রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায় এই জমিতে তাবু পোঁতেন আনসার স্ট্রাইকিং ফোর্সের সদস্যরা। ছবি: প্রিয়.কম

বসুন্ধরায় জমি নিয়ে মুখোমুখি আনসার-‘মামা বাহিনী’

আনসার স্ট্রাইকিং ফোর্সের ভাষ্য, তারা জমিটিতে তাবু পুঁততে গিয়েছিল। সে সময় বাধা দিতে আসে বসুন্ধরা গ্রুপের ‘মামা বাহিনী’র লোকজন। মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

প্রদীপ দাস
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪ এপ্রিল ২০১৮, ২৩:৩৮ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ১৩:৩২
প্রকাশিত: ০৪ এপ্রিল ২০১৮, ২৩:৩৮ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ১৩:৩২


রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায় এই জমিতে তাবু পোঁতেন আনসার স্ট্রাইকিং ফোর্সের সদস্যরা। ছবি: প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) রাজধানীর ভাটারা থানাধীন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে আনসার স্ট্রাইকিং ফোর্স ও কথিত মামা বাহিনীর লোকজন।

ওই এলাকায় গিয়ে ও বিবদমান দুটি পক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের খবর পেয়ে ৪ এপ্রিল, বুধবার বিকেলে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় যান এই প্রতিবেদক। এর আগে দুপুর ১২টার দিকে আনসার স্ট্রাইকিং ফোর্সের সদস্যদের সঙ্গে স্থানীয় লোকজনের সংঘর্ষ হয়। এতে  আমান উল্লাহ ডালি (৪৯) ও মোসাদ্দেক হোসেন আশিক (১৮) নামের স্থানীয় দুজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। তাদের মামা বাহিনীর লোক বলে দাবি করেছেন আনসার স্ট্রাইকিং ফোর্সের সদস্যরা। 

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ২৬৫২ নম্বর প্লটের মালিক তাজুল ইসলাম ও ১৬৭২ নম্বর প্লটের মালিক, আহত আমান উল্লাহ ডালি জানান, বিরোধপূর্ণ জমিটি প্রয়াত মনসুর আলীর। তিনি বহু আগে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের কাছ থেকে জমিটি কেনেন। তার ছেলে ফাহাদ মাদবর এখন সেই জমি ভোগ দখল করছেন। ৪ এপ্রিল দুপুর ১২টার দিকে আনসার স্ট্রাইকিং ফোর্সের সদস্যরা রামকৃষ্ণ নামে এক হিন্দুকে ধরে এনে সেই জমি দখল করতে আসে। এতে বাধা দিলে আমান উল্লাহসহ দুজন আহত হন।

আনসার স্ট্রাইকিং ফোর্সের ভাষ্য, তারা জমিটিতে তাবু পুঁততে গিয়েছিল। সে সময় বাধা দিতে আসে বসুন্ধরা গ্রুপের ‘মামা বাহিনী’র লোকজন। মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

বাহিনীর একাধিক সদস্য জানান, জমির প্রকৃত মালিক রামকৃষ্ণ ওই জমি পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে আনসার বাহিনীকে দিয়ে দিয়েছে। তাই তারা সেই জমিতে তাবু পুঁততে গিয়েছিলেন। ওই সময় মামা বাহিনী এসে তাদের কাজে বাধা দেয়।

আনসার স্ট্রাইকিং ফোর্স আরও বলছে, গুলশান এলাকার কূটনীতিকপাড়ার নিরাপত্তা দিতে তাদের এই ভাটারা এলাকায় থাকা প্রয়োজন। তাই তারা যাচাই-বাছাই করে এই এলাকায় নিজস্ব তহবিল থেকে জমি কিনছে। নিজেদের প্রয়োজনে এই এলাকায় তারা প্রকৃত মালিকদের কাছ থেকে আরও কিছু জমি কিনবে।

বসুন্ধরা গ্রুপের ভাষ্য

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বসুন্ধরা গ্রুপের প্রেস অ্যান্ড মিডিয়া অ্যাডভাইজার মো. আবু তৈয়ব বলেন, ‘ওই জমিগুলো ইতোমধ্যে প্লট করে মালিকের কাছে দিয়ে দিয়েছি। আনসার (স্ট্রাইকিং ফোর্সের সদস্যরা) একটু দুষ্টু প্রকৃতির লোক। তারা দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাস করছে। স্থানীয় লোকজনের জমি তারা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। ওরা স্থানীয়দের ডিস্টার্ব করছে।’

এসব কথা বলার পর আবু তৈয়ব বসুন্ধরা গ্রুপের আরেক কর্মকর্তা রেজার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। তার কথামতো রেজাকে কল করা হলে প্রথমবার রিসিভ হয়নি। পরেরবার তিনি কলটি কেটে দেন।

ঘটনাটি ব্যাখ্যা করে ভাটারা থানাধীন এলাকায় দায়িত্বরত আনসার স্ট্রাইকিং ফোর্সের অ্যাডমিন অফিসার মো. ফরিদ রহমান বলেন, ‘রামকৃষ্ণ এক সময় তার বাপদাদার জমি চাষাবাদ করত। পরবর্তীতে এখানে বসুন্ধরা-বসুমতি বালু ফেলে। রামকৃষ্ণের আত্মীয়-স্বজনদের প্রায় ২৫ কাঠা জমি রয়েছে এখানে। এর মধ্যে ১৫ কাঠা রামকৃষ্ণের। কিন্তু উনি সর্বশেষ রেকর্ডে উনার নাম উঠাতে পারেননি।

যখন বসুন্ধরা উনার জমিতে দেয়াল উঠাচ্ছিল, তখন তিনি আমাদের সদর দফতরে যোগাযোগ করেন। তার কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে, জমির মালিক রামকৃষ্ণ। তিনি রেকর্ড করেননি, অন্যজন রেকর্ড করে নিয়ে গেছে।’

ফরিদ রহমান বলেন, ‘‘রামকৃষ্ণ যেহেতু জমি উদ্ধার করতে পারছে না, তাই সাব-রেজিস্ট্রির মাধ্যমে রামকৃষ্ণ আমাদের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়ে দিছেন। এখন আমরা রেকর্ড করে নিয়ে নিব। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেওয়ায় আমরা আইনগতভাবে ওই জমিতে সবকিছু করতে পারব। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়ে রামকৃষ্ণ নিজেই বলছে, এটা আমার জায়গা।

১৫ কাঠা জমি আমরা যখন দখল করতে গেছি, তখন বসুন্ধরা গ্রুপের ‘মামা বাহিনী’ আসলো। তারা বলল, এটা আমাদের। আমরা বললাম, যদি আপনাদের কাগজ থাকে নিয়ে আসেন, যদি আপনাদের কাগজ থাকে, আমি জমি ছেড়ে চলে আসব। এটুকু কথা হওয়ার পর রামকৃষ্ণকে নিয়ে আসি। এরপর আমাদের লোকজন মাত্র দুইটা তাঁবু গাড়ছে। এর মধ্যে তাদের বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষের মামা বাহিনীর লোকজন এসে আমাদের সিনক্রিয়েট করতে থাকে। কিন্তু তারা কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।’’

আনসার স্ট্রাইকিং ফোর্সের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘রামকৃষ্ণ দাস যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, জানালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আছে, তারা নিরাপত্তা বিধান করবে। রামকৃষ্ণ নিরাপত্তা চাইলে আমরাও সার্বিকভাবে সহযোগিতা করব।’

রামকৃষ্ণের বাড়িতে যাওয়ার পর...

রামকৃষ্ণ দাসের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি দুপুরে একবার এসেছিলেন। তারপর বেরিয়ে যান। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বাড়ি ফেরেননি তিনি।

রামকৃষ্ণ পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তার বাড়িতে অবস্থান করে দেখা যায়, তাকে কল করছে তার ছেলে। কিন্তু নম্বর বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ওই সময় তার ছেলেকে বারবার বলতে শোনা যায়, ‘বাবারে বলছিলাম, যা আছে তাই নিয়ে থাকো। জমি নিয়া কাপজাপ করার দরকার নাই।’

একপর্যায়ে আনসার বাহিনীর এক কর্মকর্তাকে ফোন করে নিরাপত্তাহীনতার কথা জানান রামকৃষ্ণের সন্তান।

পুরো বিষয় নিয়ে যা বলল আনসার স্ট্রাইকিং ফোর্স

ঘটনার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে ভাটারার আনসার স্টাইকিং ফোর্সের অ্যাডমিন অফিসার মো. ফরিদ রহমান জানান, হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর সরকারের লোকজন নড়েচড়ে বসে। তারা কূটনীতিকপাড়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে নজর দেয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনসার বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ‘আনসার স্ট্রাইকিং ফোর্স’ নামে একটি বিশেষ দল গঠন করে। এরপর থেকে গুলশানের কূটনীতিকপাড়ায় পুলিশের পাশাপাশি এই বাহিনীও অধিকতর নিরাপত্তা বিধান করে আসছে।

ফরিদ জানান, ভাটারার বসুমতি আবাসিক প্রকল্পে সাধারণ আনসারদের আগে থেকেই একটা ক্যাম্প ছিল। ওই ক্যাম্প থাকার পরিপ্রেক্ষিতে আনসার সদস্যরা আশপাশে থাকা যায় কি না, সেই চিন্তা-ভাবনা করে। একপর্যায়ে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার পার্শ্ববর্তী বসুমতি আবাসিক প্রকল্পের সঙ্গে চুক্তি হয় তাদের। তারপর থেকে আনসার সদস্যরা বসুমতির স্থাপনায় অবস্থান করছিলেন।

‘এভাবে থাকছিলাম। এর মধ্যে বসুন্ধরার নজরে পড়ি আমরা। বসুন্ধরা ভাবছিল, আমরা বোধহয় এই জমিগুলো দখল করে ফেলব। আমরা আসলে কারো জমি দখল করতেও আসি নাই, আবার কারো জমি পাহারা দিতেও আসি নাই। একপর্যায়ে বসুন্ধরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রীর কাছে লিখছেন, আমাদেরকে উচ্ছেদ করার জন্য যে, বসুন্ধরার কেনা জায়গা আমরা দখল করে আছি। পরে দেখা গেল, এগুলো বসুন্ধরার জায়গা না বসুমতিরই জায়গা’, বলেন ফরিদ।

‘আমাদের ওপর যখন চাপ আসতে শুরু করল, তখন আমাদের মহাপরিচালক বললেন, আমাদের যেহেতু সেখানে থাকা দরকার, সে ক্ষেত্রে কিছু জমি আনসারের কল্যাণ তহবিল থেকে কেনা যায় কি না। এরপর আমরা এখানকার স্থানীয় মানুষের কিছু জমি কেনার চেষ্টা করি। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে যাদেরকে জমির বৈধ মালিক মনে হয়েছে, কিন্তু বসুন্ধরার গ্রুপের কারণে ভোগ-দখল করতে পারছে না, তাদের জমি কিনেছি। ইতোমধ্যে আমরা বেশ কিছু জমি রেজিস্ট্রি করেছি। এ রকম আরও প্রকৃত জমির মালিক যদি আমাদের কাছে জমি বিক্রি করতে আসে, তাহলে আমরা কিনব’, যোগ করেন ফরিদ। 

ভাটারা থানার ভাষ্য

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম কামরুজ্জামান বলেন, একজনের প্লট নিয়ে আনসারদের সঙ্গে এলাকাবাসীর মারামারি হয়েছিল। তবে কেউ হতাহত হয়নি। এ ঘটনায় কেউ মামলাও করেনি।

প্রিয় সংবাদ/আজহার