উনিশ শতকের শুরুর দিকের চেয়ে বিশ্ব এখন খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

সংঘাতের ভাষা

ভারতে যেমন কোনো মানুষ যদি একটু বামপন্থী ধারণার সমর্থন করে সে যদি উগ্র ডানপন্থীও হয় তাকে ‘শহুরে নকশাল’ বলে দেওয়া হয়।

রুহুল আমিন
জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ২৫ জুলাই ২০১৯, ২০:১৪ আপডেট: ২৬ জুলাই ২০১৯, ১৬:০৯
প্রকাশিত: ২৫ জুলাই ২০১৯, ২০:১৪ আপডেট: ২৬ জুলাই ২০১৯, ১৬:০৯


উনিশ শতকের শুরুর দিকের চেয়ে বিশ্ব এখন খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) ভারত থেকে বেড়াতে আসা শাশুড়ি মায়ের সঙ্গে বসে ইথাকা রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খাচ্ছিলাম। আমাদেরকে খাদ্য পরিবেশন করছিলেন চীনা এক নারী। তিনি হঠাৎ আমার শাশুড়িকে প্রশ্ন করেন, কোথায় থেকে এসেছেন? উত্তরে শাশুড়ি মা জানান, ভারতের মহারাষ্ট্রের একটি ছোট্ট শহর কোলাপুর থেকে এসেছেন। কোলাপুর তার জন্মস্থান। এই কথা শুনে ওই চায়নিজ ওয়েট্রেস যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। তিনি বলেন, আমিও সেখানে বেশ কয়েক বছর ছিলাম।

অল্প সময়ের মধ্যে তাদের খুব ভাব হয়ে গেল। আমার শাশুড়ি মা জানালেন, বিশ্বের সবচেয়ে ভালো আইসক্রিমটি কোলাপুর থেকে আসে। এই কথায় ওয়েট্রেস সায় দিয়ে বললেন, সেখান থেকে আসার পর থেকে তিনি আর ভালো নেই। কিছুক্ষণ পর আমি বুঝতে পারলাম কি ঘটছে। আমার শাশুড়ি কথা বলছেন কোলাপুর নিয়ে, আর ওই ওয়েট্রেস কথা বলছেন কুয়ালালামপুর নিয়ে। কিন্তু তাদের কথাবার্তা যেন মিলে যাচ্ছিল। আমি তাদের এই আনন্দময় মুহূর্ত নষ্ট করতে চাইলাম না।

ভাষা একটি বিষ্ময়কর ব্যাপার। মানুষের অগ্রগতি ও তাদের সুখী করতে ভাষার বিরাট ভূমিকা। আবার এই ভাষা সংঘাত এবং নিপীড়নেরও উৎস হতে পারে।

ভাষা ও সংঘাতের এই সম্পর্কের বিষয়টি সমাজ বিজ্ঞানের বাইরের কিছু নয়। গাণিতিক যুক্তি তত্ত্বেও বিষয়টি বিদ্যমান। সমসাময়িক বিশ্বেও ভাষার এই গভীর যোগসূত্রতা বোঝাতে অর্থনীতিবিদ ও অন্য গবেষকরা আমাদেরকে সাহায্য করেছেন।

বলা যায়, আমরা সবচেয়ে ভালো এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে খারাপ সময়ে বসবাস করছি এখন। আজকের বিশ্বে যেমন ধনী, আগে কখনো তেমনটা ছিল না। তারপরও এখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ, বিভাজন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশ্ব শক্তির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে এবং বিদেশ বিদ্বেষ আছে।

আজকের বিশ্বের ক্রমবর্ধমান সমৃদ্ধি ও গভীর বিভাজন শিল্প বিপ্লবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যা আঠারো শতকের মাঝামাঝিতে শুরু হয়েছিল এবং প্রায় ১০০ বছর স্থায়ী হয়েছিল। অদ্ভুতভাবে সেই যুগটি ১৭৭৬ সালে অ্যাডাম স্মিথের বই ‘দ্য ওয়েলথ অব ন্যাশনস’-এর বহুল আলোচিত রাজনৈতিক অর্থনীতি তত্ত্বের সঙ্গে মিলে যায়। এতে অগাস্টিন কোর্নট ও লেওন ওয়ালরাসেরও অবদান ছিল। এটা তাদের দৈনন্দিন গবেষণার ফল ছিল না। পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীতে জন হিকস, পল স্যামুয়েলসন ও কেন্নেথ অ্যারোও বিষয়টি নিয়ে আরো কাজ করেন। অর্থনীতি কীভাবে কাজ করে এবং রাজনীতি কীভাবে বাজারের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করে তা পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছেন তারা। পাশাপাশি দেখিয়েছেন অর্থনীতির কল্যাণের দিকটিও।

যদিও রাজনৈতিক অর্থনীতির গবেষণার ভবিষ্যৎ পথ কী, তা আমরা ধারণা করতে পারি না। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এটা একাধিক বিষয়কে নির্দেশ করতে পারে। ভাষাও এর মধ্যে একটি হতে পারে। কিছু পণ্ডিত যেমন প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক বিশুদ্ধতার শিক্ষক স্টিফেন মরিস ইতোমধ্যে ভাষার রাজনৈতিক অর্থনীতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়, আরো বেশি কিছু করতে হবে। বিশেষ করে ভাষা এবং সংঘাতের মধ্যে সম্পর্ক কী, তা নিয়ে গবেষণা করতে হবে।

এই যেমন চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক বিবৃতির কথা বলা যায়। যে বিবৃতির কারণে ট্রাম্পকে বর্ণবাদী বলা হচ্ছে। কারণ তিনি চার নারী ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্যকে যারা শ্বেতাঙ্গ নন, তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে বলেছেন। এই চারজনের মধ্যে তিনজন যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিয়ে সেখানেই বেড়ে উঠেছেন। আর একজন নিরপেক্ষ নাগরিক অর্থাৎ শিশু শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। ট্রাম্পের এই বিবৃতির কারণে তিনি নিজের কিছু সমর্থক হারিয়েছেন। আমি বিশ্বাস করি, তার সব সমর্থকই বর্ণবাদী নন। ব্যাপারটি এমন যে ট্রাম্পের সমালোচনায় এই চারজন ভিন্ন ভাষার ব্যবহার করেন। কারণ বক্তা যা বলেন শ্রোতারা তা ভিন্নভাবে শোনেন। ভাষা সঙ্কট উসকে দেওয়ার যন্ত্র হতে পারে। বেশিরভাগ সমস্যা এটাই নির্দেশ করে, বাস্তব জগৎ সত্যিই অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। আর কিছু রাজনীতিক এই বৈচিত্র্যতাকেই জনগণকে নিয়ন্ত্রণ ও নিপীড়নে ব্যবহার করেন।

এদিকে মানুষ রাজনৈতিক অর্থনীতির বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার পরিবর্তে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ শব্দ দুটিকে সমর্থক মনে করে। আবার ইসরায়েলে ডানপন্থীদের কোনো মতামতে ভিন্ন মত পোষণ করা মানে তাদের মতে ইহুদিবিদ্বেষ। আর এই বিষয়টি অনেক মানুষকে যাদের ইহুদিবিদ্বেষ নেই তাদেরকেও সমালোচনা থেকে দূরে রেখেছে।

ভারতে যেমন কোনো মানুষ যদি একটু বামপন্থী ধারণার সমর্থন করে সে যদি উগ্র ডানপন্থীও হয় তাকে ‘শহুরে নকশাল’ বলে দেওয়া হয়। একইভাবে ভারতীয় কলাম লেখক দেখিয়েছেন, আধুনিক হিন্দির ব্যবহার করে কীভাবে উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রসার হচ্ছে এবং সর্বগ্রাসী আদর্শ দিয়ে কীভাবে বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে ভাষার সুনাম নষ্ট এবং ভাষা নিজে কীভাবে নষ্ট হচ্ছে।

আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি এবং বাড়ন্ত সামাজিক মাধ্যম ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং সংস্কৃতির বিপুল সংখ্যক মানুষকে এক জায়গায় জড়ো করে রাজনৈতিক দূষণ ও সংঘাতের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তুলেছে। তাদের মধ্যে অনেকের কাছে একই শব্দ ভিন্ন ভিন্ন আবেগ ও রাজনৈতিক অর্থ তৈরি করছে এবং একই শব্দ ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা হচ্ছে। এমনকি পরস্পরবিরোধী অর্থেও তা ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

শব্দগুলো নতুন অর্থ পেয়েছে এবং অনেক লোক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে না এমন ভাব নিতে নির্দিষ্ট শব্দগুলোর ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। আর শব্দের অর্থ পরিবর্তনের এই বহুমুখী পদ্ধতি একটি বিভক্তির সমাজ তৈরি করছে। এই বহুমুখিতা বুঝতে হলে যুক্তি, ভারসাম্য বিশ্লেষণ, দর্শন ও সৃজনশীলতার সমন্বয়ের প্রয়োজন।

যদি বাড়িয়ে না বলি তবে বলা যায়, আঠারো শতকের শেষভাগ ও উনিশ শতকের শুরুর দিকের চেয়ে বিশ্ব এখন খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। সময় এখন অর্থনীতিবিদদের, পূর্বসূরিদের দেখানো পথে তাদেরও এই ব্যাপারে নতুন কিছু উদ্যোগ নিতে হবে।

লেখক: কৌশিক বসু, তিনি বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং ভারত সরকারের সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা।

ইংরেজি থেকে অনূদিত

সূত্র: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

প্রিয় সংবাদ/রিমন