সুতিভোলা খাল ভরাট করে দখল করেছেন মো. আবু সাঈদ। ছবি: রাকিব হাসান

খাল খাচ্ছেন আবু সাঈদ!

ভাটারার সাঈদনগর থেকে প্রবাহিত হয়ে আসা খালের অংশটি মৃতপ্রায়। খালের এই শাখাটি হত্যা করতে শেষ পেরেকটি ঠুকছেন হাজী মো. আবু সাঈদ। শুধু খালের এই শাখাটি নয়, প্রায় ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের ব্রিজের নিচ থেকে দুই-তৃতীয়াংশ জমি ভরাট করছেন তিনি।

প্রদীপ দাস
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২ মার্চ ২০১৮, ২৩:১৬ আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০১৮, ১৮:৩২
প্রকাশিত: ০২ মার্চ ২০১৮, ২৩:১৬ আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০১৮, ১৮:৩২


সুতিভোলা খাল ভরাট করে দখল করেছেন মো. আবু সাঈদ। ছবি: রাকিব হাসান

(প্রিয়.কম) রাজধানীর বাড্ডার নতুন বাজার থেকে ১০০ ফিট সড়ক হয়ে বেরাইদের দিকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে পাঁচ থেকে সাত মিনিট চললেই এক নম্বর ব্রিজ। স্থানীয়দের কাছে ব্রিজের এই অংশ একসময় পরিচিত ছিল ‘তিনমুখী’ নামে। কারণ হাতিরঝিল থেকে আফতাবনগর-সাঁতারকুল হয়ে সুতিভোলা খালটি এই ব্রিজের নিচ দিয়ে বালু নদীতে গিয়ে মিশেছে। নতুন বাজার-সাঈদনগর থেকে খালের একটি শাখা এসে এই ব্রিজের নিচে মিশেছে। তিন দিকে খালের তিনটি অংশ চলে যাওয়ায় এটি ‍তিনমুখী ব্রিজ নামে পরিচিত।

তবে এখন আর এক নম্বর ব্রিজকে ‘তিনমুখী’ বলার সুযোগ নেই। কারণ ভাটারার সাঈদনগর থেকে প্রবাহিত হয়ে আসা খালের অংশটি মৃতপ্রায়। খালের এই শাখাটি হত্যা করতে শেষ পেরেকটি ঠুকছেন মো. আবু সাঈদ। শুধু খালের এই শাখাটি নয়, প্রায় ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের ব্রিজের নিচ থেকে দুই-তৃতীয়াংশ জমি ভরাট করছেন তিনি।

সাঈদনগর থেকে আসা খালের একটা অংশ (ডানে নালার মতো) সুতিভোলা খালে এসে মিশেছে। খালের বুকে মাটি ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। ছবি: রাকিব হাসান

নতুন বাজার এলাকা থেকে প্রবাহিত হয়ে আসা শাখা খালটি মাত্র তিন থেকে চার ফুট প্রস্থের পানি নিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। খালের একপাশে বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পের দেয়াল, অন্য পাশে মাটি ফেলছেন হাজী মো. আবু সাঈদ।

নদী নিয়ে কাজ করছে এমন একটি সংগঠন ‘রিভারাইন পিপল’। সংগঠনটির মহাসচিব শেখ রোকন জানান, নদীর সাধারণ যে প্রস্থ থাকে তাতে নদীর তিনটা শাখা যখন মিলিত হয় তখন মিলিত অংশের প্রস্থ অনেক বেড়ে যায়। ঠিক একই কথা খালের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

দীর্ঘদিন ধরেই নদী-খাল দখল হয়ে আসছে। নদীগুলোকে খাল উল্লেখ করে একটি শ্রেণি নদী দখল করছে। সুতিভোলাও নদী, কিন্তু এটিকে খাল উল্লেখ করে দখলকে জায়েজ করার চেষ্টা চলছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শেখ রোকন।

১৬ থেকে ১৭ বছর আগে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় আসেন ৩০ বছর বয়সী আলী হোসেন। ঢাকায় আসার পর তিনি এই শাখা খালে মাছ ধরতেন। আলী হোসেন বলেন, ‘আগে এই খাল (সাঈদনগর থেকে আসা) অনেক বড় দেখছিলাম। পানি ভরা খালের এই দিক দিয়া নৌকা গেছে। সাইদনগর পর্যন্ত এই খাল দিয়া নৌকা যাইত। খালডা সবাই দহল কইরা হালাইছে। এই খাল দিয়ে মানুষ অহনা আইট্টাও যাহাইতো (যেতে পারবে) না। আইটক্যা পড়ব শইল (শরীর)।’

একপাশে বসুন্ধরার দেয়াল ও অন্যপাশে দেয়াল তুলেছেন আবু সাঈদ। ৩ থেকে ৫ ফুট প্রশস্ত হয়ে পানি যাচ্ছে সুতিভোলা খালে। ছবি: রাকিব হাসান

১৯৯৮ সাল থেকে ঢাকায় বসবাস করা এক ব্যক্তি বলেন, ‘আগে মুজ্জাম্মেল চেয়ারম্যান বাড়ির বারোবিঘা পর্যন্ত নৌকা যাইত। আইয়া মালটাল নামাইতো। এহন তো মাল আহে এক নাম্বার বিরিজের পূর্ব পর্যন্ত। হেন্থনে অটো দিয়া মাল লইয়া আনন লাগে। এহন তো আর খাল নাই। বাড়িঘর হইয়া গেছে।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্রিজের অংশে খাল ভরাট ঢাকতে কিছু মানুষকে ফুলের নার্সারি করার সুযোগ দিয়েছেন আবু সাঈদ। তারা রাস্তার পাশে ফুলের চারা বিক্রি করে আয় করছেন। এ ছাড়াও কয়েকজন সেখানে দোকান চালাচ্ছেন, তাদেরও ভাড়া দিতে হয় না। এসব ফুলের নার্সারি ও দোকানের কারণে খাল ভরাট অনেকটাই খাল ভরাট আড়াল হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধিত) আইন, ২০১০-এর ৪ নম্বর ধারার `৬ঙ’ উপ-ধারায় বলা আছে, ‘আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গা ভরাট বা অন্য কোনোভাবে শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না।’

এই আইনের ২ নম্বর ধারার ‘কক’ উপ-ধারায় বলা হয়েছে, ‘জলাধার অর্থ নদী, খাল, বিল, হাওড়, বাওড়, দীঘি, পুকুর, ঝরনা বা জলাশয় হিসেবে সরকারি ভূমি রেকর্ডে চিহ্নিত ভূমি...।’

৪ নম্বর ধারার ‘৬ঙ’ উপ-ধারা লঙ্ঘন করলে প্রথমবার অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। পরবর্তীতে প্রতিবার অপরাধের ক্ষেত্রে অন্যূন দুই বছর, অনধিক ১০ বছর কারাদণ্ড বা অন্যূন দুই লক্ষ টাকা, অনধিক ১০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

খালের আড়াই মাস আগের চিত্র

২০১৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর গিয়ে দেখা যায়, সাঈদনগর থেকে এসে এক নম্বর ব্রিজে মেশা শাখা খালটির একপাশে দেয়াল তুলেছে বসুন্ধরা গ্রুপ। এই শাখা খালটির অন্য পাশের ভূমিতে মাটি ফেলছেন হাজী আবু সাঈদ। তবে তখনও তিনি খালের পাশ ঘেঁষে দেয়াল তুলেননি। চার থেকে পাঁচ ফুটের একটি ধারা বইছে এই শাখা খাল দিয়ে।

১৭ ডিসেম্বরের চিত্র ভিডিওতে

ব্রিজের ঠিক নিচে পশ্চিম দিক থেকে মাটি ফেলা হচ্ছে হাজী আবু সাঈদের নির্দেশে। খালের কিছু জায়গা মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। আবার মাঝে মাঝে কিছু কিছু জায়গা ফাঁকা থেকে গেছে।

এক মাস আগের চিত্র

২০১৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি গিয়ে দেখা যায়, বুলডোজার দিয়ে মাটি ফেলা অব্যাহত রেখেছেন হাজী আবু সাঈদ। ১৭ ডিসেম্বর যে পর্যন্ত মাটি ফেলা হয়েছে, তা বৃদ্ধি পেতে পেতে ২৫ থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত ব্রিজের ভিতরে চলে গেছে।

২ ফেব্রুয়ারির চিত্র ভিডিওতে

বর্তমান চিত্র  

২ মার্চ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এক নম্বর ব্রিজে গিয়ে দেখা যায়, সাঈদনগর থেকে আসা শাখা খালটি ৭ থেকে ৮ ফুট জায়গা রেখে দেয়াল তুলেছেন আবু সাঈদ। অন্যপাশে আগে থেকেই দেয়াল ছিল বসুন্ধরা গ্রুপের। নালার মতো করে ৩ থেকে ৫ ফুট প্রশস্ত হয়ে শাখা খালের পানি বয়ে চলেছে।

২ মার্চের চিত্র দেখুন ভিডিওতে

অন্যদিকে শাখা খাল ও সুতিভোলা খালটি যেখানে এসে মিলিত হয়েছে, সেখানে প্রায় পুরোটাই ভরাট করা হয়েছে। প্রায় ২০০ মিটার দৈর্ঘ্য ব্রিজের পাশে খালের দুই-তৃতীয়াংশ এখন মাটির নিচে। এখন চলছে দেয়াল তুলে সীমানা বসানোর কাজ।

 

ভরাট শেষে এখন চলছে দেয়াল তৈরির কাজ। ছবি: রাকিব হাসান

ঢাকা ওয়াসার কাছে মোট ২৬টি খালের তালিকা রয়েছে। কিন্তু এর বাইরেও রয়ে গেছে ছোট-বড় অনেক খাল। এমন একটি খাল ভাটারার সাঈদনগরের দিক থেকে এসে সুতিভোলা খালে মিশে যাওয়া শাখা খাল। এ সম্পর্কে হাজী মো. আবু সাঈদ প্রিয়.কমকে বলেন, ‘এই খাল আরএস খতিয়ানে (১৯৯০ সালের দিকে এই খতিয়ান হয়) নাই। মহানগর জরিপে আছে।’

তিনি জানান, সাঈদনগরের দিক থেকে আসা শাখা খালের প্রস্থ ২৫ থেকে ২৮ ফুট। আর সাঁতারকুল দিয়ে আসা সুতিভোলা খালের প্রস্থ ৬০ ফুট।

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সীমানার ঘেঁষে আসা শাখা খালটি ৫ থেকে ৭ ফুটের বেশি দেখা যাচ্ছে না জানালে আবু সাঈদ বলেন, ‘না-না, ২৮ ফুটই!’

তিনি বলেন, ‘বসুন্ধরা মাইপ্পা, হেরা খুডা (খুঁটি) গাড়ছে। আমরাও খুডা গাড়তাছি।’

ব্রিজের নিচে দুটি পিলার রয়েছে। এর মধ্যে পূর্ব দিকের একটি পিলার দেখিয়ে আবু সাঈদ দাবি করেন, ‘ওই পর্যন্ত মূলত খাল। বাকিটুকু আমার নিজের জমি।’

তিনি বলেন, ‘সরকার আমাদের কাছ থেকে অ্যাকুয়ার (অধিগ্রহণ) কইরা নিছে, ওইটুকু আমরা ছাইড়া দিয়াই কাজ করতাছি। আমার কাছে নকশা আছে। সরকার আমার কাছ থেকে ১১ বিঘা জমি নিছে, নিয়াই ব্রিজ করছে।’

গাড়ির ভেতর হাজী মো.আবু সাঈদ। ছবি: রাকিব হাসান

‘এখনও ১০০ ফুট আছে। থাকব ৬০ ফুট। এইখানে মোড় আছে তো, হের লাইগা আমরাও কিছু জমি ছাইড়া দিছি, বসুন্ধরাও কিছু জমি ছাইড়া দিছে। আমরা ১০ ফুট ছাইড়া দিছি এই জন্যে খাল ভবিষ্যতে অইব, ভালো অইব’, যোগ করেন সাঈদ।

দেয়াল তোলা প্রসঙ্গে আবু সাঈদ বলেন, ‘ওয়াসা ব্রিজের পাশ দিয়া ২০ ফুট অ্যাকুয়ার করব। আমরা হেইজন্য তাড়াতাড়ি জমি বেড়া দিতাছি। কারণ তারা অ্যাকুয়ার কইরা বিল দিতো না।’

ঢাকার সব খালের মালিকানা জেলা প্রশাসনের। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিনকে ৬ ফেব্রুয়ারি ফোন করা হয়। তিনি ফোন রিসিভ না করলে পরের দিন আবার ফোন করা হয়। ওই দিনও ফোন রিসিভ না করলে মেসেজ (বার্তা) পাঠানো হয়। তারপরও ফোন বা ফিরতি কল করেননি তিনি। এরপর ২ মার্চ আবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

প্রিয় সংবাদ/রিমন