নিহত তাসলিমা বেগম রেনুর কবর জিয়ারত করছে তাহসিন। পাশে গাড়িতে বসে আছে তুবা ও তাহসিনের খালা। ছবি: সংগৃহীত

কেমন আছে তুবা ও তাহসিন?

আত্মীয়দের আদরে কিছুক্ষণের জন্য কান্না থামালেও মায়ের কথা মনে হলেই যেন কেঁদে ওঠে ওরা দু’জন।

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৫ জুলাই ২০১৯, ২২:৫৬ আপডেট: ২৫ জুলাই ২০১৯, ২৩:০০
প্রকাশিত: ২৫ জুলাই ২০১৯, ২২:৫৬ আপডেট: ২৫ জুলাই ২০১৯, ২৩:০০


নিহত তাসলিমা বেগম রেনুর কবর জিয়ারত করছে তাহসিন। পাশে গাড়িতে বসে আছে তুবা ও তাহসিনের খালা। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) ‘নরপশুদের’ গণপিটুনিতে নির্মমভাবে নিহত তাসলিমা বেগম রেনুর ছেলে তাহসিন ও মেয়ে তুবা। তাসমিন তুবা ৪ ও তাহসিন আল মাহির ১১ বছর বয়সের শিশু। সবে বুঝে উঠতে শুরু করেছে তাহসিন। এই বয়সেই মাকে হারিয়েছে সে। মায়ের রক্তাক্ত মুখটা ভাসছে যেন তাদের দুই ভাইবোনের চোখে মুখে। বাড্ডায় ‘গণপিটুনিতে’ প্রাণ গেছে তাদের মা তাসলিমা বেগম রেনুর।

তুবা। ছবি: সংগৃহীত

রেনুকে কবর দেওয়ার পর তুবা ও তাহসিন

মাকে কবর দেওয়ার পর থেকে মায়ের অপেক্ষায় কাঁদছে তুবা ও তাহসিন। আত্মীয়দের আদরে কিছুক্ষণের জন্য কান্না থামালেও মায়ের কথা মনে হলেই যেন কেঁদে ওঠে ওরা দু’জন। প্রতিটি মুহূর্ত যেন মাকে খুঁজে ফেরে তুবার দুই চোখ। এখনও তুবা জানে না তার মা কোথায় আছে। কেমন আছে। কেউ জিজ্ঞাসা করলেই এই নিষ্পাপ শিশু বলে মা চকলেট আনতে গেছে। মায়ের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে থেমে থেমে চলছে তুবার কান্না।

তারা দু-জন বুধবার দুপুরে মায়ের স্পর্শ না নিয়েই রায়পুর উপজেলার সোনাপুর গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় ফিরেছে আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে। তার আগে মায়ের কবরের পাশে যায় ছোট্ট দুই শিশু। কবর দেখলে ভয় পাবে এমন আশঙ্কায় তুবাকে নিয়ে মাইক্রোবাসে বসে থাকেন তার খালা। আর তাহসিন যায় মায়ের সমাধির পাশে। সেখানে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করে। 

ছোট তাহসিন ও তুবা। ফাইল ছবি

রেনুকে দাফন করা হয় যেখানে

রবিবার লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সোনাপুর গ্রামের বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে রেনুকে দাফন করা হয়েছে। মায়ের দাফন শেষে তাহসিন ও তুবা দুই ভাইবোন নানির বাসায় যায়। তুবা ও তার মা এই বাড়িতেই থাকতেন মায়ের সঙ্গে। তাই তুবার কাছে বাসার পরিবেশ অপরিচিত না লাগলেও চারপাশের মানুষের আচরণ পাল্টে গেছে, তা সে বুঝতে পারছে যেন। তুবা রাতে তার খালা নাজমুন নাহারের সঙ্গে থাকছে।

খালার কোলে তুবা। ফাইল ছবি

গত শনিবার থেকে ছয় দিন ধরে মা আসছেন না। তাই ছোট তুবার মেজাজও ভালো যাচ্ছে না। সবকিছু নিয়ে বায়না করছে, বায়না মেটানো না হলেই চিৎকার, কান্নাকাটি করছে। বাসায় যে আসে সে–ই তুবার ছবি তুলতে চায়, এটাও তার পছন্দ না। তাই ঘরে অপরিচিত কেউ ঢুকে মুঠোফোন হাতে নিলেই বলে, ‘আমি ছবি তুলব না।’

রেনুর ১১ বছর বয়সী ছেলে তাহসিন বুঝে গেছে তার মা আর ফিরবেন না। বাবা-মায়ের তালাকের পর থেকে দুই বছর ধরে তাহসিন মা ও বোন থেকে আলাদা থেকেছে। প্রথমে বাবার সঙ্গে এবং পরে তাকে বাবা গ্রামের একটি স্কুলে ভর্তি করে দিলে মা ও বোনের সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়ে। তাই সেও তার বোনকে সেভাবে কাছে পাচ্ছে না।

নিহত রেনুর বড় বোন নাজমুন নাহার বলেন, গুজব আমাদের সব শেষ করে দিয়েছে। গুজব ছড়িয়ে একজন নারীকে এভাবে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে! এটি মেনে নেওয়া যায় না। আমি এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের গ্রেফতার করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। যেন আর কোনো মানুষ এভাবে গুজবের বলি না হয়।

প্রসঙ্গত, গত শনিবার সকালে বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসেন রেনু বেগম। তার দুই সন্তানের ভর্তির বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলে স্কুলের গেটে কয়েকজন নারী রেনুর নাম-পরিচয় জানতে চান। পরে লোকজন রেনুকে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কক্ষে নেন। কিছুক্ষণের মধ্যে বাইরে কয়েকশ লোক মিলে রেনুকে প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে যায়। স্কুলের ফাঁকা জায়গায় এলোপাতাড়ি মারপিট করে গুরুতর জখম করে। পরে উদ্ধার করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন তিনি মারা যান। এ ঘটনায় রেনুর বোনের ছেলে সৈয়দ নাসিরউদ্দিন বাদী হয়ে বাড্ডা থানায় অজ্ঞাতনামা চারশ থেকে পাঁচশ মানুষকে আসামি করে মামলা করেন।

প্রিয় সংবাদ/রুহুল