প্রতীকী ছবি

মব জাস্টিস নিয়ে পুরনো লেখা এবং আজকের বাস্তবতা

প্রতিবাদ করতে না পারা মানুষ সঙ্গত এখন ভাবলেশহীন। তাদের হাতের কাছে কোনো সুযোগ এলেই অক্ষমতার ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছে ক্রোধের আগুন। ভালোমন্দের চিন্তা আর কাজ করছে না মস্তিষ্কে।

কাকন রেজা
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক
প্রকাশিত: ২৬ জুলাই ২০১৯, ১৮:৪৬ আপডেট: ২৬ জুলাই ২০১৯, ১৮:৪৯
প্রকাশিত: ২৬ জুলাই ২০১৯, ১৮:৪৬ আপডেট: ২৬ জুলাই ২০১৯, ১৮:৪৯


প্রতীকী ছবি

সাংবাদিক ও লেখক তানজিল রিমন আমার পুরনো দুটি লেখা ট্যাগ করেছে টাইমলাইনে। ‘মব জাস্টিস’ নিয়ে গত বছরের লেখা। প্রথমটির শিরোনাম ছিল, ‘মব জাস্টিস অসহিষ্ণু সমাজ ও বিচারহীনতার প্রতিচ্ছবি’। তৎসময়ে এক তরুণীকে গাড়িতে তুলে ধর্ষণ প্রচেষ্টার সময় এক যুবককে গণধোলাই দেওয়া হয়েছিল, সেটার ওপরই ছিল লেখাটি। সেই ‘মবে’র প্রতিবাদ করেছিলাম। কথাও শুনতে হয়েছিল, ‘তরুণীকে গাড়ি তুলে প্রকাশ্যে ধর্ষণের চেষ্টা করবে, তাকে এমনিতেই ছেড়ে দেওয়া হবে। আপনি তার বিপক্ষেও লেখেন!’

গণধোলাই খাওয়া সেই যুবকের সাথে আমাকেও গালিগালাজ করেছেন কেউ কেউ সে সময়। সরাসরিও কেউ বলেছেন। এরমধ্যে কেউকেটা সাংবাদিকও রয়েছেন। দু’দিন আগে দেখলাম গণপিটুনিতে রেনুর হত্যা নিয়ে হৃদয়বিদারক লেখা লিখেছেন তিনি। বেচারাকে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, তখন যদি আমাকে দোষারোপ না করে, আমার সাথে আপনারাও লিখতেন, তাহলে অবস্থাটা এমন দাঁড়াতো না। মুখের ওপর বললাম না, যদি লেখা পড়েন তাহলে হয়তো লজ্জিত হবেন, যদি লজ্জাটা থাকে।

গত বছর পাঁচেক ধরেই ‘মব জাস্টিসে’র লক্ষণ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। যা পরিপূর্ণতা পেতে শুরু করেছিল গত বছর থেকেই। গত বছরের আগস্ট মাসে দিনাজপুরে রবিউল নামে একজন খুনিকে পুড়িয়ে মেরেছিল ‘লিঞ্চিং মব’। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। খুন এবং খুনের প্রচেষ্টার গুরুতর অভিযোগও ছিল তার বিরুদ্ধে। শেষ খুনটা করার পরই বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এলাকাবাসী এবং তাকে ধরে এনে পুড়িয়ে মারে। এমনি দুটি ঘটনা নিয়েই ছিল আমার দ্বিতীয় লেখাটি। অন্য ঘটনাটি বর্তমানে রিফাত হত্যাকাণ্ডে আলোচিত বরগুনার। সেখানে আল-আমিন নামে এক যুবককে ইভিটিজিংয়ের অভিযোগে গণপিটুনির সাথে চোখও তুলে ফেলা হয়েছিল। আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচানো যায়নি আল-আমিনকে।

সেই লেখা দুটিতে বলেছিলাম কেন মানুষ এমন সহিংস আচরণ করতে পারে, করে। প্রথম ঘটনার ভিক্টিম রবিউল ছিল সন্ত্রাসী। এলাকায় হেন অপকর্ম নেই যা সে করত না। তার পেছনে ছিল রাজনৈতিক শক্তি, যা তাকে দানব হয়ে উঠতে উৎসাহিত করেছিল। তার সন্ত্রাসে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। পুলিশসহ নানা জায়গায় রবিউলের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছিল এলাকার লোকজন কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। যার ফলে অত্যাচারিত মানুষ তার ক্রোধের প্রকাশ ঘটিয়েছিল রবিউলকে পুড়িয়ে মেরে।

‘জাস্টিস ডিলেইড’ মানে ‘জাস্টিস ডিনাইড’। আর সেটাই ‘মব জাস্টিসে’র উত্থানের কারণ। সেই সময়ই সে কথা লিখেছিলাম। মনোবিজ্ঞানের ভাষা তুলে বলেছিলাম, ভয়ের একটা নির্দিষ্ট মাত্রা থাকে, সেই মাত্রা কেটে গেলে মানুষ ভাবলেশহীন হয়ে ওঠে। সেই ভাবলেশহীন মানুষের চিন্তায় প্রতিশোধ ছাড়া অন্য কিছু থাকে না। ‘মব জাস্টিসে’ তাই ‘ডিনাইড জাস্টিসে’র বিপরীতে হয় সরাসরি ‘লিঞ্চিং’। ধরো এবং মারো।

বরগুনার আল-আমিনের ঘটনাটিও ছিল তাই। সে ছিল ইভটিজার, মাদকসেবী, সন্ত্রাসী এবং সাথে রাজনৈতিক প্রশ্রয়দুষ্ট। নয়ন বন্ডের অগ্রজ আর কী। সে সময় মানুষ সইতে না পেরে ‘ডিলেইড’ এবং ‘ডিনাইড’ জাস্টিসের বিপরীতে আল-আমিনকে ‘লিঞ্চিং’য়ে দিয়েছিল।

প্রথমে ‘ক্রাউড’, পরে ‘মব’, তারপর ‘লিঞ্চিং’। এই যে প্রক্রিয়া, এটা সৃষ্ট বিচারহীনতা থেকে। অপরাধ বিজ্ঞান অন্তত তাই বলে। আজ গণপিটুনির যে ঘটনা তা তারই ধারাবাহিকতা। ‘মবে’র হাতে রেনুর মৃত্যুর পর নড়েচড়ে বসেছে সরকার ও প্রশাসন। মাইকিং করা হচ্ছে, গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে, সামাজিকমাধ্যমে মোটিভেশন চলছে, সভা-সেমিনারে কর্তা ব্যক্তিরা বক্তব্য দিচ্ছেন। কিন্তু কাজ হচ্ছে কি, হলে রেনুর পরে অন্য কেউ মারা যেত না।

২৪ জুলাই, বুধবার যখন এ লেখা লিখছি, সেদিনও সাভারে সন্তান দেখতে যাওয়া এক মাকে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। হতভাগ্য সেই মায়ের নাম সালমা বেগম। এর আগেও বলেছি, এখনও বলছি, ‘সময় গেলে সাধন হয় না’, আসলেই হয় না।

‘মব লিঞ্চিং’য়ের শিকার রেনুর হত্যাকারীদের অন্যতমসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের গ্রেফতারের খবর, ছবি, ভিডিও মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছে গণ ও সামাজিকমাধ্যমে। কিন্তু এরপরেও কিন্তু সালমা বেগম মারা গেছেন। মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলেও আরো জায়গাতেও গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। সময়ের সাথে সাধনের সম্পর্কটা এই জায়গাতেই।
যুগান্তর অনলাইন এ বিষয়ে আমার আমার একটি লেখা প্রকাশ করেছিল, ‘গণপিটুনি: অক্ষমের ক্রোধ বড় ভয়ংকর’ শিরোনামে। সেখানে উদ্ধৃত হয়েছিল, প্রতিবাদ করতে না পারার অক্ষমতা মানুষকে ক্রমেই ভাবলেশহীন করে তুলছে। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের, নিজেদের প্রতি ঘটে যাওয়া অমানবিকতার প্রতিবাদ করতে পারছেন না মানুষ। একটা ভয়ের সংস্কৃতি ঘিরে রেখেছে সামাজিক পরিবেশ। তখন সঙ্গতই মানুষ নিজের কাছে নিজে অপরাধী হয়ে পড়ছে। নিজের এই না পারার দুর্বলতায় মনের পরতে-পরতে জমে উঠেছে ক্রোধের আগুন।

আগুন যখন জ্বলে ওঠে, তখন আর ভালোমন্দ কিছুই দেখে না, তেমনি মানুষের ক্রোধের আগুনও ভালোমন্দ কিছুই দেখছে না। প্রতিবাদ করতে না পারা মানুষ সঙ্গত এখন ভাবলেশহীন। তাদের হাতের কাছে কোনো সুযোগ এলেই অক্ষমতার ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছে ক্রোধের আগুন। ভালোমন্দের চিন্তা আর কাজ করছে না মস্তিষ্কে। আর সেই চিন্তাহীন কাজই হলো ‘মব জাস্টিস’, আজকের সময়ে যার নাম ‘গণপিটুনি’।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]