ছবি সংগৃহীত

এ কেমন সাংবাদিকতা!

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় মারধরের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ-বিক্ষোভের ঘটনাকে ‘জঙ্গি’ হামলা আখ্যা দিয়ে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রিয় ডেস্ক
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ০৩ মার্চ ২০১৭, ১৬:১৮ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ২২:৩২
প্রকাশিত: ০৩ মার্চ ২০১৭, ১৬:১৮ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ২২:৩২


ছবি সংগৃহীত

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম)
 রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় মারধরের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ-বিক্ষোভের ঘটনাকে ‘জঙ্গি’ হামলা আখ্যা দিয়ে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাংবাদিক, শিক্ষকসহ দেশের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ।

দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ওই সংবাদকে ‘নিচু ও মিথ্যা সাংবাদিকতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন কেউ কেউ। অনেকে আবার ওই গ্রুপের সংবাদমাধ্যমকে ‘টিস্যু পেপারে’র সঙ্গেও তুলনা করেছেন। আর প্রমাণ ছাড়া কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে এ ধরনের সংবাদকে অপরাধ হিসেবেও দেখছেন অনেকে।

গত ১ মার্চ বুধবার রাতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ফটকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার হাসনাত তপুর মোটরসাইকেল পার্কিংকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে তপুকে মারধর করে নিরাপত্তারক্ষীরা। খবর ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা যায়। এ নিয়ে রাতেই রাস্তায় নেমে আন্দোলন শুরু করেন বিক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীরা।

পরের দিন ২ মার্চ বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। এ সময় আবাসিক এলাকায় অবস্থিত বসুন্ধরা গ্রুপের প্রধান বাণিজ্যিক কার্যালয়সহ বেশ কয়েকটি স্থাপনায় ভাঙচুর করেন।

এ ঘটনা নিয়ে ৩ মার্চ শুক্রবার বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন পত্রিকা কালের কণ্ঠবাংলাদেশ প্রতিদিনডেইলি সান, অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলানিউজ২৪.কম ও টেলিভিশন নিউজ ২৪-এ নর্থ সাউথের শিক্ষার্থীদের ‘জঙ্গি’ আখ্যায়িত করে সংবাদ পরিবেশন করা হয়।

এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে করা এমন সংবাদ নিয়ে ‘উপহাস’ করেছেন চ্যানেল আই অনলাইনের এডিটর জাহিদ নেওয়াজ খান। ফেসবুকে নিজের টাইম লাইনে তিনি লিখেছেন, ‘এ কেমন জঙ্গিগোষ্ঠী যাদের বিরুদ্ধে পুলিশ এক রাউন্ড টিয়ার শেলও ছুড়ে না! সাংবাদিকতা বিভাগ যা শিখিয়েছে তাতে আর হচ্ছে না। উচ্চতর এবং ফলিত সৃজনশীল সাংবাদিকতা কোর্স চালু করা এখন সময়ের দাবি।’

নিজে সাংবাদিক হয়ে সংবাদমাধ্যমে এমন সংবাদ প্রকাশের ‘ক্ষোভ’ প্রকাশ করেছেন সময় টেলিভিশনে কর্মরত ওমর ফারুক। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমি সাংবাদিক হইছি কেন? গণমাধ্যমে আস্থা নাই তাই।’

বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ফল নিয়ে শঙ্কা জানিয়েছেন দৈনিক ইত্তেফাক-এর সাংবাদিক আমির মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘কি ভয়াবহ ব্যাপার! বসুন্ধারা গ্রুপের কাজকামে প্রতিবাদ করলেই জঙ্গি!’

সংবাদপত্রকে টিস্যু পেপারের সঙ্গে তুলনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘নিউজপেপার আর টিস্যুপেপারের মধ্যকার পার্থক্য বোঝার একটা বড় উদাহরণ বসুন্ধরার কর্মী আর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যকার সংঘর্ষের ঘটনা।’

সাংবাদিকতার জন্য বিজ্ঞাপনের চেয়ে মেরুদণ্ড জরুরি বলে মনে করেন দেশের একাধিক গণমাধ্যমকে কাজ করা এই অধ্যাপক।

আর পাকিস্তান প্রবাসী সাংবাদিক মাসকাওয়াথ আহসান মনে করেন, রাজনৈতিক দল ও ব্যবসায়ী চক্রের দাপটে সাংবাদিকতা ‘পিষ্ট’। তিনি বলেন, ‘…সমস্যা সাংবাদিকতায় নয়। রাজনৈতিক দল ও ব্যবসায়ী চক্রের অর্ধশিক্ষিত মণ্ডলেরা মিডিয়ার আজকের এই দূষণের মূল কারণ।’

কোনো তথ্য প্রমাণ ছাড়া শিক্ষার্থীদের এভাবে জঙ্গি বলাকে অপরাধ হিসেবেই দেখছেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার। ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, ‘তথ্য প্রমাণ ছাড়া কাউকে জঙ্গি বলা গুরুতর অপরাধ। একইভাবে স্বঘোষিত নাস্তিক না হলে কাউকে নাস্তিক বলাও অপরাধ। উভয় ক্ষেত্রেই নাগরিক সচেতনতা প্রয়োজন।’

প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে সাংবাদিকের চেয়ে সংবাদ প্রতিষ্ঠানের মালিকদের দিকে আঙুল তুলেছেন এটিএন নিউজ-এর হেড অব নিউজ প্রভাষ আমিন

তিনি বলেন, ‘মালিক কতটা ভালো, তার ওপর নির্ভর করে সাংবাদিকতার ভালো-মন্দত্ব। সরকারি নিয়ন্ত্রণের দরকার নেই, এমনিতেই কত নিয়ন্ত্রক। বাংলাদেশে সাংবাদিকরা ততটাই স্বাধীন, হাত-পা বেঁধে কুমির ভরা নদী সাঁতরে পেরুতে বলা লোক যতটা নিরাপদ।’

তবে বিষয়টিকে এভাবে দেখছেন না ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন-এর নিউজ এডিটর সঞ্জয় দে। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকতাকে বিপর্যস্ত করার দায় কি শুধু মালিকের? আমার তা মনে হয় না।’

আর শিক্ষার্থীদের ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে প্রকাশিত সংবাদকে হাস্যকর মনে করে তিনি আরও বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়া যৌক্তিক পদ্ধতিতে সাংবাদিকতার রীতি মেনেই নর্থ সাউথের শিক্ষার্থীদের লাগামহীন ভাঙচুর নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারতো, কিন্তু মালিকপক্ষকে অতিরিক্ত তোষণ করার উদ্দেশ্যে জঙ্গিবিষয়ক গালগল্প ছেপে পুরো বিষয়টিকেই তারা হাস্যকর করে ফেলেছে। এতে শুধু সাংবাদিকতার নয়, বারোটা বেজেছে অন্নদাতা মালিকেরও...’

ইস্ট ওয়েস্ট গ্রুপ মিডিয়ার এমন সংবাদ প্রকাশের জন্য নিজে সাংবাদিক হয়ে তিরষ্কার করেছেন প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার শরিফুল হাসান। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পেটাবেন আপনাদের পোষা দা‌রোয়ান দিয়ে। ছাত্ররা প্রতিবাদ করলে টিয়ারশেল মারবে পুলিশ। আপনাদের পোষা মিডিয়াগুলো তখন লিখবে জঙ্গি। ধিক, এই সাংবাদিকতাকে! একজন সাংবাদিক হি‌সে‌বে আমি ল‌জ্জিত। ন্যায্য যে কোনো আন্দোলনে সবসময় আমার সমর্থন আছে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের তাই সমর্থন জানাচ্ছি।’

শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক ফজলুল বারী। সমর্থন জানিয়ে ফেসবুক সেলিব্রেটি আশীফ এন্তাজ রবি লিখেছেন, ‘‘নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ‌‘জঙ্গি’দের সাথে আছি। কালের কণ্ঠের ‘সাংবাদিক’দের সাথে নেই।”

বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন সংবাদ মাধ্যমকে ধন্যবাদ জানিয়ে স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক কাজী আনিছ ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ক্লাসে হলুদ সাংবাদিকতার পুরনো উদাহরণ দিতে দিতে টায়ার্ড। পোলাপাইনও চিন্তা করে, ছারের স্টকে মনে হয় আর কিছু নাই।’

তিনি লিখেছেন, ‘কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, বাংলা নিউজ আর নিউজ টুয়েন্টিফোরকে ধন্যবাদ। আপনারা না থাকলে আমরা জ্ঞানী ভাব ধরে টিচারি করতে পারতাম না।’

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের ঘটনায় যে সংবাদগুলো প্রকাশ করেছে ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়াগ্রুপ

৩ মার্চ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত সংবাদ। 

৩ মার্চ দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত সংবাদ। 

গ্রুপটির ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি সানে প্রকাশিত সংবাদ।

গ্রুপটির অনলাইন পত্রিকা বাংলানিউজ২৪.কমে প্রকাশিত সংবাদ। এ নিয়ে একই ধরনের সংবাদ পরিবেশন করে বসুন্ধরা গ্রুপের টেলিভিশন চ্যানেল২৪।

এ ধরনের সংবাদের কারণে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে বলে জানিয়েছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহ জাদা। শিক্ষার্থীদের জঙ্গি আখ্যায়িত করে ওইসব সংবাদ প্রসঙ্গে ফেসবুকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে একটি ভিডিও-ও পোস্ট করেন তিনি। ৩ মার্চ সকালে পোস্ট করা ও ভিডিওতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিও আকর্ষণ করেছেন।

সঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, কোথায় আপনি? আজ যে যেভাবে পারছে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। কোনো কিছু না জেনে আমাকে নিকৃষ্টতম নামে আখ্যায়িত করে দিলো। আমার পরিবার আমি সবাই আজ রিস্কের মধ্যে। কেন? কেন আমাকে এভাবে ফাঁসানো হলো?’

ওই ভিডিওতে শাহ জাদা বলেন, শিক্ষার্থী তপুর ওপর হামলা হয়েছে, এজন্য আমি সবাইকে থাকতে বলেছিলাম। একটা ছেলে শুধু ‘ইনশাল্লাহ’ বললে সে হিজবুত তাহরীর হয়ে যায়? সে জঙ্গি হয়ে যায়? একজন মুসলমান হিসেবে আমি এ শব্দটা ব্যবহার করতে পারি না?

আরও পড়ুন:
** মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে কেন ফাঁসানো হলো, নর্থ সাউথ শিক্ষার্থীর প্রশ্ন (ভিডিও)

 

প্রিয় সংবাদ/খোরশেদ/আলম