একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করছেন শ্রমিকরা। ছবি: সংগৃহীত

ঈদ এলেই আন্দোলন, জোটে না বোনাস-বেতন

প্রতি বছরই বেতন-বোনাসের জন্য পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন-বিক্ষোভ করতে হয়। সরকারসহ পোশাকশিল্পের মালিকরা প্রতিশ্রুতি দিলেও তার বাস্তবায়ন দেখা যায় না।

প্রদীপ দাস
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪ জুন ২০১৮, ২২:০৩ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ২০:৩৩
প্রকাশিত: ০৪ জুন ২০১৮, ২২:০৩ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ২০:৩৩


একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করছেন শ্রমিকরা। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) রমজান মাসের ১৮ দিন চলছে, কয়েক দিন পরেই ঈদ-উল-ফিতর। কিন্তু তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বড় একটা অংশ এখনো বেতন-বোনাস পাননি। এরই মধ্যে শ্রমিকদের সভা-সমাবেশ করতে দেখা গেছে। শুধু এই বছর নয়, প্রতি বছরই বেতন-বোনাসের জন্য পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন-বিক্ষোভ করতে হয়। সরকারসহ পোশাকশিল্পের মালিকরা প্রতিশ্রুতি দিলেও তার বাস্তবায়ন দেখা যায় না।

শ্রমিক নেতারা মনে করছেন, সরকারের যথাযথ তদারকির অভাবে এই অবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। পোশাকশিল্পের মালিকদের মানসিক দৈন্যতার কারণে প্রতি বছর ঈদের আগে শ্রমিকদের রাস্তায় নামতে হচ্ছে।

তবে মালিক পক্ষের দাবি, দেশের পোশাকশিল্পের অবস্থা খুব একটা ভালো না। অধিকাংশ কারখানাই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। শ্রমিকদের বেতন-বোনাস ঠিকমতো দিতে না পারার এটা অন্যতম কারণ বলে জানান মালিকরা।

অবিলম্বে সরকারের বিভিন্ন বাহিনী, মন্ত্রণালয়, কারখানা পরিদর্শকের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন শ্রমিক নেতারা। মালিকরা শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দিলেন কিনা, বিষয়টি তদারকি করবে ওই কমিটি।

সম্প্রতি শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেছেন, তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকরা যেন ২৮ রমজান বা ১৪ জুনের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ করেন। তবে ঘোষণা দিলেও মালিকরা বেতন-বোনাস দিলেন কি না, সে বিষয়ে কোনো ধরনের তদারকি নেই বলে অভিযোগ করেছেন গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু।

মোশরেফা মিশু বলেন, ‘কয়েক দিন আগে শ্রমমন্ত্রী, বিজিএমই, শ্রমিক নেতাদের সাথে নিয়ে তারা আলোচনা করেছেন। তারা বলছে যে, শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দিয়ে দিবে। মালিকরা কবে দিবে, নাকি দিবে না–এ ব্যাপারে সরকারের দিক থেকে কোনো তদারকি নাই। প্রতি বছরই তারা এ রকম একটা ঘোষণা দিয়ে থাকেন। এই ঘোষণাটা দায়সারা গোছের। আসলে শ্রমিকরা ঠিকমতো বোনাস পাচ্ছে কি না, মালিকরা ঠিকমতো দিচ্ছে কি না, এটার কোনো রকম তদারকি সরকারের পক্ষ থেকে নাই। এ কারণেই এই ধরনের ঘটনা প্রতি বছরই ঘটছে।’

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম প্রিয়.কমকে বলেন, ‘অনেক মালিক হয়তো প্রথম সপ্তাহেই শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দিয়েছেন। কিন্তু এখনো অনেকে দিচ্ছেন না, গড়িমসি করছেন। আমরা বলেছি ২০ রোজার আগে দিতে হবে। মালিকরা তাদের শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরিটাই তো দিবে, দয়াদাক্ষিণ্য বা অন্য কিছু তো নয়।’

রমজান মাসের ২০ তারিখের মধ্যে বেতন-বোনাস দেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন করেন শ্রমিক নেতারা। ছবি: প্রিয়.কম

ঈদ আসতে এখনো যত দিন সময় আছে, সরকার শ্রমিকদের বেতন-বোনাসের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিলে এই সমস্যা এবার ঘটবে না বলে মনে করেন মোশরেফা মিশু। তিনি বলেন, ‘আমি সরকারকে আহ্বান জানাই, এখনো সময় আছে। অবিলম্বে সরকারের বিভিন্ন বাহিনী আছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় আছে, কারখানা পরিদর্শকরা আছেন, সবার মধ্যে একটা সমন্বয় কমিটি করে তদারকি করতে পারে। অল্প কয়েকটা কারখানা আছে, ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম এ রকম কয়েকটি মাত্র অঞ্চল। এই অঞ্চলগুলোতে যদি শান্তি থাকে, তাদেরকে যদি ঠিকমতো বেতন দেওয়া হয়, তাহলে কোনো সমস্যাই আর থাকে না। সরকার যদি তদারকি না করে, তাহলে এর সবকিছুর দায়দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।’

যেসব মালিকরা বেতন-ভাতা দিচ্ছেন না, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করেন মোশরেফা মিশু।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম জানান, প্রতি বছরই কিছু শ্রমিক থেকে যায়, যারা ঈদের আগে বেতন-বোনাস পায় না। তখন তাদের কর্মস্থলেই থেকে যেতে হয়, কখনো কারখানাতেই বেতন-বোনাসের জন্য অবস্থান নিয়ে থাকতে হয়।

গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, ‘ঈদের সময় মালিকরা ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, দিল্লি, লন্ডন, আমেরিকা, ফ্রান্সের মতো দেশগুলোতে ঘুরে বেড়ান। গত বছরও আমরা দেখেছি, লাখো মানুষ বাইরে গেছে ঈদ করতে, তাদের মধ্যে গার্মেন্ট মালিকসহ অন্য উচ্চবিত্তরা রয়েছেন। ঈদের কেনাকাটাও তারা এসব জায়গা থেকে করেন।’

‘তবে যখনই শ্রমিকদের বেতন-বোনাসের প্রশ্ন আসে, তখনই তারা বলবেন তাদের সক্ষমতা নাই’, বলেন মিশু। তিনি দাবি করেন, বেতনের সমপরিমাণ না দিলেও মালিকরা যেন বেসিকের সমপরিমাণ বোনাস গার্মেন্ট শ্রমিকদের দেন। কিন্তু তারা সেটাও দিতে চান না। এটা মালিকদের মানসিক দৈন্যতা, মানবতার দৈন্যতা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক সমিতির (বিজিএমইএ) কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

দেশের অধিকাংশ পোশাকশিল্প কারখানাই খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে চলছে বলেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সাবেক সহ-সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘গার্মেন্টস সেক্টরে ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যায়, প্রায় ৫ হাজার গার্মেন্টেসের মধ্যে চলছে বড়জোর এক থেকে দেড় হাজার গার্মেন্টস। বাকিগুলো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। প্রায় সময় সাব-কন্ট্রাক্ট করে। যেখানে সাব-কন্ট্রাক্ট করে সেখানে ঠিকমতো পেমেন্ট পায় না। বায়াররা ঠিকমতো পেমেন্ট দিচ্ছে না। এই ধরনের কিছু জটিলতা থাকে।’

কিছু শ্রমিক নেতাও অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ করেন হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘কিছু ত্রুটি মালিকদেরও থাকে, কিছু শ্রমিকদেরও। কিছু শ্রমিক সংগঠন গড়ে উঠছে, যারা সবসময় ঘোলা পানিতে শিকার করতে চায়। তারা মনে করে, কথা না বললে নেতাগিরি ঠিক থাকে না। সেজন্য ওরাও এ কাজগুলো একটু বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলেন। এটা হচ্ছে বাস্তবতা। তবে সব নেতা এক না। অনেক নেতা বিষয়গুলো সমাধান করার চেষ্টা করেন।’

হেলাল উদ্দিন জানান, একজন মালিক যখন কারখানা গড়ে তুলে তখন সে তার জীবনের সমস্ত কিছু দিয়েই গড়ে। এটা তো শ্রমিক নির্ভর কারখানা। ওই মালিক নিশ্চয়ই বোঝেন, যদি তার শ্রমিক না বাঁচে তাহলে তার কারখানা বাঁচবে না। সেজন্য শ্রমিক-মালিক উভয়পক্ষের মিলেই সমস্যার ফয়সালা করতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।

হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘মালিকরাও তো মানুষ। তাদেরও তো পারিবারিক সমস্যা আছে। সুখ, দুঃখ, কষ্ট বেদনা আছে। মনে করেন, কারখানার মালিকের সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এখন সে কারখানার দিকে খেয়াল দিবে, নাকি সন্তানের দিকে? এই বিষয়গুলো আমাদের নজরে আনতে হবে। কী কারণে হচ্ছে না। খামাখাই মালিক তার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতে চান না, এমন সংখ্যা খুবই কম।’

তবে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম বলছেন, ‘শ্রমিকরা যদি তাদের হাত দুটো গুটিয়ে নেয় তাহলেই তো সব বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু মালিকরা অনেক সময় শ্রমিকদের উৎপাদন পক্রিয়ার সাথে যুক্তই মনে করেন না। তাই আন্দোলন-সংগ্রাম ছাড়া কোনো সমাধান নাই।’

প্রতি বছর আন্দোলন হচ্ছে, তারপরও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ হচ্ছে না কেন–এমন প্রশ্নে ওয়াজেদুল ইসলাম মনে করছেন, ব্যক্তিমালিকানাধী হওয়াতেই এই সমস্যা। তিনি বলেন, ‘সব কারখানাকে ব্যক্তিমালিকানায় দিয়ে দেওয়া ঠিক না। প্রাইভেট ও পাবলিক দুটোই যদি থাকত তাহলে মালিকদের একচেটিয়া শোষণমুখী ব্যাপার সেটা থেকে রেহাই পাওয়া যেত।’

প্রিয় সংবাদ/রিমন

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...