চার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য। ছবি: সংগৃহীত

গণতান্ত্রিক বিশ্বে শীর্ষে নারী

এখন নারীর আর কোনো পুরুষের কাছ থেকে বৈধতা বা স্বীকৃতি নিতে হয় না। তার মানে আবার এই নয় যে, তারা পুরুষের সমর্থনকে স্বাগত জানান না বা অবজ্ঞা করেন।

রুহুল আমিন
জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ২৬ জুলাই ২০১৯, ১৭:৫৩ আপডেট: ২৬ জুলাই ২০১৯, ১৮:০১
প্রকাশিত: ২৬ জুলাই ২০১৯, ১৭:৫৩ আপডেট: ২৬ জুলাই ২০১৯, ১৮:০১


চার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শ্বেতাঙ্গ নন—এমন চার ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস সদস্য আইয়ানা প্রেসলি, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-করতেস, ইলহান ওমর ও রাশিদা তালিবকে তাদের নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে বলেছেন। আর এর মাধ্যমে ট্রাম্প যে কট্টর পুরুষতান্ত্রিক ও বর্ণবাদী, তা আবারও স্মরণ করিয়ে দিলেন।

এই চারজনের মধ্যে কেবল ইলহান ওমর সোমালিয়ায় জন্ম নেন। কিশোর বয়সে শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন তিনি। বাকি তিনজনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রেই। তবে এই চারজনের কংগ্রেস সদস্য হওয়ার মাধ্যমে এই বিষয়টি পরিষ্কার যে, রাজনীতিতে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে এবং ধারাবাহিকভাবে তা হচ্ছে। ট্রাম্পের মতো মানুষের জন্য নারীদের এই এগিয়ে যাওয়া কতটুকু ভয়ের সেটা কোনো বিষয় না।

এক শতাব্দী আগে ইউরোপে নারীদের অধিকার নিয়ে সচেতন (নারীবাদী) ইন্নেসা আর্ম্যান্ড, রোসা লাক্সেমবার্গ ও ক্লারা জেটকিন—এই ব্যাপারে কিছুটা প্রশংসা পেতে পারেন। তবে তখনকার নেতৃস্থানীয় এই নারীদের নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার স্বীকৃতি বা বৈধতার জন্য আবার ক্ষমতাশীল কোনো পুরুষকেই খুঁজতে হতো। যেমন সোভিয়েত নেতা ভ্লাদিমির লেনিন ছিলেন এমন একজন। তিনি পুরুষের সঙ্গে নারীর যে বৈষম্যমূলক পুরাতন আইন, তা বাদ দিয়েছিলেন। অভিযোগ ছিল, লেনিনের সঙ্গে আর্ম্যান্ড প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলেন। এদিকে ১৯১৯ সালে ‘সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রে কর্মজীবী নারী আন্দোলনের কর্মকাণ্ডে’র ওপর লেনিন এক বক্তব্য দেন। পরে জেটকিন ওই বক্তৃতার বিষয়ে ১৯২০ সালে ‘নারীর প্রশ্ন’ নামে লেনিনের একটি সাক্ষাৎকার নেন।

নারীদের পক্ষে নেওয়া ওই সব পদক্ষেপ বোধগম্য ছিল, কিন্তু কার্যকরী ছিল না বলে প্রমাণিত হয়েছিল। কারণ লেনিন আসলে সমাজতন্ত্রে জোর দিয়েছিলেন, যাতে সবাইকেই সমান অধিকারের অঙ্গীকার ছিল এবং যা নারীকে আরো উদার করেছিল। লেনিন তার বক্তব্যে বলেছিলেন, যেখানেই পুঁজির সংরক্ষণ করা হয় সেখানেই পুরুষ অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে।

এরপর যখন ৮০ ভাগ নারীর (যাদের বয়স ১৫ থেকে ৫৪ বছর) চাকরি ছিল (১৯৮৩ সালে) তখনও কিন্তু ভবিষ্যৎ ছিল কেবল কয়েকজনেরই। আর স্টালিনের সময়ে নারীদের ঘরে ফিরে যেতে বলা হলো। আমার নিজের দাদিকেই তার শিক্ষকতার চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হলো, যখন আমার দাদাকে ১৯৩৭ সালে ইউক্রেনের কমিনিস্ট পার্টির প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। তখনকার রাজনৈতিক কর্মীদের কর্মজীবী স্ত্রীদের কপালে কি ঘটত, আমার দাদি হলেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

আর এখনকার রাশিয়াতে পুতিন সরকারে নামকাওয়াস্তে কয়েকজন নারী আছেন যাদের কাজ কেবল বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেওয়া। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাশিয়াতে গৃহ নির্যাতনের (ডমেস্টিক অ্যাবিউস) শিকার হয়ে প্রতি ৪০ মিনিটে একজন নারী খুন হচ্ছেন। অথচ ২০১৭ সালে রাশিয়ান সংসদে কিছু কিছু গৃহ সহিংসতাকে (ডমেস্টিক ভায়োলেন্স) বৈধতা দিয়ে আইনের সংশোধনীতে পুতিন স্বাক্ষর করেছেন।

অবশ্য এর বিপরীত দৃশ্যও দেখা যায়। যেমন অনেক ইউরোপিয়ান গণতান্ত্রিক দেশ নারীর ভোটাধিকারের ক্ষেত্রে রাশিয়ার পেছনে ছিল। যেমন ১৯৪০ সালে বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও ইতালি (রাশিয়া ১৯১৭) নারীদের ভোটাধিকারের পূর্ণ অধিকার দেয়। তবে তারা ভোটাধিকারের পাশাপাশি নারীদের পেশাগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও আরো সহায়ক হয়ে ওঠে। ৪০ বছর আগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, যাকে লৌহ মানবী বলা হতো, যিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণে কঠোর এবং ক্ষেপাটে ছিলেন; তিনি নারীদের প্রথাগত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সাহায্য করেছিলেন। আর গত ১৫ বছরে তা আরো অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে এবং তারা এগিয়ে যাচ্ছেন।

২০০৫ সালে ক্ষমতা নেওয়ার পর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলই জার্মানির প্রথম নারী চ্যান্সেলর, যিনি সময়ের দিক থেকে দেশটির তৃতীয় দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় আছেন। এ ছাড়া আরেক ক্ষমতাধর নারী বর্তমান জার্মান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আন্নেগ্রেট ক্রাম্প কারেনবাওয়ার। বলা হচ্ছে, ২০২১ সালে তিনিও হয়তো জার্মানির চ্যান্সেলর হতে পারেন।

পুরো ইউরোপেই রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। ডালিয়া গ্রেবাউসকাইতি যিনি লিথুনিয়ায় ‘লৌহ মানবী’ হিসেবে পরিচিত, ২০০৯ সালে তিনি দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন (চলতি মাসে ক্ষমতা ছেড়েছেন)। রক্ষণশীল ইরনা সোলবার্গ ২০১৩ সালে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি কল্যাণকর রাষ্ট্র ও উদারপন্থী মনোভাব-এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য করে সফলভাবে দেশ পরিচালনা করেছেন। আর পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক বলয়ে থেকেও ইউলিয়া টিমোশেঙ্কো ইউক্রেনে দুইবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। উদার রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত কার্স্টি কালজুলাইদ এস্তোনিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি ২০১৬ সালে সর্বকনিষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এ ছাড়া গত মাসে সোস্যাল ডেমোক্র্যাট (বামপন্থী) মিটি ফ্রেডরিকসেন ডেনমার্কের সর্বকালের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশটির দ্বিতীয় নারী তিনি।

এদিকে জাতীয়তাবাদী পিয়া কেজেশগার্ড হলেন আরেকজন ক্ষমতাধর নারী রাজনীতিক, যিনি ড্যানিশ পিপলস পার্টির সহ-প্রতিষ্ঠা। চার বছর সফলভাবে দায়িত্ব পালন করে স্পিকারের পদ থেকে সরে দাঁড়ান তিনি।

ফ্রান্সের ডানপন্থী ‘ফ্রান্স ন্যাশনাল র‌্যালি’তে (সাবেক ন্যাশনাল ফ্রন্ট) একজন নারী নেত্রী আছেন। তার নাম ম্যারিন লে পে যিনি ২০১১ সালে তার বাবা জেন ম্যারে লে পেনের স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি সফলতার সঙ্গে দলের মতাদর্শ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

এ ছাড়া সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে তার পূর্বসূরী ডেভিড ক্যামেরনের রেখে যাওয়া অনেক জঞ্জাল পরিষ্কারে সফল ছিলেন। তিনি নিজ দল কনজারভেটিভ পার্টিতে তোপের মুখে পড়ে বেক্সিট ইস্যুতে গণভোটের আহ্বান জানান। কিন্তু ভোটের রায় তার বিপক্ষে যাওয়ায় তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। মে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিপক্ষে ছিলেন কিন্তু প্রয়োজনীয় সমর্থনের অভাবে তিনি লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন এবং প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

এদিকে ইউরোপিয়ান কমিশন পর্যায়ের রাজনীতিতেও নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ছে। ‘ইউরোপীয় কমিশন ফর কম্পিটিশন’-এর দায়িত্বে থাকাকালীন ডেনমার্কের মার্গারিট ওয়েস্টার বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি নিয়ন্ত্রণে সাহসী কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ফ্রান্সের সাবেক অর্থমন্ত্রী ক্রিস্টিন ল্যাগার্ড ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রথম নারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়েছিলেন। এখন তিনি ইউরোপিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন। আর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের শিষ্য উরসুলা ভন ডার লেন ইউরোপীয়ান কমিশনের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিবেন।

যুক্তরাষ্ট্রে যদিও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ২০১৬ সালে ট্রাম্পের কাছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরেছেন, কিন্তু বেশি ভোট পেয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আর ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে ওই চার নারীও আছেন যাদেরকে ট্রাম্প নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে বলেছেন। এ ছাড়া ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৌড়ে এগিয়ে আছেন, এমন পাঁচজনের মধ্যে দুই নারীও রয়েছেন।

এসব নারীর এখন আর কোনো পুরুষের কাছ থেকে বৈধতা বা স্বীকৃতি নিতে হয় না। তার মানে আবার এই নয় যে, তারা পুরুষের সমর্থনকে স্বাগত জানান না বা অবজ্ঞা করেন। এই সমর্থন রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত এমনকি শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও হতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইতালিয়ান বিখ্যাত গীতিনাট্যকার জুসেপ্পে ভের্দির গীতিনাট্য ‘রিগোলেত্তো’র সমকালীন রূপ অস্ট্রেলিয়াতে মঞ্চস্থ করেছেন জার্মানির নাট্য পরিচালক ফিলিপ স্টোলজ (পুরুষ)। ফিলিপের ভাবনায় রিগোলেত্তো—একজন ভাঁড়, যিনি তার ক্ষমতাবান মনিব বা নিয়োগকর্তার বদমায়েশির ইতি টানার চেষ্টা করেন। সাম্প্রতিক সময়ের #মিটু আন্দোলনের একটি আদর্শ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বলা যায় রিগোলেত্তোকে। আর এই কারণেই বোধহয় একজন নারী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ান অপেরা ডিরেক্টর লিন্ডি হিউম আগামী মাসে তার নিজের মতো করে রিগোলেত্তোর মঞ্চস্থ করবেন।

আজকের বিশ্বেও যেমনটা রিগোলেত্তোতে দেখা যায়, পুরুষ অসমভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখছে এবং নারীদের ক্ষমতা অর্জনে তা প্রতিবন্ধক হিসেবে প্রতিনিয়ত ব্যবহার করছে। কিন্তু রাজনীতিতে নারীর এই ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ, তা সে ফ্যাসিস্ট, উদার, গ্রিন বা সমাজতান্ত্রিক যাই হোক না কেন, এটা অন্তত বলা যায় যে, পুরুষের আধিপত্যের দিন শেষ হয়ে আসছে। তাই ট্রাম্পের মতো ‘প্রভাবশালী পুরুষের’ ওই রকম নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখেও বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।

লেখক: নিনা এল. খ্রোশেভা। তিনি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের একজন অধ্যাপক। জেফ্রি টেইলরের সঙ্গে যৌথভাবে লেখা তার সর্বশেষ বইয়ের নাম ‘ইন পুতিনস ফুটস্টেপস: সার্চিং ফর দ্য সোল অব অ্যান এম্পায়ার অ্যাক্রোস রাশিয়া’র ইলেভেন টাইম জোনস।

ইংরেজি থেকে অনূদিত

সূত্র: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

প্রিয় সংবাদ/রিমন