শিক্ষার্থীকে ছয় মাস সাপ্তাহিক দাবা খেলা শেখানো হয়। এর মধ্যে গ্রেড ওয়ান থেকে ২৪, গ্রেড টু থেকে ২০ , গ্রেড থ্রি থেকে ৮, গ্রেড ফোর থেকে ১৮ এবং গ্রেড ফাইভ থেকে ১৩ জন শিক্ষার্থী নেওয়া হয়।

অন্যদিকে ৮৫ শিক্ষার্থীকে ছয় মাস সাপ্তাহিক গান শেখানো হয়। এর মধ্যে গ্রেড ওয়ান থেকে ১৬ , গ্রেড টু থেকে ১৫, গ্রেড থ্রি থেকে ১২, গ্রেড ফোর থেকে ২৩ ও গ্রেড ফাইভ থেকে ১৯ জনকে নেওয়া হয়।

ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত সদস্যদের মাঝে প্রকৃতপক্ষেই কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা দেখতে খুব মানসম্মত একটি পরীক্ষা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, দাবা ও গানের দলের সামান্য কিছু উন্নতি হয়েছে। তবে সেটা পরিসংখ্যানগত খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ বা বলার মতো কিছু না।

দ্য কনভারসেশন বলছে, এসব সমীক্ষার মানে এই নয় যে, জ্ঞান অর্জনের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য দাবা খেলা শেখার কোনো উপকারিতা নেই। বুদ্ধি মাপার ধরন বিভিন্ন রকম, যা এখনো সম্পূর্ণভাবে করতে পারেনি। ধারণাগত চিন্তা (কনসেপচুয়াল থিঙ্কিং) যেখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা, সেখানে বুদ্ধি মাপার এই ভিন্নতা খুবই প্রাসঙ্গিক।

দাবার সাহায্যে ভিন্ন ভিন্নভাবে চিন্তা করা যায়; যেমন ক্রিয়েটিভ থিঙ্কিং, ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং, লজিক্যাল থিঙ্কিং, ইনটুইশন (তাৎক্ষণিক বুঝতে পারার সক্ষমতা), যৌক্তিক বিশ্লেষণ, সিস্টেমেটিক থিঙ্কিং, স্ট্র্যাটেজিক থিঙ্কিং, দূরদর্শিতা, কনভারজেন্ট থিঙ্কিং, অ্যানালাইটিক্যাল থিঙ্কিং, প্রবলেম সলভিং ও কনসেনট্রেশন।

যদি দাবা সংক্রান্ত বিষয়ে খেলোয়াড়, অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের ইতিবাচকতার সঙ্গে একমত হওয়া যায়, তাহলে দাবা ঠিক কোন ধরনের চিন্তার উন্নয়ন করে, তা দেখতে আরো গবেষণার প্রয়োজন।

প্রিয় সংবাদ/রিমন

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...